ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রছাত্রীদের লড়াই

‘তবুও মানুষ আছে সে মানুষ যদিও বিরল/বুকে যার উদ্বেলিত মানুষের যন্ত্রণার ঢল/সমুদ্র গভীর ভালবাসা/যা তাকে উদ্বুদ্ধ করে সবকিছু তুচ্ছ করে নবযুগ সৃষ্টির সমরে’...

 

কখনো কখনো এমন হয়। না ভাবলেও মনের অবচেতনে কবেকার পড়া কবিতার লাইন আচমকাই মনে পড়ে যায়। এই এখন কোন অজ্ঞাত কারণে জানি না একদা বাংলার এক কিংবদন্তি প্রায় সমাজতান্ত্রিক নেতা ননী ভট্টাচার্যের লেখা কবিতার কিছু লাইন এলোমেলো মনে এলো। হতে পারে কয়েক দিন ধরে ভারতের সমাজ রাজনীতি অর্থনীতিতে একের পর এক এমন সব ঘটনা ঘটছে, যাতে মনটা একটু বিক্ষিপ্ত হয়ে আছে। অমিতাভ দাশগুপ্ত, বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, ভারভারা রাও থেকে চেরবান্দু রাজুর বহু কবিতা ইতস্তত বিক্ষিপ্ত টুকরো টুকরোভাবে মনে মনে আওড়ে চলেছি। আসলে কবিতার সঙ্গে কোথাও যেন তারুণ্যের এক প্রবল সাযুজ্য আছে। বাঙালি, অথচ জীবনে এক লাইন কবিতা লেখেনি, এমন সংখ্যা নিতান্তই কম। রাগ, যন্ত্রণা, আনন্দ, বিষাদে বাঙালি তরুণ কবিতার আশ্রয় নেয়। কদিন ধরে কলকাতায় যাদবপুরের ছাত্রদের দৃপ্ত ভঙ্গিতে স্পর্ধিত উচ্চারণগুলোর মুখে মুখে গানের সুর শুনতে শুনতে, এই প্রবীণ বয়সেও বুকের গভীরে কবিতা রিমঝিম বৃষ্টি হয়ে ঝরে পড়ছে।

 

একটু-আধটু যারা আমাকে জানেন, লেখা বা ডকুমেন্টারির সঙ্গে পরিচয় আছে, তারা নিশ্চিত একমত হবেন যে, আমি কখনো আগডুম-বাগডুম বলে মূল সমস্যা থেকে সরে যাই না। ধরি মাছ না ছুঁই পানি মার্কা এলিট ভদ্দরলোকীয় ধাত আমার নেই যে, সাদাকে সাদা বা কালো কে কালো না বলে পাস কাটাব। আর এখন আমাদের দেশের যা পরিস্থিতি তাতে পক্ষ আপনাকে নিতেই হবে। তথাকথিত নিরপেক্ষতার কোনো জায়গা নেই। তাই প্রথমেই বলে নেওয়া ভালো, যে যাদবপুরের ঘটনায় আমি ১০০ ভাগ ছাত্রদের দিকে। বয়স কম বলে কিছু বাড়াবাড়ি হতে পারে। কিন্তু ছাত্ররা যে সাহস নিয়ে সংগঠিত এক রাষ্ট্রশক্তির মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে, তার জন্য তাদের কুর্নিশ জানাতেই হয়। একটা কথা পরিষ্কার যে, যাদবপুরের ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন বিষয় নয়। দেশজুড়ে যে উগ্র ফ্যাসিবাদী ছায়া ক্রমেই দীর্ঘ হচ্ছে, এও তারই এক অন্যতম অধ্যায়। বলা যেতে পাওে, ভারতীয় সংবিধানের মূল, যে ধর্মনিরপেক্ষতা তা বদলে দিয়ে মনুবাদী ভারতের নির্মাণের সামগ্রিক নীলনকশারই এ এক খণ্ডিত অংশ। সারা পৃথিবীর ইতিহাসে চোখ রাখুন। দেখবেন উগ্র জাতীয়তাবাদের সবচেয়ে বড় লক্ষ্যই থাকে দেশের শিল্প-সাহিত্য-ভাষা-সংস্কৃতির ওপর আঘাত হানা। আমাদের দেশেও নরেন্দ্র মোদি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর থেকে ইতিহাসের সত্য আড়াল করে তৈরি করা হচ্ছে মনগড়া এক মিথ্যে কথন। যেখানে তাজমহল হয়ে যাচ্ছে তেজামন্দির, লালকেল্লাকে দাবি করা হচ্ছে প্রাচীন মন্দির বলে। প্রাচীন মুঘল সরাই স্টেশনের নাম বদলে হয়ে যাচ্ছে দীনদয়াল উপাধ্যায় স্টেশন। ফিরোজ শা কোটলা স্টেডিয়াম হয়ে যাচ্ছে অরুণ জেটলি স্টেডিয়াম। এ রকম অজস্র উদাহরণ দিয়ে বলা যায় কীভাবে জোর করে ভারতের সমন্বয়বাদী ইতিহাসের বদলে সযতেœ নির্মিত হচ্ছে এক হিন্দুত্ববাদী আখ্যান।

 

শাসক মতাদর্শের বিপরীতে কথা বলার ‘অপরাধে’ ইতিমধ্যেই প্রাণ দিতে হয়েছে কালবুর্গী, পানেসর ও গৌরীলঙ্কেশের মতো খ্যাতিমান লেখক-সাংবাদিকদের। ভিন্ন স্বর মাত্রই নিশানা হচ্ছেন। সরকারের প্রচ্ছন্ন মদদে সংঘ পরিবারের লোকজনের লেখায় ও বলায় হেনস্তা হতে হচ্ছে সর্বজন শ্রদ্ধেয় বিশিষ্টজনদের। নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনের বিরুদ্ধে অশালীন ভাষায় দিনের পর দিন মন্তব্য করে যাচ্ছেন বিজেপি ও সংঘ পরিবারের নেতারা। রোমিলা থাপারের মতো বিশিষ্ট ঐতিহাসিককেও নানাভাবে অপমানিত হতে হচ্ছে। সব শিক্ষা গবেষণা কেন্দ্রের বাজেট কমিয়ে উচ্চশিক্ষার মান ইচ্ছা করে নষ্ট করার চেষ্টা চলছে। শহুরে নকশাল তকমা দিয়ে জেলে পোরা হয়েছে একাধিক বিদ্বজ্জনকে। কাশ্মীর তো বটেই দেশের নানা রাজ্যে সাংবাদিকদের হুমকির মধ্যে পড়তে হচ্ছে প্রায় প্রতিদিন।

 

এই লড়াইয়ে বিজেপির সব থেকে বড় প্রতিপক্ষের নাম যুক্তিবাদ। ভাববাদের আঁতুড়ঘরে জন্ম নেয় ফ্যাসিবাদী মতাদর্শ। যেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যুক্তিবাদ লালন করে, তাদের ওপরই সর্বপ্রথম আক্রমণ নেমে আসে সারা দুনিয়ায়। এ দেশেও একের পর এক আক্রান্ত হয়েছেÑ পুনা ফিল্ম ইনস্টিটিউট, জামিয়া মিলিয়া ইউনিভার্সিটি, আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়, হায়দরাবাদ ইউনিভার্সিটি আর জওয়াহেরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয় (জেএনইউ)। জেএনইউ-এ তো প্রতিবছর সংঘ পরিবারের লোকজন সর্বশক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে জেতার জন্য। প্রতিবারই গো-হারান হারে বিজেপির ছাত্র সংগঠন অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদ, সংক্ষেপে ‘এবিভিপি’। ইদানীং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের বড় অংশের মদদ থাকে এবিভিপির দিকে। কিন্তু তাও সর্বস্তরের সাধারণ ছাত্রছাত্রীরা ঘৃণার সঙ্গে প্রত্যাখ্যান করেছে চরম সাম্প্রদায়িক দক্ষিণপন্থি মতাদর্শকে। ইতিহাস এভাবেই নানা দেশে নানা নামে ফিরে ফিরে আসে। আমাদের দেশেও লড়াই নিছক কোনো দলের সঙ্গে দলের নয়। শুধু ভোটের নয়। লড়াই আসলে উগ্র জাতীয়তাবাদের সঙ্গে বহুত্ববাদী গণতন্ত্রের। চরম হিন্দুত্ববাদের সঙ্গে প্রকৃত ধর্মনিরপেক্ষতার।

 

তাই যে যতই বলুন, এটা মনে হতেই পারে, যাদবপুরের বিজেপি সাংসদ বাবুল সুপ্রিয় দলের কোনো গেমপ্ল্যান অনুযায়ীই বামপন্থি রাজনীতির শক্ত ঘাঁটি যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে ঢুকতে চেয়েছিলেন। ছাত্ররা ঢুকতে বাধাও দেয়নি প্রথমে। তারা কালো পতাকা দেখিয়ে বিক্ষোভ দেখিয়ে ছিলেন এটা ঠিক। তা এ ধরনের কাজ গণতন্ত্রে মোটেও অবৈধ অন্যায় নয়। মনে রাখতে হবে, ওই বিক্ষোভ ব্যক্তি বাবুলের জন্য আদৌ নয়। কাশ্মীরে এই মুহূর্তের যা অবস্থা বা আসামের ‘এনআরসি’তে কয়েক লাখ লোকের নাগরিক অধিকার প্রশ্নের মুখে পড়া, ‘জয়শ্রীরাম’ সেøাগান না দিলে অন্য ধর্মের লোকজনের ওপর হামলা এবং সর্বোপরি দেশে একের পর এক শিল্প-কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়া আর বেকারত্বের ভয়াবহতা, সামগ্রিকভাবে সংকটজনক পরিস্থিতিতে অর্থনীতি; রাষ্ট্রের এমন ভ্রান্তনীতির বিরুদ্ধে এক ধরনের বিক্ষোভ প্রদর্শন ছিল ছাত্রদের উদ্দেশ্য। ছাত্ররা সমাজের সবচেয়ে সংবেদী অংশ। চিরকাল দেশে দেশে প্রতিষ্ঠানবিরোধী লড়াই সংগ্রামে অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছে ছাত্রদের বড় অংশ। ষাটের দশকে আমেরিকার বিরুদ্ধে ভিয়েতনামের স্বাধীনতাযুদ্ধে সামনের সারিতে ছিলেন তরুণ প্রজন্ম। প্যারিসে ছাত্র অভ্যুত্থানকে সমর্থন জানিয়ে রাস্তায় নেমে এসেছিলেন জাঁ পল সাঁত্র ও সিমোন দ্য বেভোয়ার মতো আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বুদ্ধিজীবীরা। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধেও ছাত্রদের অবদান বিপুল। মাও সে তুং ছাত্রদের তুলনা করতেন সকাল বেলার সূর্যের সঙ্গে। ভারতের আকাশে অন্ধকার গাঢ় হচ্ছে। মশাল হয়ে তা দূর করতে সতত সক্রিয় আমাদের তরুণরা। ছাত্ররা। আমাদের মতো প্রবীণদের দুই হাত সব সময় তাদের মাথায় থাকুক।

 

মধ্যবিত্ত উচ্চবিত্তের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ যখন মেরুদণ্ড বিকিয়ে ফ্যাসিস্টবন্দনায় ব্যস্ত, অধিকাংশ বুদ্ধিজীবী যখন জানি না জানি না করে সত্যি থেকে মুখ লুকোতে ব্যস্ত, যেকোনো প্রতিবাদী স্বরকে যখন প্রকাশ্যে ও সোশ্যাল মিডিয়ায় অত্যন্ত কুৎসিত ভাষায় আক্রমণ করে চলেছেন শাসক দলের নেতাকর্মীরা, যাদবপুরের ঘটনার পর ছাত্রদের পাশে থাকার কারণে বিশিষ্ট বাচিক শিল্পী সর্বজনশ্রদ্ধেয়া ঊর্মিমালা বসুকে যেভাবে অশ্লীলতম ভাষায় আক্রমণ করা হয়েছে, যখন প্রতিদিন লিখতে লিখতে মনে হয় আর হয়তো লিখতে পারব না; এ লেখাই হয়তো আমার শেষ লেখা, তখন ভয় লাগে। সর্বগ্রাসী ভয়-আতঙ্ক ইতিমধ্যেই ভারতকে গ্রাস করেছে। তখন, ঠিক তখনই কানে আসে রাষ্ট্রের লাল চোখকে কিছুমাত্র তোয়াক্কা না করে জওয়াহেরলাল বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণদের উচ্চকিত সেøাগানÑ ‘পেরিয়ার ফুলে ভগৎ সিং উই শ্যাল ফাইট, উই শ্যাল উইন।’ স্পষ্ট উচ্চারণ ধ্বনিত হতে থাকে ভারতের সর্বত্রÑ ‘জয়ভীম কমরেড’। বাবা সাহেব ভীমরাও আম্বেদকরের দলিত রাজনীতি আর বামপন্থা মিশমিশে বাম রাজনৈতিক ডিসকোর্সে এক নতুন অধ্যায়ের জন্ম দেয়। জওয়াহেরলাল বা যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের লড়াই তাই সামগ্রিক ফ্যাসিবাদীবিরোধী লড়াইয়েরই এক অংশ।

 

এখন পক্ষ আপনাকে নিতেই হবে। কবিতা দিয়ে লেখা শুরু করেছিলাম। কবিতা দিয়েই শেষ করব। বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের এ বছর শতবর্ষ। কবে তিনি যে কথা লিখেছিলেন এখন এই গাঢ় অন্ধকারে আবার মনে পড়ছেÑ

‘মুখে যদি রক্ত ওঠে, সে কথা এখন বলা পাপ। এখন চারিদিকে শত্রু, মন্ত্রীদের চোখে ঘুম নেই। এ সময় রক্তবমি করা পাপ, যন্ত্রণায়, ধনুকের মতো বেঁকে যাওয়া পাপ, নিজের বুকের রক্তে স্থির হয়ে শুয়ে থাকা পাপ...’।

 

লেখক : ভারতীয় প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা

dastidarsoumitra786@gmail.com