মিউচুয়াল ফান্ড রূপান্তর চায় না এলআর গ্লোবাল

সিকিউরিটিজ আইন অনুযায়ী কোনো মিউচুয়াল ফান্ডের ৭৫ শতাংশ ইউনিটধারীর মেয়াদি (ক্লোজ এন্ড) মিউচুয়াল ফান্ডকে বেমেয়াদিতে (ওপেন এন্ড) রূপান্তরের ক্ষমতা রয়েছে। তবে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ডিবিএইচ প্রথম মিউচুয়াল ফান্ড বেমেয়াদিতে রূপান্তরে ৭৮ শতাংশ ইউনিটধারী চাইলেও বাদ সেধেছে সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান এল আর গ্লোবাল অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি। যদিও ফান্ডটির উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠান ডেল্টা ব্র্যাক হাউজিং ফাইন্যান্স কোম্পানিও রূপান্তর চেয়ে ট্রাস্টিকে চিঠি দিয়েছে। ২০১৫ সালে এলআর গ্লোবালকে মিউচুয়াল ফান্ডের তহবিল অপব্যবহারের দায়ে বড় অঙ্কের জরিমানা করেছিল পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা।

এল আর গ্লোবাল পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ছয়টি ক্লোজ এন্ড মিউচুয়াল ফান্ড ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে রয়েছে, সেসব ফান্ডের আকার প্রায় ৮৮০ কোটি টাকা। তবে ফান্ডগুলোর সম্মিলিত সম্পদমূল্য প্রায় হাজার কোটি টাকা বলে এল আর গ্লোবালের দাবি। খাতটির প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থাহীনতার কারণে এসব মিউচুয়াল ফান্ডের সবই অভিহিত মূল্যের নিচে লেনদেন হচ্ছে।

মূলত ক্লোজ এন্ড মিউচুয়াল ফান্ডের মেয়াদ বাড়ানোর সুযোগ, সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠানের অদক্ষতা ও জবাবদিহির অভাবে খাতটির বিনিয়োগকারীদের অনীহা তৈরি হয়েছে। এসব কারণে বিনিয়োগকারীরা মেয়াদি মিউচুয়াল ফান্ডকে বেমেয়াদিতে রূপান্তর করতে চান, যাতে খাতটিতে স্বচ্ছতা ফিরে আসে। পাশাপাশি যেকোনো সময় সম্পদমূল্যের ভিত্তিতে ইউনিট ফেরত দিয়ে বিনিয়োগ নগদায়ন করা যায়। তবে ইউনিটধারীদের এ উদ্যোগে বাদ সাধছে সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান। উল্টো যেসব প্রতিষ্ঠান ডিবিএইচ মিউচুয়াল ফান্ডকে বেমেয়াদিতে রূপান্তরের উদ্যোগ নিয়েছে, তাদেরকে কারসাজিকারক হিসেবে অভিহিত করে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (এসইসি) ও ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) অভিযোগ করেছে এল আর গ্লোবাল। তাদের আশঙ্কা বেমেয়াদি হলে ফান্ডটি গুটিয়ে ফেলতে হবে। কারণ, বাজারমূল্যের চেয়ে সম্পদমূল্য বেশি হওয়ায় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা ইউনিট ফেরত দিয়ে অর্থ চাইবে।

ডিবিএইচ প্রথম মিউচুয়াল ফান্ডের বর্তমান আকার হচ্ছে ১২০ কোটি টাকা। গতকাল এ ফান্ডটির প্রতি ইউনিটের সমাপনী মূল্য ছিল ৮ টাকা ৫০ পয়সা। বর্তমান বাজার দরে এর প্রতি ইউনিটের নিট সম্পদমূল্য হচ্ছে ৯ টাকা ৯৪ পয়সা।

বাজার সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠানগুলো যেভাবে মিউচুয়াল ফান্ডের তহবিল যথেচ্ছ ব্যবহার করছে, তাতে করে বেমেয়াদি হলে তাদের সম্পদ ব্যবস্থাপনার কাজে স্বচ্ছতা ফিরে আসবে। তহবিল পরিচালনায় সম্পদ ব্যবস্থাপকরা আরও মনোযোগী হবেন ফলে বাধ্য হয়েই সম্পদ বিক্রি করে দিতে হবেন। ফলে ধ্বংসের দাঁড়প্রান্তে থাকা মিউচুয়াল ফান্ড খাত ঘুরে দাঁড়াতে পারে।

সম্প্রতি এল আর গ্লোবাল পরিচালিত ডিবিএইচ প্রথম মিউচুয়াল ফান্ডের উদ্যোক্তাসহ ৭৮ শতাংশের বেশি ইউনিটধারী ফান্ডটিকে বেমেয়াদিতে রূপান্তরে ইউনিটহোল্ডারদের সভা আহ্বানে ট্রাস্টি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ জেনারেল ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিকে চিঠি দিয়েছে। বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (মিউচুয়াল ফান্ড) বিধিমালা, ২০০১-এর ৫০-এর গ বিধি অনুযায়ী কোনো মিউচুয়াল ফান্ডের ৭৫ শতাংশ ইউনিটধারীর সমর্থনে মেয়াদি ফান্ডকে বেমেয়াদিতে রূপান্তর করা যাবে।

এ বিষয়ে ডিবিএইচ প্রথম মিউচুয়াল ফান্ডের ট্রাস্টি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ জেনারেল ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক আহমেদ সাইফুদ্দিন চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ফান্ডের ধরন পরিবর্তন বিষয়ে ইউনিটধারীদের চিঠি আমরা পেয়েছি। আমরা ইতিমধ্যেই পরামর্শ ও মতামতের জন্য এসইসিতে পাঠিয়ে দিয়েছি। তাদের মতামত পেলে আমরা ইউনিটধারীদের একটি সভা আহ্বান করব। আর সে সভাতেই ৭৫ শতাংশ ইউরিটধারী যে সিদ্ধান্ত নেবেন, তা কার্যকর হবে।

গত ২১ আগস্ট ডিবিএইচ প্রথম মিউচুয়াল ফান্ডের মেয়াদ আরও ১০ বছর বাড়িয়ে ২০১০ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বাড়ানো হয়। আর গত মঙ্গলবার ডিবিএইচ প্রথম মিউচুয়াল ফান্ডের উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠান ডেল্টা ব্র্যাক হাউজিং ফাইন্যান্স কোম্পানি, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী ব্র্যাক ব্যাংক, পূবালী ব্যাংক সিকিউরিটিজ, আইডিএলসি ইনভেস্টমেন্টস, ইউসিবিএল, ভিআইপিবি অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট, ডেল্টা লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি, এজ এমএমসি লিমিটেড ও এশিয়ান টাইগার কাপিটাল পার্টনারস অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টসহ বিভিন্ন বিনিয়োগকারী ফান্ডটিকে বেমেয়াদিতে রূপান্তরে ইউনিটহোল্ডারদের সভা ডাকতে ট্রাস্টিকে চিঠি দেয়। এমন পরিস্থিতিতে করণীয় ঠিক করতে গতকাল এসইসির নির্দেশনা চেয়েছে ফান্ডটির ট্রাস্টি বিজিআইসি। 

তবে উদ্যোক্তাসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান মিউচুয়াল ফান্ডটি বেমেয়াদিতে রূপান্তরের দাবি জানালেও এর নেপথ্যে অসৎ উদ্দেশ্য রয়েছে বলে মনে করে এল আর গ্লোবাল। এ রূপান্তরে অন্য এক সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠানকে দায়ী করছে তারা। কারসাজির মাধ্যমে মিউচুয়াল ফান্ডের উচ্চমূল্য ধরে রাখার অভিযোগও করেছে এল আর গ্লোবাল।

এ বিষয়ে এল আর গ্লোবালের রিয়াজ ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ভিআইপিবি অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টের ৩০ শতাংশ এক্সপোজার এল আর গ্লোবালের বিভিন্ন ফান্ডে রয়েছে। এর মধ্যে ৭০ শতাংশ রয়েছে ডিবিএইচ ও গ্রিন ডেল্টা মিউচুয়াল ফান্ডে। তারা এটা করেছে মূল্য নিয়ন্ত্রণের জন্য। ওই প্রতিষ্ঠান কারসাজির মাধ্যমে ইউনিট ড্রাই করে উচ্চমূল্য ধরে রেখেছে।

বেমেয়াদিতে রূপান্তরের বিষয়ে রিয়াজ বলেন, তারা যদি এটা মেয়াদ বাড়ানোর আগে করত এবং কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট না থাকত, তাহলে আমি বিবেচনা করতাম। ওই প্রতিষ্ঠান ইউনিট কিনেছে ৫ টাকায়, আর আমার স্পন্সর ও দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগকারীরা কিনেছে ১০ টাকায়। এখন আমি যদি মার্কেটে বিক্রি করে দিই, তাহলে বর্তমানে যে সম্পদমূল্য রয়েছে, তা কি থাকবে? 

বেমেয়াদিতে রূপান্তরে কোনোভাবেই একমত হতে পারবেন না বলে জানিয়ে রিয়াজ ইসলাম বলেন, আমাদের যদি ক্যাশ এবং ট্রেজারি না থাকে, তাহলে আমরা কখনো ওপেন এন্ড মিউচুয়াল ফান্ড চালাতে পারব না। বাংলাদেশের মার্কেট এটা সাপোর্ট করে না।

কারসাজির অভিযোগ পুরোপুরি বানোয়াট উল্লেখ করে ভিআইপিবি অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা শহিদুল ইসলাম বলেন, আমরা তো একদিনে ওইসব মিউচুয়াল ফান্ডের ইউনিট কিনিনি। কয়েক বছর ধরে কিনেছি। আমাদের পোর্টফোলিও গত পাঁচ বছর ধরেই প্রকাশ করে আসছি এবং এ সংক্রান্ত সিকিউরিটিজ আইন পরিপালন করে আসছি। আমরা ওপেন এন্ড ফান্ডে রূপান্তর করতে চাই এবং সেটাতে তাদেরই লাভ হওয়ার কথা। আমাদের এখানে ক্লোজ এন্ড ফান্ডে তেমন কোনো কাজ করতে হয় না। তবে ওপেন এন্ড ফান্ড হলে কঠিন পরিশ্রম করতে হয়, পারফর্ম করতে হয়, রিটার্ন দিতে হয়। অনেকেই পরিশ্রম না করেই বসে বসে অর্থ কামাই করতে চান।

ডিবিএইচ প্রথম মিউচুয়াল ফান্ডের প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী আইডিএলসি ইনভেস্টমেন্টস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মনিরুজ্জামান বলেন, আমরা আমাদের গ্রাহকদের স্বার্থরক্ষার চেষ্টা চালাচ্ছি। আইনের মধ্য থেকে আমাদের অধিকার প্রয়োগ করছি, যেখানে ৭৮ শতাংশ ইউনিটহোল্ডার একটি সভা ডেকেছে। 

প্রসঙ্গত, ২০১০ সালের ধসের পর নিজেদের পরিচালিত ছয়টি মিউচুয়াল ফান্ড থেকে কয়েকটি অতালিকাভুক্ত কোম্পানিতে বিধিমালা ভঙ্গ করে ৯৫ কোটি ৫৮ লাখ টাকা বিনিয়োগ করে এল আর গ্লোবাল। ২০১৪ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত অতালিকাভুক্ত চারটি কোম্পানিতে বিধিবহির্ভূত এ বিনিয়োগের পরিমাণ দাঁড়ায় ৪৮ কোটি ৫৬ লাখ টাকা। মিউচুয়াল ফান্ড বা তহবিল পরিচালনা সংক্রান্ত বিধি ভঙ্গ ও বিভিন্ন অনিয়মের দায়ে ২০১৫ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি সম্পদ ব্যবস্থাপক প্রতিষ্ঠান এল আর গ্লোবাল অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানিকে ৫০ লাখ টাকা জরিমানা করে বিএসইসি। কোম্পানিটির ওপর নতুন তহবিল গঠনে এক বছরের নিষেধাজ্ঞাও আরোপ করা হয়। একই সঙ্গে যথাযথ দায়িত্ব পালন না করায় ট্রাস্টি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ জেনারেল ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিকে (বিজিআইসি) ২৫ লাখ ও নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান হুদা ভাসিকে ৫ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। এছাড়া অবৈধভাবে নেওয়া ‘অফিস ও প্রশাসনিক ব্যয়’ বাবদ ৫ কোটি ৯৪ লাখ টাকা ও ‘আইন সংক্রান্ত খরচ’ বাবদ ৩১ লাখ ৬২ হাজার টাকা সংশ্লিষ্ট মিউচুয়াল ফান্ডে ফেরত দিতে চার মাসের সময় বেঁধে দেয় বিএসইসি। তহবিলের অর্থ কম সুদের পরিবর্তে তুলনামূলক উচ্চ সুদহারের ব্যাংক হিসাবে স্থানান্তরের নির্দেশনা দেওয়া হয়। যদিও এসইসির ওই শাস্তির বিরুদ্ধে আদালতে মামলা দায়ের করেছে এল আর গ্লোবাল।’’’’