রোহিঙ্গাদের ওপর নির্মমতাকে কম্বোডিয়ার গণহত্যার সঙ্গে তুলনা করে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী ড. মাহাথির মোহাম্মদ বলেন, ‘এটা স্পষ্ট যে মিয়ানমার সরকার এই সংকটের সমাধান করতে রাজি নয়।’ তিনি বলেন, এটি আমাদের কাছে পরিষ্কার হয়ে গেছে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এই পরিস্থিতি নিয়ে কিছু করতে হবে।’
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৭২তম অধিবেশনে (ইউএনজিএ) যোগ দিতে নিউ ইয়র্কে পৌঁছেই গত মঙ্গলবার জাতিসংঘে বাংলাদেশ স্থায়ী মিশন এবং ওআইসি সেক্রেটারিয়েট যৌথভাবে আয়োজিত ‘রোহিঙ্গা সংকট : উত্তরণের পথ’ শীর্ষক উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণে সাইডলাইন আলোচনায় মাহাথির এসব কথা বলেন।
মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আসুন, আমরা খোলাখুলিভাবে এ ব্যাপারে কথা বলি। রাখাইন রাজ্যে যা হয়েছে তা হচ্ছে গণহত্যা।’ তিনি বলেন, জাতিসংঘের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে তাদের ভূমিকা পালন করা উচিত। এটি ভবিষ্যতে মানবসৃষ্ট দুর্দশা রোধ করার আশা নিয়েই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। তাই এর নীরবতা বধিরতারই নামান্তর। তিনি বলেন, সিকিউরিটি কাউন্সিলের পদক্ষেপ ছাড়া সংকটের সমাধান এবং অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে অন্যদের অবশ্যই নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করতে হবে। তিনি বলেন, ‘রোহিঙ্গারা দেশ থেকে পালিয়ে বাংলাদেশের কক্সবাজারে আশ্রয় নিয়েছে। বাংলাদেশ ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়েছে। এ জন্য আমরা বাংলাদেশকে সাধুবাদ জানাচ্ছি।’
ড. মাহাথির মোহাম্মদ বলেন, মিয়ানমারের পরিস্থিতি এখনো ভালো কিছু নয়। ‘অনেক রোহিঙ্গা ব্যক্তি রাখাইনের অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুত শিবিরে (আইডিপি) বাস করছে এবং দিনে দিনে তারা নিস্তেজ হয়ে পড়ছে।’ তিনি বলেন, বিশ্ব যখন অতীতের কুখ্যাত বন্দিশিবিরগুলোর সঙ্গে আইডিপি ক্যাম্পগুলোর মিল খুঁজে পেল, তখন মিয়ানমার সরকার দ্রুত তা অস্বীকার করছে। তিনি প্রশ্ন করেন, মিয়ানমারের কাছে গোপন করার মতো কিছু যদি না থাকে, তাহলে মিয়ানমার কর্র্তৃপক্ষ জাতিসংঘর কর্মকর্তা এবং মানবিক সহায়তাকর্মীদের রাখাইনের পরিস্থিতি দেখতে যেতে বাধা দিচ্ছে কেন?
মাহাথির বলেন, জাতিসংঘের কর্মকর্তা ও মানবিক সহায়তাকর্মীদের পরিদর্শনের জন্য অবাধে সেখানে যাতায়াত করতে এবং শিবিরগুলোতে বাস করা মানুষদের সহায়তা করতে দিন। মিয়ানমারের উচিত সংকট সমাধানের অযোগ্য হয়ে ওঠার আগেই তা নিরসন করা উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রত্যাবাসন হওয়া উচিত প্রথম অগ্রাধিকার। মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী বলেন, কিছু শরণার্থীকে প্রত্যবাসনের জন্য দুবার চেষ্টা করা হয়েছিল, কিন্তু দুবারই ব্যর্থ হয়েছে। তিনি বলেন, এর কারণগুলো সুস্পষ্ট। শরণার্থীরা প্রত্যাবাসনকে নিরাপদ মনে না করলে কেউ ফিরে যাবে না।
ড. মাহাথির বলেন, মালয়েশিয়া প্রত্যাবাসনকে জোর দিয়ে যেতে থাকবে। তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের একটি নিরাপদ স্বতন্ত্র ও মর্যাদাপূর্ণ অধিকার দিয়ে মিয়ানমারের নাগরিকত্ব প্রদান সম্পন্ন করেই কেবলমাত্র এই সংকট নিরসন করতে হবে। তিনি বলেন, মিয়ানমার কর্র্তৃপক্ষ ভয়, বিদ্বেষ ও সহিংসতা উসকে দেওয়ার জন্য রোহিঙ্গাদের ইস্যুটিকে ব্যবহার করেছে। ড. মাহাথির বলেন, সুতরাং শুধু নাগরিকত্ব দিতে হবে এই বিবেচনা থেকেই এটি করা হয়েছে, যা অগ্রহণযোগ্য। এটা স্পষ্ট যে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে মিয়ানমারের প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। ড. মাহাথির আরও বলেন, ‘এ ধরনের উদ্যোগ কীভাবে কাজ করবে, তবে কি নৃশংসতার জন্য দায়ী অপরাধীরদের এ ধরনের কর্মকা- সিস্টেমের অংশ?’
ড. মাহাথির বলেন, আন্তর্জাতিক ফোরামে রোহিঙ্গা ইস্যুতে ইতিবাচক প্রচেষ্টা গ্রহণের জন্য মালয়েশিয়া ওআইসির প্রশংসা করেছে। অপরাধীরা যে জঘন্য অপরাধ করেছে তা থেকে রেহাই না পায়, এটি নিশ্চিত করার জন্য আন্তর্জাতিক আদালতে বিচারের বিষয়টি আনার সিদ্ধান্তে আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আমরা আশা করি, অন্যান্য দেশ ওআইসিকে সমর্থন করবে। রোহিঙ্গাদের জন্য মালয়েশিয়ার মানবিক সহায়তার কথা তুলে ধরে ড. মাহাথির বলেন, আমরা আমাদের সাধ্যের মধ্যে রোহিঙ্গাদের সহায়তায় প্রচেষ্টা চালিয়ে যাব। তিনি বলেন, মালয়েশিয়া এ ব্যাপারে উদ্যোগ নিয়েছে এবং এর পক্ষে যতটা সম্ভব করবে। মাহাথির আরও বলেন, ‘আমরা আশা করি রোহিঙ্গাদের এই দুর্দশা শেষ করতে অন্যান্য দেশও বাংলাদেশ ও আমাদের পাশে দাঁড়াবে। আমাদের এখনই এই সংকটের অবসান ঘটাতে হবে।’
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ওআইসি মহাসচিব ড. ইউসেফ বিন আহমেদ আল-ওথাইমেন ও সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. ইব্রাহিম বিন আবদুুল আজিজ আল-আসাফ ও বক্তৃতা করেন। অনুষ্ঠানে বিভিন্ন দেশের মন্ত্রী ও প্রতিনিধিরা যোগদান করেন। এর মধ্যে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, জার্মানি, বেলজিয়াম, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, সুইডেন, নেদারল্যান্ডস, তুরস্ক, সিঙ্গাপুর, কুয়েত, সার্বিয়া, ফিলিপাইন ও গাম্বিয়া থেকে আসা অতিথিরা।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন স্বাগত বক্তব্য দেন। বাংলাদেশ ন্যাশনাল অ্যাডভাইসরি কমিটি ফর অটিজম অ্যান্ড নিউরো ডেভেলপমেন্ট ডিজঅরডার্সের সায়মা ওয়াজেদ হোসেন, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক মন্ত্রী মো. শাহাব উদ্দিন, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মো. শাহরিয়ার আলম, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়বিষয়ক সংসদে স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান মুহাম্মদ ফারুক খান অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।