রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে পরিবহন চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে সাঁড়াশি অভিযানে নামছে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা। সম্প্রতি দুটি গোয়েন্দা সংস্থার পক্ষ থেকে খাত ও স্থান উল্লেখ করে জেলা-উপজেলার পরিবহন চাঁদাবাজদের তালিকা পুলিশ সদর দপ্তরে জমা দেওয়া হয়েছে। সংস্থার একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ওই তালিকায় যাদের নাম এসেছে সবাইকে আইনের আওতায় আনা হবে।
এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পরিবহন খাতে যারা চাঁদাবাজি করে তাদের চিহ্নিত করে একাধিক তালিকা তৈরি করে জমা দিয়েছে গোয়েন্দা সংস্থা। আগেও আমরা পরিবহন চাঁদাবাজি
তে যারা জড়িত তাদের নানাভাবে সতর্ক করেছি। চাঁদাবাজিতে যারাই জড়িত থাকুক তাদের সবার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
জড়িতরা রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী হলেও রেহাই পাবে না।’
পরিবহন চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে অভিযানের বিষয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মো. রুহুল আমিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘চাঁদাবাজিসহ ফৌজদারি অপরাধের সঙ্গে জড়িতদের বিষয়ে পুলিশ সবসময় কঠোর। চাঁদাবাজিতে যারাই জড়িত কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।’
গোয়েন্দা প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সহকারী মহাপরিদর্শক দেশ রূপান্তরকে বলেন, জেলা-উপজেলায় সাধারণত পৌরসভা, ইউনিয়ন পরিষদ, মালিক সমিতি, শ্রমিক সমিতির নামে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের নেতারা বেপরোয়াভাবে চাঁদা তুলছেন। তারা প্রতিটি রিকশা, ব্যাটারিচালিত রিকশা, ইজিবাইক, অটোরিকশা, সিএনজিচালিত অটোরিকশা, লেগুনা, বাস, ট্রাক, পিকআপসহ সব ধরনের যানবাহন থেকে চাঁদা তোলেন। এসব যানবাহন থেকে মাস ও দৈনিক হিসেবে চাঁদা আদায় করা হচ্ছে। টাকা আদায় হয় থানা ও পুলিশ ফাঁড়ির নামেও।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কিছু কিছু পৌরসভায় নির্ধারিত টোল রয়েছে। কিন্তু গাড়িগুলো থেকে নির্ধারিত টোলের বাইরে চার-পাঁচগুণ চাঁদা নেওয়া হয়। কোন মোড়ে, কোন স্ট্যান্ডে কারা চাঁদা তোলে প্রতিবেদনে তাদের বিস্তারিত নাম ও ঠিকানা উল্লেখ করা হয়েছে।
বগুড়া থেকে পাঠানো একটি প্রতিবেদনে পরিবহন খাতে ‘১০ সিন্ডিকেটের মাধ্যমে মাসে কয়েক কোটি টাকা চাঁদাবাজির’ তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। ওই প্রতিবেদনের বরাতে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, বগুড়ায় পরিবহন খাতে চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ করছে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের কয়েকজন নেতা। কমপক্ষে ১০টি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ৩-৪ কোটি টাকা চাঁদা তোলা হয়। চাঁদা তোলা হয় সিএনজি অটোরিকশা, ইজিবাইক, ব্যাটারিচালিত রিকশা-ভ্যান ও দূরপাল্লার বাস-কোচ, ট্রাক থেকে। এসব বাহন থেকে দৈনিক ৬-৮ লাখ টাকা চাঁদা তোলা হয়; যার একটি অংশ যায় অসাধু পুলিশের পকেটে। বগুড়া শহরেই প্রায় ২০ হাজার সিএনজিচালিত অটোরিকশা, প্রায় সাড়ে তিন হাজার ব্যাটারিচালিত রিকশা-ভ্যানে ২০-৩০ টাকা করে চাঁদা নেওয়া হয়। প্রায় এক হাজার ইজিবাইকে ৩০-৫০ টাকা করে দৈনিক চাঁদা নেওয়া হয়। এছাড়া রিকশা ও ভ্যানের মালিককে সমিতির সদস্যভুক্ত হতেও ২ হাজার টাকা করে চাঁদা আদায়ের কথা বলা হয়। বগুড়ার ওপর দিয়ে চলাচলকারী দূরপাল্লার বাস থেকে দিনে ও রাতে ২৫০-৩০০ টাকা করে চাঁদা নেওয়া হয়। জেলার পাঁচ শতাধিক ট্রাক থেকে প্রতিদিন ২০০ টাকা করে চাঁদা তেলা হয়। গাইবান্ধা শহরে প্রতিটি ইজিবাইক থেকে দৈনিক ৫০ টাকা হারে চাঁদা তোলার কথা বলা হয়েছে। চাঁদার টাকার ভাগাভাগি নিয়ে মারামারি, খুন-খারাবিসহ আইনশৃঙ্খলার অবনতির কথাও বলা হয়েছে প্রতিবেদনে।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, রাজধানী ও আশপাশের বিভিন্ন রুটে প্রায় ১৬ হাজার বাস থেকে প্রায় ২০ খাতে প্রতিদিন প্রায় ১০ কোটি টাকা চাঁদা নেওয়া হয়। পরিবহন শ্রমিক সংগঠন, মালিক সমিতি, থানা পুলিশ ও ফাঁড়ি এবং রুট কমিটির ব্যানারে এসব টাকা তোলা হয়। প্রতিটি বাস থেকে দৈনিক ৫০০-১২০০ টাকা পর্যন্ত চাঁদা নেওয়া হয়। এছাড়া রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় চলা ব্যাটারিচালিত রিকশা, ইজিবাইক, সিএনজিচালিত অটোরিকশা থেকেও চাঁদা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।