ডেঙ্গু নির্মূলে প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে ধাপে ধাপে দুর্নীতি ও দায়িত্বের অবহেলা হয়েছে বলে জানিয়েছে দুর্নীতিবিরোধী সংগঠন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। ডেঙ্গু প্রতিরোধে একই ওষুধ ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন যে দামে কিনেছে তার চেয়ে অন্তত ৪০ শতাংশ বেশি দামে কিনেছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন। শুধু তাই নয়, সংশ্লিষ্টদের দায়িত্বের অবহেলা ও রাজনৈতিক স্বার্থের হাতে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ জিম্মি হয়ে পড়ায় চলতি বছর আক্রান্ত হয়ে ২২৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। গতকাল বুধবার রাজধানীর ধানম-িতে টিআইবির কার্যালয়ে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এসব জানানো হয়। ‘ঢাকা শহরে এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে
সুশাসনের চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণের উপায়’ শীর্ষক এই প্রতিবেদনে ডেঙ্গু নিধনে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনসহ প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরের নানা অনিয়ম ও দায়িত্বহীনতার কথা উল্লেখ করা হয়।
দেশে এ বছর লক্ষাধিক ব্যক্তি ডেঙ্গুজ¦রে আক্রান্ত হয়েছে উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ডেঙ্গু রোগ ক্রমাগত বৃদ্ধি পেতে থাকলেও সংশ্লিষ্ট কর্র্তৃপক্ষের অস্বীকার, পদক্ষেপ গ্রহণের ঘাটতি, মশা নিয়ন্ত্রণে অব্যবস্থাপনা, কীটনাশক কেনায় অনিয়ম-দুর্নীতি ও রোগ নির্ণয়ে অবহেলাসহ নানা কারণে মৃত্যুর সংখ্যা বাড়তে থাকে। ২০১৭ সালে চিকুনগুনিয়া রোগ দেখা দিলে একই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
টিআইবির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে মশা নিধনের ওষুধ ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন ডকইয়ার্ড অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেড নামের যে প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা দেয় তাদের কাছ থেকেই অনিয়মের মাধ্যমে প্রতি লিটার ওষুধ কিনতে ৩৭৮ টাকায় সরাসরি কার্যাদেশ দেয় দক্ষিণ সিটি করপোরেশন। অথচ লিমিট এগ্রো নামে আরেকটি প্রতিষ্ঠান ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের কাছে একই ওষুধ ২১৭ টাকা দরে বিক্রি করে। এতে লিটারপ্রতি ১৬১ টাকা করে অতিরিক্ত ৬ কোটি ৪৪ লাখ টাকার দুর্নীতি হয়েছে।
এডিস মশার কীটনাশক নিবন্ধনে অনিয়ম ও দুর্নীতি প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, যেকোনো প্রতিষ্ঠানকে কীটনাশক আমদানি ও উৎপাদনের জন্য কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর থেকে নিবন্ধন নিতে হয়। কিন্তু এতে ব্যাপক দুর্নীতির ঘটনা ঘটছে। নিবন্ধন পাওয়া অনেক প্রতিষ্ঠান ঘুষ দিয়ে নতুন প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন আটকে রাখে। টিআইবির গবেষণার সময় একজন ব্যক্তি জানিয়েছেন, নিবন্ধন পেতে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সংশ্লিষ্ট বিভাগের সঙ্গে কথা বলতেই ৫ হাজার টাকা ঘুষ দিতে হয়। এরপর প্রতি ধাপেই ঘুষ দিতে হয়। সর্বশেষ নিবন্ধন পেতে ২-৩ লাখ টাকা ঘুষ লাগে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৯ সালে প্রাক বর্ষা মৌসুমে ঢাকায় এডিস মশার লার্ভার ঘনত্ব ছিল গড়ে ২১ শতাংশ। একটি এলাকার পাত্রে ২০ শতাংশের বেশি এডিস লার্ভা পাওয়া গেলে তা ক্ষতিকর মাত্রা বলে ধরা হয়। ৩১ জুলাই থেকে ৪ আগস্ট সময় পর্যন্ত ঢাকার ১৪টি স্থানে করা জরিপে ৮০ শতাংশের বেশি এডিস লার্ভা পাওয়া যায়। এই জরিপ ঢাকার বাইরে না হওয়ায় সারা দেশে এডিস মশার বিস্তার সম্পর্কে জানা সম্ভব হয়নি। এতে অন্যান্য জেলায় আগাম সতর্কবার্তা দেওয়া যায়নি। এছাড়া মশা নিধনের অনেক যন্ত্র বাংলাদেশে পাওয়া গেলেও দুর্নীতি করতে পরিকল্পনা ছাড়াই বিদেশ থেকে মেশিন ক্রয় করা হয়। কীটনাশক ও ফগার মেশিনের জ¦ালানি ব্যবহার না করে বাজারে বিক্রি করে দেওয়া হয়, লার্ভাসাইড ব্যবহার না করে ফেলে দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। এতে বিপুল আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। ভবনের নিচ বা গ্যারেজে ফগার মারতে মাঠকর্মীরা ৫-২০০ টাকা পর্যন্ত ঘুষ নিয়েছে বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়।
ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে টিআইবির প্রতিবেদনে বেশকিছু সুপারিশ করা হয়েছে। এতে সব অংশীজন নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে এডিস মশা নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবস্থাপনা কৌশল প্রণয়ন, অংশীজনদের নিজস্ব পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনা নিশ্চিতকরণ, সিটি করপোরেশনকে পরিবেশবান্ধব কার্যক্রম গ্রহণ, দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনা, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় জনশক্তি বৃদ্ধিসহ বেশকিছু সুপারিশ করা হয়েছে।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্বে অবহেলা, দুর্নীতির কারণে এই সংকট ভয়াবহও আকার ধারণ করে। এই পরিস্থিতি যে সৃষ্টি হবে এর পূর্বাভাস সিটি করপোরেশনের কাছে ছিল। কিন্তু নির্বাচনের বছর বলে এটি প্রকাশ করা হয়নি। অর্থাৎ রাজনৈতিক স্বার্থের হাতে এডিস মশা নিয়ন্ত্রণ জিম্মি হয়ে পড়েছে। এতে বহু লোকের প্রাণহানি হয়েছে।
তিনি বলেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের মাত্রা ছাড়িয়ে যাওয়ার পরও দায়িত্ব এড়িয়ে গেছে প্রশাসন। সর্বক্ষেত্রে দুর্নীতির অব্যবস্থাপনা ছিল লক্ষণীয়। সর্বশেষ নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকতে জনগণের ওপর দায় চাপিয়ে জরিমানা শুরু করে। অর্থাৎ ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সার্বিক অব্যবস্থাপনার কারণে দেশব্যাপী এ রোগ ছড়িয়ে পড়ে।
টিআইবির প্রতিবেদনের বিষয়ে জানতে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র সাঈদ খোকন বা দায়িত্বশীল কারও সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।