বাসায় অভিযান চালিয়ে প্রায় পাঁচ কোটি টাকা, আট কেজি সোনা ও ছয়টি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধারের ঘটনায় গেণ্ডারিয়া থানা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি এনামুল হক এনু এবং তার ভাই যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক রুপন ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে তিনটি মামলা
করেছে র্যাব। গতকাল বুধবার রাতে রাজধানীর সূত্রাপুর ও গেণ্ডারিয়া থানায় মানিলন্ডারিং ও অস্ত্র আইনে এসব মামলা হয়। মামলাগুলোতে আওয়ামী লীগ নেতা এনামুল হক এনু, তার ভাই রুপন ভূঁইয়া এবং এনুর বন্ধু হারুনুর রশীদ ও কর্মচারী আবুল কালাম আজাদকে আসামি করা হয়েছে।
র্যাব-৩ এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল কে এম শফিউল্লাহ দেশ রূপান্তরকে জানান, মামলার আসামিদের মধ্যে এনামুল হক এনু সপ্তাহখানেক আগে থাইল্যান্ডে পাড়ি জমিয়েছেন বলে তাদের কাছে তথ্য রয়েছে। তবে রুপন ভূঁইয়াসহ অন্য আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।
মামলা দায়েরে বিলম্বের কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে র্যাব কর্মকর্তা শফিউল্লাহ বলেন, ‘অভিযানের পর মামলার জন্য অনেক কাগজপত্র তৈরি করতে হয়। আমাদের টিমের সদস্যরা এই কাজে ব্যস্ত ছিল। রুপনসহ যারাই এর সঙ্গে জড়িত তাদের সবাইকে আমরা আইনের আওতায় নিয়ে আসব।’
এর আগে গেণ্ডারিয়ায় আওয়ামী লীগ নেতা দুই সহোদর এবং তাদের এক কর্মচারী ও বন্ধুর বাসায় অভিযান চালিয়ে প্রায় পাঁচ কোটি টাকা, আট কেজি সোনা এবং ছয়টি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করে র্যাব। গত সোমবার মধ্যরাত থেকে শুরু হয়ে পরদিন মঙ্গলবার বিকেল ৪টা পর্যন্ত চলে এসব অভিযান। এই দুই আওয়ামী লীগ নেতা গেণ্ডারিয়া থানা কমিটির সহ-সভাপতি এনামুল হক এনু এবং তার ভাই একই কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক রুপন ভূঁইয়া ঢাকা ওয়ান্ডারার্স ক্লাবের শেয়ারহোল্ডার ও নিয়ন্ত্রক। যেখানে ক্লাবের নামে অবৈধ ক্যাসিনো ব্যবসা চালানো হতো।
জুয়ার টাকায় দুই ভাইয়ের বিলাসী জীবনযাপন : ক্যাসিনো ও জুয়ার টেবিল থেকে আয় করা টাকায় আওয়ামী লীগ নেতা এনু ও রুপন বিলাসী জীবনযাপন করতেন বলে র্যাব কর্মকর্তারা দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন। তারা অবৈধ অস্ত্র দেখিয়ে এলাকার সাধারণ মানুষকে ভয়ভীতি দেখাতেন। নির্দিষ্ট কোনো পেশা না থাকলেও এই দুই ভাই বিপুল পরিমাণ নগদ টাকা, ঢাকায় ১৫টি বাড়ি এবং কমপক্ষে ৫০টি ফ্ল্যাটের মালিক। জুয়া আর ক্যাসিনোই তাদের এসব অর্থ-সম্পদ অর্জনের উৎস বলে মনে করছে র্যাব।
নিজেদের মালিকানাধীন সূত্রাপুরের বানিয়ানগরের ৩১ নম্বর বাড়িতে এনু-রুপন কেউ থাকেন না। ছয়তলা ভবনটিতে থাকেন তাদের আত্মীয়স্বজন। এই ভবনের দ্বিতীয় ও পঞ্চম তলায় এনুর শ্যালক ও শাশুড়ি থাকেন। এই বাড়িরই দ্বিতীয় তলায় একটি এবং তৃতীয় তলায় দুটি সিন্দুক পাওয়া গেছে। এই দুই ফ্ল্যাটেই পাওয়া যায় ৭৩০ ভরি সোনা।
এনুর সহযোগী আবুল কালাম ওরফে কালার বাসায় একটি সিন্দুক পাওয়া গেছে। যার মালিক এনু। সেটি থেকে দুই কোটি টাকা, একটি অবৈধ অস্ত্র ও ১৮ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়। স্থানীয়রা জানান, কালা দীর্ঘদিন ধরে ওয়ারীর টিপু সুলতান রোডে লেদ মেশিনের দোকান চালাতেন। হঠাৎ করে দোকান বন্ধ করে মতিঝিলের একটি প্রতিষ্ঠানে চাকরি নেওয়ার কথা এলাকায় জানিয়েছিলেন তিনি। এনু ও রুপনের কর্মচারী এই কালা। বিশ্বস্ত কর্মচারী হওয়ায় কালার বাসায় রাখা হয় একটি সিন্দুক।
নারিন্দার শরৎ গুপ্ত রোডের ২২/১ বাসার দোতলায় একটি সিন্দুক থেকে দুই কোটি টাকা উদ্ধার করা হয়। এই বাসাটি এনুর বন্ধু হারুন অর রশীদের। হারুন ওয়ারী আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি বলে জানা গেছে। কয়েক দিন আগে এনু সিন্দুকটি হারুনের বাসায় রেখে আসেন। লাল মোহনদাস লেনের পাশেই এনু-রুপনের রয়েছে ১০তলা একটি বাড়ি। মমতাজ ভিলা নামে ১০৬ নম্বর হোল্ডিংয়ের এই বাড়িটি এনু ও রুপন মিলে নির্মাণ করেছেন। সেকেন্দার আলী নামে স্থানীয় এক বাসিন্দা দেশ রূপান্তরকে জানান, ১০তলা ভবনটির পুরোটাই ব্যবহার করছেন দুই ভাই এনু ও রুপন। দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলায় দুই ভাই রাজকীয়ভাবে থাকেন। বাকি ফ্ল্যাটগুলো খালি থাকলেও ভাড়া দেওয়া হয় না। তবে কয়েকটি ফ্ল্যাটে থাকেন এনু-রুপনের আত্মীয়স্বজনরা। তারা মূলত দুই ভাইয়ের সহযোগী হিসেবেই কাজ করেন।
দেশ রূপান্তরের অনুসন্ধানে জানা যায়, এনু ও রুপনরা ছয় ভাই। ১৯৮৫ সাল থেকেই এনামুল ওয়ান্ডারার্স ক্লাব ও রুপন আরামবাগ ক্লাবে জুয়া খেলতেন। একটা সময় তারা জুয়ার বোর্ডের মালিক বনে যান। সেখান থেকে আসতে থাকে নগদ টাকা। সেই টাকাতেই ঢাকা শহরের বিভিন্ন জায়গায় একের পর এক ফ্ল্যাট ও বাড়ি কিনেছেন এনু-রুপন। বানিয়া নগরের বাড়িটি দেড় বছর আগে হারুনুর রশীদ নামে একজনের কাছ থেকে তারা কিনেছেন। জুয়ার বোর্ড থেকে যে টাকা আসত, সেই টাকার একটি অংশ এনু ও রুপন বাসাতেই রাখতেন।