সারা দেশের ক্লাব ও ক্যাসিনোগুলোতে অভিযানের অংশ হিসেবে সম্প্রতি চট্টগ্রাম আবাহনী লিমিটেড কার্যালয়ে পুলিশি অভিযানের পর সেই ক্লাবের আর্থিক লেনদেন নিয়ে দ্বন্দ্ব দেখা দিয়েছে। ক্লাবটির কর্মকাণ্ড নিয়ে বর্তমান পরিচালনা পর্ষদের সঙ্গে প্রতিষ্ঠাকালীন মহাসচিব ও ফুটবল কমিটির চেয়ারম্যানের মধ্যে বিরোধ নিয়ে কথোপকথনের একটি অডিও
ক্লিপ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। সেখানে চট্টগ্রাম আবাহনী লিমিটেডের প্রতিষ্ঠাতা মহাসচিব এবং নগর আওয়ামী লীগের যুব ও ক্রীড়া সম্পাদক দিদারুল আলম দিদারকে কুরুচিপূর্ণ কথাবার্তাসহ নানা হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে ক্লাবটির বর্তমান পরিচালক নাজমুল করিম চৌধুরী শারুনের বিরুদ্ধে। শারুন একই ক্লাবের বর্তমান মহাসচিব ও জাতীয় সংসদের হুইপ শামসুল হক চৌধুরীর ছেলে। বর্তমানে ক্লাবটির সভাপতির দায়িত্বে রয়েছেন সাংসদ এম এ লতিফ।
মোবাইল ফোনে হুইপপুত্র শারুনর হুমকির প্রতিকার ও নিরাপত্তা চেয়ে আওয়ামী নেতা দিদারুল আলম দিদার গত ১৯ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম নগরের পাঁচলাইশ থানায় একটি লিখিত অভিযোগ করেছেন। এতে দিদারুল আলম বলেন, চট্টগ্রাম আবাহনীর উদ্যোক্তা ও প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক তিনি। ২০০৭ সালে তাকে এই পদ থেকে সরিয়ে ফুটবল কমিটির সভাপতির দায়িত্ব দেওয়া হয়। পরে ‘চট্টগ্রাম আবাহনী ফুটবল কমিটি’ নামে প্রিমিয়ার ব্যাংকের জিইসি মোড় ব্রাঞ্চে একটি যৌথ অ্যাকাউন্ট খোলা হয়। যেখানে সভাপতি হিসেবে তার (দিদার), মহাসচিব শামসুল হক চৌধুরী (বর্তমান সংসদের হুইপ) এবং ম্যানেজার সাইফুদ্দিনের স্বাক্ষরে সব ধরনের লেনদেন করার কথা ছিল। পরে বহুদিন ধরে তার (দিদার) সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ রেখে ওই হিসাবে অনেক কালো টাকা লেনদেন হয়। এ সংবাদ পেয়ে হিসাবটির লেনদেন বন্ধের আবেদন করেন দিদার। এর পরিপ্রেক্ষিতে ব্যাংক কর্র্তৃপক্ষ লেনদেন বন্ধ করে দেয়। সেই হিসাবটি বন্ধ করায় ক্ষিপ্ত হয়ে শামসুল হক চৌধুরীর ছেলে দিদারকে নানা হুমকি দেন। বর্তমানে আবাহনী ক্লাবে জুয়ার আসরসহ বিভিন্ন অপকর্মের মাধ্যমে প্রতিরাতে ৬ লাখ টাকা করে আয় হয় বলেও থানায় দেওয়া অভিযোগে উল্লেখ করেন আওয়ামী লীগ নেতা দিদার।
দিদার ও শারুনের মধ্যে কথোপকথনের অডিওটি এই প্রতিবেদকের কাছে সংরক্ষিত আছে। সেখানে তাদের দুজনের মধ্যে কথোপকথনের একপর্যায়ে বর্তমান সংসদের হুইপ শামসুল হক চৌধুরীকে জাতীয় পার্টি থেকে এসে আওয়ামী লীগের এমপি হয়েছেন বলে উল্লেখ করেন দিদার। পরে একপর্যায়ে শারুন উত্তেজিত হয়ে ‘দিদারকে রাস্তাঘাটে লোকজন মারধর করবে’ বলতে শোনা যায়।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে দিদারুল আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আবাহনী ক্লাবে জুয়ার আসর বসার খবর পেয়েছি। সেই জুয়ার আসর থেকে প্রতি রাতে ৬ লাখ টাকা করে পান শামসুল হক চৌধুরী। সেখান থেকে ২ লাখ টাকা বিভিন্ন খাতে খরচ করা হয়। মূলত মাসে কোটি টাকা আয় হতো জুয়ার আসর থেকে। সেই খবর থেকে আমি অ্যাকাউন্টটি বন্ধ করতে ব্যাংকে আবেদন করেছি। আমি যেহেতু এখন দায়িত্বে নেই, সেহেতু আমার নামের অ্যাকাউন্টে কেন টাকা জমবে। তাই অ্যাকাউন্ট বন্ধ করতে ব্যাংকে আবেদন করায় ক্ষিপ্ত হয়ে আমাকে শারুন ফোনে হুমকি-ধমকি দিয়েছে। সে আমাকে রাস্তাঘাটে মারবে বলেছে। তাই নিরাপত্তা চেয়ে থানায় অভিযোগ দিয়েছি। আমি প্রশাসনের কাছে নিরাপত্তা চাই।’
অন্যদিকে হুইপপুত্র নাজমুল করিম চৌধুরী শারুন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ওনি আমাকে ফোন করেছেন, আমি করিনি। আমি অনেক সুন্দর করেই কথা বলেছি। ওনি আমার মুরব্বি মানুষ। প্রথমে ওনি ফোন করে ব্যবসায়িক কথাবার্তা বলার একপর্যায়ে আমার বাবাকে (হুইপ শামসুল হক চৌধুরী) নানাভাবে হেয় করে কথা বলেছেন। আমি ওনাকে বুঝানোর চেষ্টা করেছি। ওনি পরিকল্পনা করে ফোন করে এখন রেকর্ডটি ভাইরাল করেছেন। যদিও ওই রেকর্ডে ওনি যে আমার বাবা ও আওয়ামী লীগকে হেয় করে কথা বলেছেন, তা কেটে ফেলেছেন। তখন আমি একপর্যায়ে বলেছি, আপনার এই চরিত্রের কারণে রাস্তাঘাটে লোকজন আপনাকে মারধর করবে। এর আগেও ওনি অনেকবার আবাহনী ক্লাব নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় মিথ্যে অভিযোগ দিয়েছিলেন। এখন মূলত সামনে শেখ কামাল ফুটবল টুর্নামেন্টকে পণ্ড করতেই এসব ঘটনা সাজিয়েছে।’
গত ২১ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম আবাহনী ক্লাবসহ আরও তিনটি ক্লাবে র্যাব ও পুলিশ অভিযান চালায়। এ সময় সেখান থেকে কাউকে আটক করতে না পারলেও জুয়া খেলার সরঞ্জাম উদ্ধার করে পুলিশ। পরে চলমান এই অভিযানের বিষয়ে আবাহনী ক্লাবের মহাসচিব ও সংসদের হুইপ শামসুল হক চৌধুরী ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, ‘ক্যাসিনোর বিরুদ্ধে, মদের বিরুদ্ধে, সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে অভিযান চলবে। কিন্তু জুয়ার নামে ক্লাবগুলোতে অভিযান মানা যায় না। আমাদের ক্লাবে (আবাহনী) ক্যাসিনো নেই, জুয়া নেই, মদ নেই। ক্লাবের মহাসচিব হিসেবে মনে করি এতে সম্মানহানি হয়েছে।