‘মুমিনের কাছে গোনাহ যেন পতনোন্মুখ পাহাড়, যার পাদদেশে সে বসা; যে কোনো মুহূর্তে তা ভেঙে পড়তে পারে তার ওপর (ধ্বংস করে দিতে পারে তাকে)। আর ফাসেক-ফাজেরের কাছে গোনাহ যেন নাকের ওপর দিয়ে উড়ে যাওয়া সামান্য মাছির মতো। -সহিহ বোখারি: ৬৩০৮। হ্যাঁ, প্রকৃত মুমিনের কাছে গোনাহ এমনই। গোনাহকে মুমিন পাহাড়সম বোঝা হিসেবে দেখে। কোনো পাপ হয়ে গেলে ব্যথিত হয়, কষ্টে থাকে। সীমাহীন অনুশোচনা, আফসোস ও আক্ষেপ করতে থাকে, কেন পাপে জড়ালাম! আর এটাই ইমানের আলামত। এক সাহাবি নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এসে জিজ্ঞেস করল, ইমান (এর আলামত) কী? নবী করিম (সা.) উত্তরে বললেন, যদি তোমার নেক আমল তোমাকে আনন্দিত করে এবং তোমার পাপ তোমাকে ব্যথিত করে (পাপ হয়ে গেলে তুমি কষ্টে ভুগতে থাক)। তাহলেই (বুঝবে) তুমি মুমিন। -মুসনাদে আহমাদ : ২২১৬৬। আমরা মানুষ। মানুষ মাত্রই ভুল করে। শয়তানের ধোঁকায়, নফসের প্ররোচনায়, ইচ্ছায়-অনিচ্ছায় গোনাহ হয়ে যায়। কিন্তু আশার কথা হলো- আল্লাহতায়ালা মানুষের জন্য রেখেছেন পাপ মোচনের অগণিত পথ। যে কোনো পাপ মোচনের জন্য আল্লাহ খোলা রেখেছেন তওবার দরজা, যা বান্দার পাপ মোচন করে দেয় এবং শয়তানকে ব্যর্থ করে দেয়। সেই সঙ্গে বিভিন্ন উপলক্ষে, বিভিন্ন নেক আমল দ্বারাও আল্লাহতায়ালা বান্দার পাপ মোচন করেন।
তওবা : বিভিন্ন নেক আমল দ্বারা সগিরা (ছোট) গোনাহগুলো মিটে যায় কিন্তু তওবা সগিরা-কবিরা সব গোনাহ মাফ করে দেন। তওবার মাধ্যমে মহাপাপীও হয়ে যেতে পারে গোনাহমুক্ত। হাদিস শরিফে ইরশাদ হয়েছে, ‘গোনাহ থেকে তওবাকারী গোনাহমুক্ত ব্যক্তির মতো।’ -সুনানে ইবনে মাজাহ: ৪২৫০। প্রকৃত মুমিন গোনাহ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তওবা করে নেয়। কোরআনে কারিমে আল্লাহতায়ালা মুমিনের এ গুণের কথা বর্ণনা করেছেন এভাবে, ‘এবং তারা সেই সব লোক, যারা কখনো কোনো অশ্লীল কাজ করে ফেললে বা (অন্য কোনোভাবে) নিজেদের প্রতি জুলুুম করলে সঙ্গে সঙ্গে আল্লাহকে স্মরণ করে এবং তার ফলে নিজেদের গোনাহের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে। আল্লাহ ছাড়া আর কে আছে, যে গোনাহ ক্ষমা করতে পারে? আর তারা জেনেশুনে তাদের কৃতকর্মে অবিচল থাকে না।’ -সুরা আলে ইমরান: ১৩৫। আর আল্লাহতায়ালাও বান্দার তওবা কবুলের জন্য তার ক্ষমার হাত প্রসারিত করে রাখেন, দিনে-রাতে, সর্বদা। হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, ‘আল্লাহতায়ালা রাতে তার (ক্ষমার) হাত প্রসারিত করেন, যাতে দিনে যারা পাপ করেছে তারা তওবা করতে পারে। আর দিনে তার (ক্ষমার) হাত প্রসারিত করেন, যাতে রাতে যারা পাপ করেছে তারা তওবা করতে পারে। এভাবে (তার অবারিত ক্ষমা) চলতে থাকবে সূর্য পশ্চিম (কিয়ামতের আগ পর্যন্ত) দিক থেকে উদিত হওয়া পর্যন্ত।’ -সহিহ মুসলিম : ২৭৫৯
নেক আমল : কোনো পাপ হয়ে গেলে মুুমিনের করণীয় কী? এ বিষয়ে কোরআন-হাদিসে বলা হয়েছে, পাপ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তো মুমিন অস্থির হয়ে যায় তা মোচনের জন্য। তওবা এবং নেক আমল দ্বারা সেটি মেটানো যায়। কোরআনে কারিমে ইরশাদ হয়েছে, ‘তুমি নামাজ কায়েম করো দিনের দুই প্রান্তভাগে এবং রাতের প্রথমাংশে। অবশ্যই নেক আমল পাপসমূহ মিটিয়ে দেয়। যারা উপদেশ গ্রহণ করে, এ তাদের জন্য এক উপদেশ।’ -সুরা হুদ: ১১৪ । সুতরাং বেশি বেশি নেক আমল করা চাই, নেক আমলের প্রতি যত্নবান হওয়া চাই। কোনো পাপ হয়ে গেলে সঙ্গে সঙ্গে তওবা করা চাই। হজরত নবী করিম (সা.) সাহাবি হজরত আবু জর (রা.)-কে একবার এ উপদেশই দিয়েছেন। বলেন, হে আবু জর! যেখানেই থাকো আল্লাহকে ভয় করো এবং কোনো পাপ হয়ে গেলেই নেক আমল করো; তা তোমার পাপ মিটিয়ে দেবে।’ -জামে তিরমিজি: ১৯৮৭। যে সব নেক আমল দ্বারা পাপ মিটে যায় এর অন্যতম হলো নামাজ। নামাজের মাধ্যমে মাফ চাইলে আল্লাহ দ্রুত মাফ করেন। হজরত আবু বকর (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি হজরত রাসুলুল্লাহকে (সা.) বলতে শুনেছেন, কারও কোনো পাপ হয়ে গেলে সে যদি উত্তমরূপে অজু করে এবং দুই রাকাত নামাজ পড়ে আল্লাহর কাছে মাফ চায় আল্লাহ তাকে মাফ করে দেন। -মুসনাদে আহমাদ: ২
লেখক : মুফতি ও ইসলামবিষয়ক লেখক