জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ নম্বরে কল দিয়ে অভিযোগ করায় গাইবান্ধার সাদুল্লাপুরে শাম্মী আক্তার (২১) নামে এক কলেজছাত্রীকে ধরে নিয়ে গিয়ে মারধর ও মিথ্যা মামলায় ফাঁসানোর অভিযোগ উঠেছে ধাপেরহাট পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের ইনচার্জ নওয়াবুর রহমানের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় ওই পুলিশ কর্মকর্তাকে প্রত্যাহার করে গাইবান্ধা পুলিশ লাইনসে সংযুক্ত করা হয়েছে। নির্যাতনের বিচার দাবিতে পুলিশের রংপুর রেঞ্জের ডিআইজি ও গাইবান্ধার পুলিশ সুপারের কাছে লিখিত অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগী ওই কলেজছাত্রী।
নিজের ওপর চলা নির্যাতনের বর্ণনা দিয়ে ধাপেরহাট ইউনিয়নের পালানপাড়া গ্রামের ভুক্তভোগী শাম্মী আক্তার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গত ৩ সেপ্টেম্বর সকাল ৯টার দিকে প্রতিবেশী শংকর চন্দ্র রায়, প্রভাত চন্দ্র রায় ও প্রকাশ চন্দ্র রায়সহ তার সহযোগীরা আমাদের বসতভিটা দখল করার উদ্দেশ্যে বাড়িঘর ভাঙচুর শুরু করলে ধাপেরহাট পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের ইনচার্জ নওয়াবুর রহমানকে জানানো হয়। অনেকটা সময় পেরিয়ে গেলেও পুলিশ না আসায় ৯৯৯ নম্বরে কল দিই। দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হলেও পুলিশ না আসায় আবারও ৯৯৯ নম্বরে কল দিই আমি। এর আধা ঘণ্টা পর পুলিশ আসে। কিন্তু তাদের (হামলাকারী) বিরুদ্ধে কোনো আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করে না।’
ঘটনার দিন রাতে দুপক্ষকে নিয়ে বসার জন্য ফাঁড়িতে ডাকা হলে পরিবারের সদস্যসহ ফাঁড়িতে যান উল্লেখ করে শাম্মী বলেন, ‘ রাতে ইনচার্জ নওয়াবুর রহমান আমাদের বলেন, সাদুল্লাপুর থানার ওসি মাসুদ রানা বলেছেন যে বসতভিটা শংকর, প্রভাত ও প্রকাশরা দখল করবে। এতে কোনো বাধা দেওয়া যাবে না। তার মুখে এ কথা শুনে আমরা অসহায় হয়ে পড়ি। এ সময় আবারও ৯৯৯ নম্বরে কল দিয়ে পরামর্শ চাইলে তারা সার্কেল পুলিশের কাছে যেতে বলেন। পরদিন ৪ সেপ্টেম্বর আমরা পুলিশ সুপারের সঙ্গে দেখা করলে আমাদের বসতভিটা সরিয়ে নিতে সময় দেওয়া হয় এবং বিষয়টি পুলিশ সুপার নওয়াবুর রহমানকে জানান। কিন্তু আমরা বাড়িতে ফিরে গিয়ে দেখি তারা আবারও আমাদের ঘরবাড়ি ভাঙচুর করে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।’
এ ঘটনায় ধাপেরহাট পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রে তার মা চায়না বেগম একটি অভিযোগ দায়ের করার পর কয়েক দিন পেরিয়ে গেলেও পুলিশ কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি অভিযোগ করে ভুক্তভোগী কলেজছাত্রী আরও বলেন, ‘তারপর ১০ সেপ্টেম্বর সাদুল্লাপুর থানায় অভিযোগ দিতে গেলে ওসি বলেন, গাইবান্ধা জজ কোর্টে মামলা করার জন্য। পরদিন ১১ সেপ্টেম্বর গাইবান্ধা কোর্টে হাজির হয়ে মামলা করা হয়। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে পরদিন ১২ সেপ্টেম্বর সকালে নওয়াবুর রহমান কয়েকজন পুলিশসহ আমাদের বাড়িতে আসেন। নওয়াবুর রহমান বলেন, তোর বাবা-মা কোথায়। আমি বলি, তারা গাইবান্ধায় গেছেন। ইনচার্জ আবার বলেন, তুই চল ফাঁড়িতে। আমি জানতে চাই কেন। তখন ইনচার্জ বলেন, কেন তোর...(অশ্লীল গালি) মধ্যে দিয়ে দেখাব। আমি জিজ্ঞাসা করি, আমার নামে কি কোনো মামলা আছে? আমি কি আসামি? আমার নামে কি মামলা আছে?’
জবাবে পুলিশ পরিদর্শক নওয়াবুর রহমান গালিগালাজ শুরু করেন জানিয়ে শাম্মী বলেন, ‘নওয়াবুর বলেন, শালি, তুই পুলিশের বিরুদ্ধে ৯৯৯-এ ফোন করিস। তোকে ফাঁড়িতে নিয়ে তোর...মধ্যে ডিম ভেঙে দিয়ে ওয়ারেন্ট দেখাব। ফাঁড়িতে চল। এ ছাড়া আরও নানান অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করতে থাকেন। আমাকে জোর করে ফাঁড়িতে নিয়ে গিয়ে মহিলা গ্রাম পুলিশ দিয়ে মারধর শুরু করেন। পরে ফাঁড়িতে নিয়ে এসে নওয়াবুর রহমান আরও বলেন, শুয়োরের বাচ্চা, ৯৯৯-এ ফোন দিস। মাতব্বর হইছিস। জেলের ভাত খাইছিস কখনো? আজ গিয়ে খা। কেমন মজা দেখ গিয়ে। পরে শংকর, প্রভাত ও প্রকাশদের ডেকে তাদের বাড়িঘর ভাঙচুরের একটি মিথ্যা অভিযোগ লিখে নিয়ে আমাকে সাদুল্লাপুর থানায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়। পরে সেখান থেকে আমাকে আদালতে পাঠানো হলে আমি জামিনে মুক্ত হই।’
এ অভিযোগ সম্পর্কে জানতে নওয়াবুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি। তবে ধাপেরহাট পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের বর্তমান ইনচার্জ শহীদুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘শাম্মী আক্তারসহ তার পরিবারের বিরুদ্ধে শংকর ও প্রভাতদের বাড়িঘর ভাঙচুরের একটি মামলা আছে। আমরা সেটির তদন্ত করছি।’
অন্যদিকে গাইবান্ধার পুলিশ সুপার মুহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রশাসনিক কারণে নওয়াবুর রহমানকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। ৯৯৯ নম্বরে কল দেওয়ার বিষয়ে তাকে প্রত্যাহার করা হয়নি। ৯৯৯ কল দিয়ে অভিযোগ দেওয়া সংক্রান্ত বিষয়ে শাম্মী আক্তার নামে একজন একটি অভিযোগ দিয়েছেন। সেটি তদন্ত করার জন্য একজন কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। ওই কর্মকর্তা সরেজমিনে গিয়ে তদন্ত করে একটি রিপোর্ট দেবেন। তারপর সেই অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’