২ সদস্যকে জিজ্ঞাসাবাদে সিটিটিসির পাওয়া তথ্য

দেশলাইয়ের বারুদে আইইডি তৈরি করত নব্য জেএমবি

দেশলাইয়ে ব্যবহৃত বারুদ দিয়ে ইম্প্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস (আইইডি) নামে পরিচিত বিশেষ ধরনের বোমা তৈরি করত নব্য জামা’আতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ বা নব্য জেএমবির সদস্যরা। খোলাবাজার থেকে বিপুল পরিমাণ দেশলাই কিনে সেগুলোর কাঠি থেকে এই বারুদ সংগ্রহ করত তারা। পরে অন্যান্য উপকরণের সমন্বয়ে দূরনিয়ন্ত্রিত নিম্নমাত্রার আইইডি তৈরি করা হতো। সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার একটি জঙ্গি আস্তানায় ঢাকা মহানগর  পুলিশের (ডিএমপি) কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিট অভিযান চালিয়ে নব্য জেএমবির দুই সদস্যকে গ্রেপ্তার করে। তাদের জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের উদ্ধৃতি দিয়ে সিটিটিসি কর্মকর্তারা দেশ রূপান্তরকে এসব তথ্য জানিয়েছেন।

সিটিটিসি কর্মকর্তারা জানান, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর নজরদারির কারণে জঙ্গি সংগঠনগুলো খোলাবাজার থেকে কিংবা অন্য কোনো মাধ্যমে উচ্চমাত্রার বিস্ফোরক উপাদান সংগ্রহ করতে পারছে না। তা ছাড়া বোমা তৈরিতে দক্ষ জঙ্গিদের বেশির ভাগ গ্রেপ্তারের পর কারাবন্দি থাকার কারণে তারা সহজলভ্য উপকরণ দিয়ে নিম্নমাত্রার বিস্ফোরক ব্যবহার করে আইইডি তৈরির চেষ্টা করছে। পুলিশের মনোবল ভেঙে দিতে ও জনমনে ভীতি সঞ্চারের উদ্দেশ্যেই তারা হামলা চালিয়ে আসছিল। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় পুলিশের ওপর পরপর বেশ কয়েকটি হামলার ঘটনার তদন্তের সূত্র ধরে সিটিটিসি ২৪ সেপ্টেম্বর ফতুল্লার ওই জঙ্গি আস্তানায় অভিযান চালায়। সেখান থেকে গ্রেপ্তার করা হয় নব্য জেএমবির সদস্য ও বেসরকারি একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ফরিদ উদ্দিন রুমি এবং তার সহযোগী মিশুক খান ওরফে মিজানকে। এ ছাড়া আস্তানাটি থেকে সেদিন তাদের তৈরি একাধিক শক্তিশালী আইইডি ও মজুদকৃত বিস্ফোরক নিষ্ক্রিয় করেন সিটিটিসির বোম্ব ডিজপোজাল ইউনিটের সদস্যরা।

এরই ধারাবাহিকতায় গ্রেপ্তার রুমি ও মিজানকে গুলিস্তানে পুলিশের ওপর হামলা মামলার আসামি দেখিয়ে আদালতে হাজির করে চার দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছেন সিটিটিসি কর্মকর্তারা। রিমান্ড শেষে আজ শনিবার রুমি ও মিজান আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিতে পারেন বলে সিটিটিসি কর্মকর্তারা দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন।

রুমি ও মিজানকে জিজ্ঞাসাবাদে অংশ নেওয়া সিটিটিসির এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গ্রেপ্তার এই দুই জঙ্গি গুলিস্তানে পুলিশের ওপর হামলার কথা স্বীকার করেছে। এ ছাড়া তাদের অন্য সদস্যরা বোমা তৈরির বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছে। শনিবার আদালতে জবানবন্দি দেওয়ার পর বাকি চার মামলার আসামি হিসেবে তাদের ফের রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন করা হবে।’

সিটিটিসির এই কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘নব্য জেএমবির এই জঙ্গিদের ব্যবহৃত আইইডিতে বিভিন্ন বিস্ফোরকের পাশাপাশি তারা বিয়ারিংয়ের বল ও লোহার পেরেকের টুকরো স্পিøন্টার হিসেবে ব্যবহারের কথা জানিয়েছে।’

ফতুল্লার আস্তানা থেকে গ্রেপ্তার এই দুই জঙ্গিকে জিজ্ঞাসাবাদে অংশ নেওয়া সিটিটিসির আরেক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গুলিস্তানে পুলিশকে টার্গেট করে যে আইইডি ব্যবহার করা হয়েছিল, সেটির বিস্ফোরক দেশলাইয়ের কাঠি থেকে সংগ্রহ করেছিল জঙ্গিরা। এরপর মালিবাগের আইইডি ছিল আরও উন্নত। তারপর এরা ধীরে ধীরে শক্তিশালী আইইডি তৈরিতে সক্ষম হয়। ফতুল্লার বাসা থেকে যে তিনটি আইইডি উদ্ধার করা হয়, সেগুলোও শক্তিশালী ছিল।’

সিটিটিসি কর্মকর্তারা আরও জানান, ফতুল্লার আস্তানায় যে তিনটি আইইডি উদ্ধারের পর ধ্বংস করা হয়, সেগুলোর কারিগরি দিক পরীক্ষা করে গুলিস্তানের হামলায় ব্যবহৃত আইইডির সঙ্গে মিল পাওয়া গেছে। এ ছাড়া অন্যান্য এলাকায় ব্যবহৃত আইইডির নমুনা নিয়েও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হচ্ছে।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে সিটিটিসির স্পেশাল অ্যাকশন গ্রুপের (এসএজি) অতিরিক্ত উপকমিশনার মোহাম্মদ ছানোয়ার হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অব্যাহত অভিযান ও নিরবচ্ছিন্ন গোয়েন্দা তৎপরতার কারণে নব্য জেএমবিসহ অন্য যেকোনো জঙ্গি সংগঠনের আগের মতো সাংগঠনিক ক্ষমতা আর নেই। বোমা তৈরিতে দক্ষ কারিগরও নেই। এ কারণে তারা সহজলভ্য উপকরণের সহায়তায় খুবই নিম্নমাত্রার আইইডি তৈরির চেষ্টা করে থাকে, যেগুলোর বিস্ফোরণে হতাহতের আশঙ্কা কম থাকে।’