চোষ্য আঙুল ও লেহ্য আঙুল

এই বাংলাদেশে যারা আঙুল চুষছেন, তারা আঙুল চুষেই যাচ্ছেন। চুষতে চুষতে আঙুলের ত্বক ও মাংস নিঃশেষ করেছেন। আঙুলের ছোট্ট সরু হাড় বেরিয়ে এসেছে। আবার এই বাংলাদেশেই আপনার চোখের সামনে কারও কারও আঙুল ফুলতে ফুলতে কলাগাছকেও ছাড়িয়ে যাচ্ছে। তখনো আপনি আঙুলের হাড় চুষছেন। সিগমুন্ড ফ্রয়েডের বইপত্র যারা ঘাঁটাঘাঁটি করেছেন, জিজ্ঞেস করে দেখুন, সঙ্গে সঙ্গে আদিম বাসনার সঙ্গে আপনার ও আমার আঙুল চোষাকে ব্র্যাকেটবন্দি করে ফেলবেন। আঙুলের গুরুত্ব আগেও ছিল, কিন্তু আঙুল চোষার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি এত দিন উপেক্ষিত ছিল। কিন্তু হালের ক্যাসিনোগেট স্ক্যান্ডাল বিষয়টিকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। চোখে শুধু আঙুলই দেয়নি, টেনে চোখে লাগানো ঠুলি খুলেছে, ছানির পর্দা টেনে ছিঁড়েছে। ক্যাসিনোগেট স্ক্যান্ডালের গেটটি আপনাতেই খোলেনি, প্রধানমন্ত্রী তার হুকুম তামিলকারীদের খুলতে বাধ্য করেছেন। তবে, এটি সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক আঙুলবিষয়ক একটি নিবন্ধ। এতে আঙুলের বিবিধ অর্থ ও বিবিধ ব্যবহার তুলে ধরা হবে।

 

সম্প্রতি সামাজিক মাধ্যমে লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির সবচেয়ে বিখ্যাত ভাস্কর্য নগ্ন ডেভিড বেশ ঘুরপাক খাচ্ছে। মার্বেল পাথরের এই ভাস্কর্যটির নিতম্বদেশে (ঠিক নিতম্বদেশে নয়, স্পষ্ট করে বলতে হলে গুহ্যদ্বারে) একটি আঙুল। আঙুলধারী আমার ও আপনার মতো বাঙালি। এই ছবিটির একটি ক্যাপশনেও আছে বাঙালির চরিত্র। আমাদের অভিধানে অন্তর্ভুক্ত না হলেও ‘অন্যের পাছায় আঙুল দেওয়া’র মতো একটি উপমা কথোপকথনে যথেষ্ট ব্যবহৃত হচ্ছে। গুহ্যদ্বার সফর করে আসা এই আঙুল কবিতায় যে কত সাধু ও প্রেমময়, বাংলা কবিতায় তা স্পষ্ট :

 

নিরাশ্রয় পাঁচটি আঙুল তুমি নির্দ্বিধায়

অলংকার করে নাও, এ আঙুল ছলনা জানে না।

একবার তোমার নোলক, দুল, হাতে-চুড়ি

কটিদেশে বিছা করে অলংকৃত হতে দিলে

বুঝবে হেলেন, এ আঙুল সহজে বাজে না।

একদিন একটি বেহালা নিজেকে বাজাবে বলে

আমার আঙুলে এসে দেখেছিল

তার বিষাদের চেয়ে বিশাল বিস্তৃতি

আমি তাকে চলে যেতে বলিনি তবুও

ফিরে গিয়েছিল সেই বেহালা সলাজে।

(হেলাল হাফিজ)

 

সোজা আঙুলে ঘি উঠে না, আঙুল যত বাঁকা করা যাবে, ঘি সম্ভবত তত বেশি উঠবে এমনই ধারণা নিয়ে আমার শৈশবে বাসে ধরা পড়া একজন সন্দেহভাজন পকেটমারকে পেটাতে দেখেছি। বয়স্ক একজন এক-একটা বিরাশি সিক্কা ঘুষি মারছেন আর বলছেন, সোজা আঙুলে ঘি উঠবে না জানি, বল মানিব্যাগ কোথায়? ওই সন্দেহভাজন তরুণ যদি মানিব্যাগ তার পেছনের পকেট থেকে তুলেও থাকে, তাহলে সে করেছে দুই আঙুলের কাজ। দুই আঙুলের কাজটিও যে একজন পেশাজীবী পকেটমারকে যথেষ্ট দক্ষতার সঙ্গে করতে হয়, এই স্বীকৃতি বাংলা অভিধান দেয়নি। ঘি যেমন সোজা আঙুলে ওঠে না, পকেট থেকে মানিব্যাগ তুলতেও আঙুলকে সোজা ও বাঁকা দুই-ই করতে হয়। বাঁকা আঙুল, অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কাটা আঙুলও কম কিছু নয়। বাউল আবদুল হামিদের এই গান কোন বাঙালির অন্তরে দোলা দেয়নি?

 

আঙুল কাটিয়া কলম বানাইয়া

নয়নের জলে একখান চিঠি লেইখাছি

আগে না জানিয়া পিরিতি করিয়া

কলঙ্কের মালা আমি গলে পরেছি।

 

সমস্যা মধ্য আঙুল নিয়ে। বুড়ো আঙুল দেখানো নিয়েও সংকট রয়েছে। তবে মধ্য আঙুলের মতো এতে অশ্লীলতা নেই। ইরান তো সেই কবে থেকে আমেরিকাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে চলেছে। কাঁচকলা দেখানো, পাত্তা না দেওয়া, এসব এক বুড়ো আঙুল দিয়েই চালিয়ে দেওয়া যায়। আবার ভিন্ন সংস্কৃতিতে বুড়ো আঙুল উঁচিয়ে দেখানো কার্যত প্রশংসাসূচক অঙ্গভঙ্গিÑ অ্যাপ্রিসিয়েশন। বুড়ো আঙুল উঁচিয়ে দেখানো ‘থাম্পস আপ’ এসেছে রোমান সভ্যতার উন্মেষকালে গ্লাডিয়েটরদের লড়াইয়ের ফলাফল থেকে আঙুল উঁচানো মানে এই গ্লাডিয়েটর জিতে গেছে, অর্থাৎ বেঁচে আছে আর ‘থাম্পস ডাউন’ মানে এই গ্লাডিয়েটরের দম ফুরিয়ে গেছে, মৃত। পশ্চিম আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য, ইরান, ইরাক, আফগানিস্তান, দক্ষিণ এশীয় দেশ-বিশাল অঞ্চলে উঁচিয়েই হোক বা উল্টো করে হোক, বুড়ো আঙুল দেখানো গর্হিত কাজ। ইউরোপ-আমেরিকার ‘থাম্পস আপ’ খুশির বিষয়Ñ বুড়ো আঙুল দেখানো মানে দারুণ হয়েছে, আমি তোমার কিংবা তোমার কাজের প্রশংসা করছি। সরকার পাতাল রেল প্রকল্পকে বুড়ো আঙুল দেখিয়েছে বাংলা সংস্কৃতিতে এর মানে নাকচ করে দিয়েছে, ইউরোপীয় সংস্কৃতিতে এর মানে অনুমোদন করেছে। অর্থবাজার সরকারের অর্থনীতিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়েছে মানে ইউরোপে হলে সাধুবাদ দিয়েছে, এ অঞ্চলে হলে অর্থবাজার অসন্তুষ্ট হয়েছে।

 

মধ্য আঙুল প্রদর্শনের প্রতিক্রিয়া আনন্দপ্রদ ও ভয়ংকর দুই-ই হতে পারে। বন্ধুমহলে নিজেদের মধ্যে হলে সমস্যা নেই, এটি শিশ্নের প্রতীক এবং দুপাশের আনত দুই আঙুল অণ্ডকোষ আর সব মিলিয়ে প্রদর্শনীটি সঙ্গমের। গ্রিক দার্শনিক ডায়োজেনেস এথেন্সবাসীকে তাই দেখিয়েছিলেন, কিন্তু এর মানে ইংরেজি চার অক্ষরের ঋ ওয়ার্ড। অসম্মান দেখানো ও অসৌজন্য প্রকাশ মধ্যাঙ্গুল দিয়েই সম্ভব। খ্রিস্টপূর্ব ৪২৩ অব্দে প্রকাশিত অ্যারিস্টোফেনাসের কমেডি ‘দ্য ক্লাউডস’-এ এমন মধ্যাঙ্গুল দেখানো ভঙ্গির বিবরণ রয়েছে। লাতিন মধ্যাঙ্গুল ‘ডিজিটাস ইম্পুডিনাস’ মানে নির্লজ্জ অশোভন ও আক্রমণাত্মক আঙুল।  থুত্থুড়ে বুড়ি জাদুকর স্যাটাইরিকন তার অশুভ জাদুর প্রভাব বিস্তার করতে মধ্য অঙ্গুলিতে থুতু দিতেন। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড রেগান ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর থাকাকালে বার্কলেতে বিক্ষোভকারীদের মধ্যাঙ্গুল দেখিয়ে সমালোচিত হয়েছেন। জর্জ বুশও দেখিয়েছেন। নারীও মধ্যাঙ্গুল প্রদর্শনে পিছপা নন। ম্যাডোনা, ল্যাডি গাগা ও ব্রিটানি স্পিয়ার মধ্য আঙুল দেখিয়েছেন।

 

দুই আঙুল উঁচিয়ে ভিক্টরি দেখানো বাংলা সংস্কৃতির অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। দুই আঙুল করতল বরাবর দেখালে বিজয় নিয়ে সন্দেহ নেই, কিন্তু করতল উল্টো করে দুই আঙুল দেখালে যে সমস্যা আছে, আমরা এখনো বুঝে উঠতে পারিনি এটি অশ্লীল ও অশোভন। উল্টো ঠ মানে যদি নিতম্বলেহনকারী হয়, তাহলে তো ক্ষুব্ধ হওয়ারই কথা। ইংরেজিতে আঙুলের শতরকম ব্যবহার রয়েছে। মাত্র কয়েকটি : যেমন কারও যদি ‘স্টিকি ফিঙ্গার’ বা আঠালো আঙুল রয়েছে, এমন অপবাদ থাকে, তাহলে তো তার সম্পর্কে সতর্ক হতেই হবে। কারণ সে যখন-তখন চুরি করে। কেউ যদি ‘ফাইভ ফিঙ্গার ডিসকাউন্ট’ পাঁচ আঙুলে রেয়াত পেয়ে যায়, তাহলে বুঝতে হবে জিনিস কিনতে তার পয়সা লাগেনি, মুফতে পেয়ে গেছে। হাতে হিরের আংটি, টাকা পেল কোথায়? নিশ্চয়ই ‘ফাইভ ফিঙ্গার ডিসকাউন্ট’ পেয়ে গেছে। আসল মানে চুরি করেছে, দোকান থেকে তুলে এনেছে। ‘কিপ ফিঙ্গার অন দ্য পালস’ নাড়িতে আঙুল রাখা আছে, বর্ণনাটি যদি এমন হয়, তাহলে বুঝতে হবে যার আঙুল নাড়ির ওপর তিনি সর্বশেষ খবরও রাখছেন। আন্তর্জাতিক বাজারের নাড়িতে আঙুল রাখতে না পারলে আমদানি-রপ্তানির ব্যবসায় মার খেয়ে যাবে।

 

ইংরেজির ‘লিফট অ্যা ফিঙ্গার’ বাংলাতেও আছে আঙুল তোলা। ঢাকায় জমজমাট ক্যাসিনো ব্যবসা, তুমি আমার দিকে আঙুল তুলছ কেন? এই আঙুল তোলা মানে দোষারোপ করা। যারা গডফাদার, তাদের দিকে আঙুল তোলো, আমার কোনো ভূমিকা নেই, দেখেছি আর আঙুল চুষেছি। আঙুল যখন পুড়েছে, এমন শব্দগুচ্ছের ব্যবহার কম কিন্তু ‘গেটওয়ালস ফিঙ্গার্স বার্নড’ ইংরেজিতে বহুল ব্যবহৃত। এ কাজের অভিজ্ঞতা খারাপ, একবার আঙুল পুড়িয়েছি আর পোড়াতে চাই না। ‘ফিঙ্গার্স ক্রসড’ ইংরেজিতে বহুল ব্যবহৃত হয়, কোনো অশুভ কিছু যেন না হয়, যেন সাফল্য আসে, সে জন্য খ্রিস্টীয় রীতিতে ‘ফিঙ্গার্স ক্রসড’। বাংলায় এর ব্যবহার নেই। ‘ফিঙ্গার লিকিং গুড’ আঙুল চাটার মতো; ইংরেজিতেই মূলত ব্যবহৃত : কাল হোস্টেল যে খাবার দিয়েছে, তা ফিঙ্গার লিকিং গুড, আঙুল চাটার মতো। মানে অত্যন্ত সুস্বাদু খাবার।

 

‘লিটল ফিঙ্গার’ (পিংকি সোয়েযার) : শৈশবের ভাব ও আড়ি নেওয়ার কথা মনে করুন। দুজনেরই ছোট আঙুল লাগিয়ে যে প্রতিশ্রুতি। সেই ছোটবেলায় কানি আঙুলের যে ভাব নিয়েছিলাম, এখনো তা বহাল আছে। ‘বাটার ফিঙ্গার্স’ বাংলায় মাখন আঙুল হতে পারে। ইংরেজিতে ভালো জমে : আই হ্যাভ বাটার ফিঙ্গার্স, থিঙ্কস কিপ ড্রপিং। হাত থেকে এটা-ওটা পড়তে থাকে। ‘র‌্যাপ সামওয়ান অ্যারাউন্ড ওয়ান’স লিটল ফিঙ্গার : মানে কাউকে নিজের কানি আঙুলে জড়িয়ে নেওয়া। সে তার স্বামীকে কানি আঙুলে এমনভাবে জড়িয়ে নিয়েছে উঠতে বললে ওঠে, বসতে বললে বসে। সবুজ আঙুল বাংলাতে নেই, ইংরেজিতে ‘গ্রিন ফিঙ্গার’ আছে। কারও গ্রিন ফিঙ্গার থাকলে তার পক্ষে সবুজ ও সুন্দর বাগান করা এবং গাছগুলোকে তরতাজা রাখা সম্ভব। বিখ্যাত ‘গোল্ডফিঙ্গার’-এর নাম তো নিতেই হয়। আয়ান ফ্লেমিংয়ের জেমস বন্ড সিরিজের ৭ নম্বর উপন্যাস, ১৯৫৯-এর মার্চে প্রকাশিত।

 

সোনার আঙুল হলেও তা চোষার নয়। চোষার আঙুল একেবারেই দেহলগ্ন এবং পুরোপুরিই নিজের। শূন্য থেকে এক বছর বয়সী মানবশিশুর ৯২ ভাগই নিজের হাতের আঙুল চোষে। জিমনাস্ট টাইপের শিশুগুলো কায়দামতো নিজের পা টেনে পায়ের আঙুলও মুখে ঢুকিয়ে দেয়। এক থেকে দুবছর বয়সীদের ৬৬ ভাগ আঙুল চোষে আর তিন থেকে ছয় বছর বয়সীদের ২৫ ভাগ। যাদের বয়স ৬ পেরিয়ে যায়, তাদের ৯ ভাগ তখনো আঙুলের স্বাদ নিতে থাকে। শিশুর মনোযৌন বিকাশে ফ্রয়েডের তত্ত্বে এটা ‘ইনফেন্টাইল সেক্সুয়ালিটি’র অংশ। আমরা শিশুর যৌনতাড়না নিয়ে বিতর্কে যেতে চাই না। কেবল বুড়োদের আঙুল চোষাই আমাদের বিবেচ্য। আঙুল চোষার কিছু সুফলের খবর নিউজিল্যান্ডের একটি গবেষণা (ডুনেডিন মাল্টিডিসিপ্লিনারি হেলথ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট স্টাডি) থেকে পাওয়া গেছে। আঙুল চোষকদের অ্যালার্জি ও হাঁপানিতে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা অন্যদের চেয়ে কম।

 

সেলিব্রেটি আঙুল চোষকদের দলে সর্বশেষ সংযুক্ত হয়েছেন জেনিফার লরেন্স। অভিনেতা জেমস নেসবিট বলেছেন, আমি তো সারা দিনই আঙুল চুষি, বাসে, টিউবে, এয়ারপোর্টে, খেতে খেতে, খবরের কাগজ পড়তে পড়তে সারাক্ষণই। এ দলে আরও আছেন সুজান বয়েল, কেরি ওসবর্ন, অ্যামি ওয়াইনহাউস। বাংলাদেশের আঙুলচোষকরাও কম সেলিব্রেটি নন, সমাজপতি, এমপি, দল-উপদলের নেতা, আমলা, থানাদার, তাদের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। আঙুল চোষার জন্য ক্যাসিনো থেকে দৈনিক, সাপ্তাহিক, মাসিক চোষ্যভাতা দেওয়া হয়; এই গ্রহণকারীদের মধ্যে এমনকি সাংবাদিকও আছেন। নইলে ভেতরের খবর জানব কেমন করে!

 

বিভিন্ন কারণে লোভের বশবতী হয়ে, আতঙ্কে কম্পমান হয়ে, সাইলেন্স ইজ গোল্ডেন জেনে যাদের কেবল আঙুলই চুষতে হয়, বিনিময়ে তেমন কিছু পান না তাদের জন্য সম্মানজনক রাষ্ট্রীয় চোষ্যভাতার দাবি জানাতে অসুবিধে কোথায়? যদি চোষ্যভাতার দাবি বড় কিছু মনে হয়, তাহলে অন্তত লেহনভাতা!

 

লেখক

লেখক,  অনুবাদক ও কলামনিস্ট