এনআরসি নিয়ে উদ্বেগের মেঘ কাটুক

দক্ষিণ এশিয়ার রাষ্ট্রসমূহ ঐতিহাসিকভাবে জাতি-ধর্ম-ভাষা-সংস্কৃতির সাধারণ উত্তরাধিকারের এক ঐতিহাসিক মেলবন্ধনে আবদ্ধ। কিন্তু ব্রিটিশ উপনিবেশ থেকে মুক্তির সংগ্রাম ঘিরে অবিভক্ত ভারতবর্ষের বিভক্তি আর পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহে এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, নানা সময়ে নানাভাবে ধর্মীয় ও জাতিগত বিভাজনের এক অশুভ চক্রে বারবার ঘুরপাক খেয়েছে দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতি। কখনো তা আন্তঃরাষ্ট্রীয় আবার কখনো তা অন্তঃরাষ্ট্রীয় সংঘাতের চেহারায় হাজির হয়েছে। এসব সংঘাত কখনো কখনো রক্তক্ষয়ী সহিংসতাতেও রূপ নিয়েছে। সম্প্রতি মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের ওপর দেশটির শাসকদের জাতিগত নিধনযজ্ঞে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা শরণার্থীর বাংলাদেশে আশ্রয়গ্রহণও এমনই এক সংঘাতের ফল। সর্বশেষ ভারতে জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্যের বিশেষ মর্যাদা বিলোপ এবং আসাম রাজ্যের জাতীয় নাগরিক পঞ্জি (এনআরসি) প্রণয়ন নিয়ে দেশটির অভ্যন্তরে জাতিগত সংঘাতের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। আসাম রাজ্যের নাগরিক পঞ্জি থেকে প্রায় ১৯ লাখ মানুষের ‘রাষ্ট্রহীন’ হয়ে পড়ার উদ্বেগে সঙ্গত কারণেই বাংলাদেশের জনগণের মধ্যেও নানা উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা দেখা গেছে।

 

আসামের বর্তমান জনসংখ্যা ৩ কোটি ৩০ লাখ ২৭ হাজার ৬৬১ জন। ‘এনআরসি’ থেকে বাদ পড়েছেন ১৯ লাখ ৬ হাজার ৬৫৭ জন। সরকারি ঘোষণা অনুসারে ‘এনআরসি’ থেকে বাদ পড়া অধিবাসীরা এখন নাগরিকত্বের সুরাহার জন্য রাজ্যের ‘ফরেনার্স ট্রাইব্যুনালে’ আবেদন করতে পারবেন। আসামে ইতিমধ্যেই শতাধিক ‘ফরেনার্স ট্রাইব্যুনাল’ কাজ করছে। আসাম সরকারের পরিকল্পনা অনুসারে সেখানে মোট এক হাজার ট্রাইব্যুনাল স্থাপিত হবে। কেবল ফরেনার্স ট্রাইব্যুনালই নয়, ‘এনআরসি’ থেকে বাদ পড়া অধিবাসীদের রাখার জন্য ইতিমধ্যেই রাজ্যটিতে বিপুলসংখ্যক ‘ডিটেনশন সেন্টার’ গড়ে তোলার খবরও ভারতীয় ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোতে প্রকাশিত হয়েছে। আসামের এই জাতীয় নাগরিক নিবন্ধন থেকে বাদ পড়া বাসিন্দাদের মধ্যে বাঙালি মুসলমানের চেয়ে বাঙালি হিন্দুর সংখ্যা বেশি। তবে, সংখ্যার বিচারে বাঙালি মুসলমানের সংখ্যাও নেহায়েত কম নয়, প্রায় আট লাখের কাছাকাছি। সঙ্গত কারণেই বাংলা ভাষাভাষী এই হিন্দু-মুসলিম জনগোষ্ঠীর ভবিষ্যৎ নিয়ে ভারতের বাঙালিদের মতোই বাংলাদেশের জনগণও উদ্বিগ্ন।

 

অবশ্য, আশার কথা হলো বৃহৎ প্রতিবেশী ভারত বরাবরই বাংলাদেশকে আশ্বস্ত করে আসছে যে, ‘এনআরসি’ নিয়ে বাংলাদেশের উদ্বেগের কিছু নেই। এ বছর বিজেপি টানা দ্বিতীয়বার সরকার গঠনের পরপরই ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর ঢাকা সফর করেন। এই সফরে তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন যে, এটা ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয় এবং এ নিয়ে বাংলাদেশের চিন্তিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীও ভারতের এই অবস্থানের কথা জানিয়ে দেশের মানুষকে আশ্বস্ত করেছেন। পাশাপাশি এটা লক্ষ্য করা প্রয়োজন যে, বিগত কয়েক বছর ধরে ভারত-বাংলাদেশের যত দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হয়েছে সর্বোচ্চ পর্যায়ে, পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ে বা পররাষ্ট্র সচিব পর্যায়ে; কোনো বৈঠক বা দ্বিপক্ষীয় আলোচনাতেই আসামের ‘এনআরসি’ কখনই কোনো এজেন্ডাতেই ছিল না। এই পরিপ্রেক্ষিতে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের অবসরে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বৈঠকে আসামের ‘এনআরসি’ নিয়ে আলোচনা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ।

 

শুক্রবার ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নিউ ইয়র্কের দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে আশ্বস্ত করেছেন যে, আসামের জাতীয় নাগরিক নিবন্ধন ‘এনআরসি’ নিয়ে বাংলাদেশের উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছুই নেই। বৈঠক শেষে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন ভারতের প্রধানমন্ত্রীর উদ্ধৃতি দিয়ে সাংবাদিকদের বলেন, ‘বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে চমৎকার সম্পর্ক বজায় রয়েছে। তাই এ ধরনের ইস্যু নিয়ে উদ্বেগের কিছুই নেই। শুক্রবার বিকেলে লোতে নিউ ইয়র্ক প্যালেস হোটেলে দ্বিপক্ষীয় সভাকক্ষে বাংলাদেশ ও ভারতের প্রধানমন্ত্রীর ওই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন বৈঠকে এনআরসি ও অভিন্ন নদীর পানি বণ্টনসহ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের সার্বিক বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এনআরসির কথা উল্লেখ করে বলেন, এটি বাংলাদেশের জন্য খুবই উদ্বেগের বিষয়। জবাবে ভারতের প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এনআরসি ও পানি বণ্টনের মতো ইস্যুগুলোকে আমরা সহজভাবে নিতে পারি। কারণ বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে চমৎকার সম্পর্ক রয়েছে।’ নরেন্দ্র মোদি আরও বলেছেন, ভারতের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বিষয়টি নির্ধারণে কাজ করবেন; এ ব্যাপারে বাংলাদেশের শঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই।

 

ভারতই হোক কিংবা বাংলাদেশ কোনো দেশের জনগণই আঞ্চলিক রাজনীতিতে কোনো জাতিগত ও সাম্প্রদায়িক বিভেদের উদ্বেগ উৎকণ্ঠায় দিনাতিপাত করতে চায় না। হিন্দুই হোক কিংবা মুসলিম বা অন্য কোনো ধর্ম-জাতিসত্তার মানুষ, জাতীয় নাগরিক নিবন্ধনের মতো কোনো রাজনৈতিক পদক্ষেপের কারণে কোনো মানুষেরই ‘রাষ্ট্রহীন’ হয়ে যাওয়া কাম্য নয়। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর জনসাধারণের আশা-আকাক্সক্ষার সঙ্গে রাজনীতিবিদ-রাষ্ট্রনেতাদের সচেতন প্রয়াস সমন্বিত হয়ে আঞ্চলিক রাজনীতিতে উদ্বেগের মেঘ কেটে যাবে, সেটাই কাম্য।