ক্যাসিনো কারবারিদের ব্যবসা সিঙ্গাপুর দুবাই থাইল্যান্ডে!

ক্যাসিনোর টাকায় বিদেশে সম্পদের পাহাড় গড়েছেন যুবলীগ নামধারী নেতারা। সিঙ্গাপুর, সৌদি আরব, দুবাই ও থাইল্যান্ডে ক্যাসিনোর কারবারের পাশাপাশি সোনাসহ বিভিন্ন ব্যবসা-বাণিজ্য রয়েছে তাদের। আছে একাধিক ফ্ল্যাট-বাড়ি। তাদের মধ্যে বিশেষ করে আছেন যুবলীগ থেকে বহিষ্কৃত খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া, যুবলীগ নামধারী গোলাম কিবরিয়া ওরফে জি কে শামীম। আছেন কৃষক লীগ নেতা শফিকুল আলম ওরফে কালা ফিরোজও। তাদের সহযোগীদেরও বিদেশে এসব কারবার আছে। এছাড়া যুবলীগ দক্ষিণের এক শীর্ষ নেতাও একই কারবারে জড়িত।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কয়েকজন কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে আরও জানিয়েছেন, যারা গ্রেপ্তার হয়েছেন তারা বেশিরভাগ সময় দেশের বাইরে থাকতেন। দেশের বাইরে পালিয়ে থাকা আন্ডারওয়ার্ল্ডের শীর্ষ সন্ত্রাসীরা তাদের ওইসব ব্যবসা-বাণিজ্য ও সম্পদ দেখাশোনা করে। তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

গতকাল শনিবার জি কে শামীম, খালেদ মাহমুদ ও কালা ফিরোজকে মুখোমুখি করে 

জিজ্ঞাসাবাদ করা শুরু হয়েছে। জানা গেছে, র‌্যাবের জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেলে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তারা ক্যাসিনো ও টেন্ডারবাণিজ্য নিয়ে বিশদ তথ্য দিচ্ছেন। সেসব তথ্য যাচাই-বাছাই করে দেখছে তদন্তকারী সংস্থাগুলো।

পুলিশ সদর দপ্তরের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ক্যাসিনো থেকে যারা নিয়মিত চাঁদা আদায় করতেন তাদের তালিকা করা হচ্ছে। তারা যেন দেশ ছেড়ে পালিয়ে যেতে না পারেন সেজন্য সবকটি বিমানবন্দর ও সীমান্ত এলাকায় সতর্কবার্তা জারি করা আছে। ক্যাসিনো কারবার চালিয়ে তারা দেশের পাশাপাশি বিদেশেও সম্পদ করেছেন। তারা কোন কোন দেশে ব্যবসা করছেন এবং ফ্ল্যাট-বাড়ি করেছেন সেই তথ্যও আমরা পেয়েছি। তথ্যগুলোর ব্যাপারে আমরা খোঁজ-খবর নিচ্ছি। যুবলীগের অন্তত দশ শীর্ষ নেতারও বিদেশে অঢেল সম্পদ আছে।

র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যাম শাখার পরিচালক ও র‌্যাব ১-এর পরিচালক সারোয়ার বিন কাশেম গতকাল শনিবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, খালেদ মাহমুদ, জি কে শামীম ও ফিরোজকে জিজ্ঞাসাবাদ করে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য  পেয়েছি। তদন্তের স্বার্থে তথ্যগুলো প্রকাশ করা যাচ্ছে না। তাদের সঙ্গে যারা ক্যাসিনো কারবার চালাতেন তাদের তালিকা হয়েছে। ওই তালিকা ধরে আমরা অভিযান চালাচ্ছি। তবে নিরপরাধ কাউকে হয়রানি করার সুযোগ নেই। 

র‌্যাবের একটি সূত্র জানায়, জি কে শামীম ও খালেদকে মুখোমুখি করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। শামীমের টেন্ডারবাজির প্রতিটি ঘটনার সঙ্গে খালেদের সম্পৃক্ততা রয়েছে। খালেদ ‘ভূঁইয়া অ্যান্ড ভূঁইয়া কোম্পানি’র নামে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে টেন্ডার জমা দেওয়ার পর কাজ পাওয়ার বিষয়ে সমঝোতা করেন জি কে শামীমের জি কে বিল্ডার্সের সঙ্গে। একই সঙ্গে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ ব্যক্তিদের কমিশনের নামে চাঁদার টাকা দিত প্রতিষ্ঠান দুটি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক র‌্যাবের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, গতকাল থেকে জি কে শামীম, খালেদ মাহমুদ ও কালা ফিরোজকে মুখোমুখি করে কয়েক দফা জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদে যুবলীগ দক্ষিণের এক শীর্ষ নেতার ব্যাপারে কথা বলেছেন তারা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার ব্যাপারেও তারা তথ্য দিয়েছেন। তারা জানিয়েছেন, ক্যাসিনো কারবার ও টেন্ডারবাণিজ্য করতে গিয়ে রাজনৈতিক নেতা ও প্রশাসনের ঊর্ধ্বতনদের মোটা অঙ্কের অর্থ দিতে হয়েছে। বিদেশেও অর্থ পাচার করেছেন। মাঝেমধ্যে সিঙ্গাপুর গিয়ে ক্যাসিনো কারবার চালাতেন।  

পুলিশ ও র‌্যাবের কয়েকজন কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়Ñ শামীম, খালেদ, ফিরোজ ছাড়াও যারা এখনো আইনের আওতায় আসেনি তারাও দেশের বাইরে ব্যবসাবাণিজ্য চালাচ্ছেন। যুবলীগ নেতা আরমান, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ওয়ার্ড কাউন্সিলর মোমিনুল হক সাঈদ, যুবলীগ নেতা বাদল, খোরশেদ আলম, নুরুননবী ওরফে রাজু, শাহজাহানপুরের অংকুর, শাহাদৎ, সেন্টু, ফকিরাপুলের খায়রুল ও গুলিস্তানের শাহাবুদ্দিনের সৌদি আরবের রিয়াদ, সিঙ্গাপুর, দুবাই ও থাইল্যান্ডে ব্যবসা আছে। ওই কর্মকর্তারা আরও জানান, খালেদ মাহমুদ থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর ও দুবাইয়ে বেশি অর্থ পাচার করেছেন। ব্যাংকক ও পাতেয়ায় তার দুটি হোটেল আছে। তাছাড়া পাতেয়ায় তিনটি অ্যাপার্টমেন্ট আছে। দুবাইয়ে তার মোটর পার্টসের ব্যবসা আছে। সিঙ্গাপুরে ১২ কোটি টাকা দিয়ে একটি ফ্ল্যাট কিনেছেন খালেদ মাহমুদ। তার ছোট ভাই মাসুদ এসব ব্যবসা দেখাশোনা করেন। আন্ডারওয়ার্ল্ডের শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসানও তার অন্যতম পার্টনার।

কর্মকর্তারা জানান, জি কে শামীমের সিঙ্গাপুর ও থাইল্যান্ডে ব্যবসা আছে। সিঙ্গাপুুরে দুটি ফ্ল্যাট থাকার তথ্য পেয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। আমেরিকা ও সৌদি আরবেও তার ব্যবসা আছে। যুবলীগ নেতা নুরুননবী ওরফে রাজু সৌদি আরবের রিয়াদে সোনার ব্যবসা করছেন। সেখানে তার বেশ কয়েকটি দোকান আছে। রাজু এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে আছেন। খালেদ মাহমুদের অন্যতম সহযোগী রাজু টেন্ডারগুলো নিয়ন্ত্রণ করতেন। যুবলীগ দক্ষিণের এক শীর্ষ নেতা গত ১০ বছরে অন্তত দেড় হাজার কোটি টাকা সিঙ্গাপুরে পাচার করে ব্যবসা চালাচ্ছেন। তার ব্যবসা দেখাশোনা করেন চীনা নাগরিক সিন্ডি লি। তিনি মাঝেমধ্যে বাংলাদেশে আসতেন এবং একটি পাঁচতারা হোটেলে থাকতেন। ওয়ার্ড কাউন্সিলর মোমিমুল হক সাঈদেরও সিঙ্গাপুরে ব্যবসা আছে। আছে একটি ফ্ল্যাটও। ওই ফ্ল্যাটে তিনি থাকেন। এক সময় সাঈদ মতিঝিল এলাকায় চোরাই তেলের ব্যবসা করতেন। অভিযান শুরুর দুই দিন আগেই সিঙ্গাপুর পালিয়ে যান সাঈদ। গত ১০ বছর ধরে ক্যাসিনো কারবার চালিয়ে কয়েক হাজার কোটি টাকার মালিক হয়েছেন তিনি। মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের পরিচালক লোকমান হোসেন বিদেশে টাকা পাচার করেছেন। অস্ট্রেলিয়ার দুটি ব্যাংকে ৪১ কোটি টাকা আছে তার।

পুলিশ সদর দপ্তরের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, গত ১৮  সেপ্টেম্বর সারা দেশে টেন্ডার ও চাঁদাবাজি এবং ক্যাসিনোবিরোধী অভিযান শুরু হয়েছে। ৩২টি অভিযান খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া ও জি কে শামীমসহ ১৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের বিভিন্ন মেয়াদে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তাদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে নগদ ১৭ কোটি টাকা, ১৬৫ কোটি টাকার এফডিআর এবং ১৪টি আগ্নেয়াস্ত্র। তাছাড়া ওইসব অভিযানে ২০১ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়েছে।

জানা গেছে, যুবলীগ ঢাকা মহানগর দক্ষিণের শীর্ষ নেতার নিয়ন্ত্রণে চলা ক্যাসিনো থেকে শুধু চাঁদা তোলার কাজ করেই কাকরাইলের বিপাশা  হোটেলে বয়ের কাজ করা জাকির হোসেন ও গুলিস্তানের হকার আরমান এখন কোটি টাকার মালিক। নতুন মডেলের হ্যারিয়ার গাড়ি দাপিয়ে চাঁদা তুলতেন আরমান। দুটি ক্যাসিনোর মালিকানাও রয়েছে তার। কোন ক্যাসিনোর চাঁদার পরিমাণ কত হবে যুবলীগের শীর্ষ নেতার সঙ্গে বসে তার পরিমাণও ঠিক করে দিতেন আরমান। আর জাকির চাঁদা তোলার পাশাপাশি বিভিন্ন জায়গায় মাসোহারা পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব পালন করতেন। ক্যাসিনো ও ক্লাবপাড়ার সবাই ওই নেতার বন্ধু হিসেবেই চেনেন তাদের। সিঙ্গাপুরে অভিজাত ক্যাসিনো ‘মেরিনা বে’তে গিয়ে তারা জুয়াও খেলেন একসঙ্গে।