ক্যাসিনো কারবারে ফেঁসে যেতে পারেন বিএনপি ও যুবদলের অন্তত ১৫ নেতা। তাদের সঙ্গে যুবলীগের বহিষ্কৃত গ্রেপ্তার হওয়া খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া, আলোচিত ঠিকাদার জি কে শামীমের সম্পর্ক ছিল। তারা বিএনপি ও যুবদল নেতাদের মামলা চালাতে নিয়মিত অর্থ দিতেন। আর মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের পরিচালক লোকমান হোসেনের সঙ্গেও ভালো সম্পর্ক ছিল বিএনপি-যুবদলের ওই নেতাদের। জিজ্ঞাসাবাদে র্যাব ও পুলিশ এসব তথ্য জানতে পেরেছে বলে দাবি করেছেন
তদন্তকারী সংস্থার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
এদিকে যুবলীগ দক্ষিণের সভাপতি ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাটের অবস্থান নিয়ে এখনো রয়েছে ধোঁয়াশা। তিনি কোথায় আছেন তা কেউ পরিষ্কার করছেন না। আর পুরান ঢাকার আওয়ামী লীগের দুই নেতাকে এখনো গ্রেপ্তার করতে পারেনি আইন প্রয়োগকারী সংস্থা। তারা যেন দেশ ছেড়ে পালিয়ে যেতে না পারেন সে জন্য বিমানবন্দর ও সীমান্ত এলাকায় কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
র্যাবের গোয়েন্দা শাখার এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, মতিঝিল ক্লাবপাড়াসহ যেসব স্থানে ক্যাসিনো ছিল সেসব স্থান থেকে ওঠানো টাকার ভাগ-বাটোয়ারা হতো। ওই টাকার একটি অংশ যেত বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যদের কাছে। তা ছাড়া বিএনপি ও যুবদলের শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের অর্থ দিতেন খালেদ মাহমুদ ও জি কে শামীম। পাশাপাশি যুবলীগ দক্ষিণের শীর্ষ এক নেতার সঙ্গেও বিএনপি ও যুবদল নেতাদের যোগাযোগ ছিল। বিএনপি ও যুবদলের ওই নেতাদের তালিকা প্রস্তুত হচ্ছে। নির্দেশ পেলে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। হুন্ডির মাধ্যমে জি কে শামীম ও খালেদ মাহমুদের দেশের বাইরে অর্থ পাচারের তথ্য মিলেছে বলে ওই কর্মকর্তা জানান।
র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক লে. কর্নেল সারোয়ার বিন কাসেম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দ্বিতীয় দফা রিমান্ডে খালেদকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। পাশাপাশি জি কে শামীমকেও জিজ্ঞাসাবাদ অব্যাহত আছে। তাদের দেওয়া সব তথ্য খতিয়ে দেখা হচ্ছে।’
র্যাবের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘টেন্ডারবাজি ও ক্যাসিনো সাম্রাজ্যের তিন মূর্তিমান আতঙ্ক জি কে শামীম, খালেদ ও কালা ফিরোজকে মুখোমুখি করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। জিজ্ঞাসাবাদে অনেক নতুন তথ্য দিয়েছেন তারা। ক্যাসিনো ও টেন্ডারবাজি করে তারা কত টাকার মালিক হয়েছেন সেই তথ্যও পাওয়া যাচ্ছে। পাশাপাশি টেন্ডারবাজি ও ক্যাসিনোর টাকার কমিশন কারা পেতেন সেই তথ্যও মিলছে। এমনকি বিএনপির কয়েকজন সাবেক মন্ত্রী ও সাংসদের নাম বলেছেন তারা। বিএনপি ও যুবদলের অন্তত ১৫ নেতাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হতে পারে। মূলত মামলা চালানোর জন্য বিএনপি ও যুবদল নেতারা খালেদ ও জি কে শামীমের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের অর্থ নিতেন। তা ছাড়া যুবলীগ দক্ষিণের এক শীর্ষ নেতা ও মোহামেডান ক্লাবের পরিচালক লোকমান হোসেনও তাদের সহায়তা করেছেন।’
তদন্তকারী কর্মকর্তারা জানান, মতিঝিলের এক হুন্ডি ব্যবসায়ীর মাধ্যমে খালেদ মাহমুদ ও জি কে শামীম হুন্ডি করে টাকা বিদেশে পাঠাতেন। ওই হুন্ডি ব্যবসায়ীকে আটকাতে বিভিন্ন স্থানে অভিযান চলছে। তাকে আটক করা গেলে বিদেশে কত টাকা পাঠানো হয়েছে তা পরিষ্কার হবে। খালেদ ও শামীম ওই হুন্ডি কারবারিদের নাম প্রকাশ করেছেন।
সম্রাটের অবস্থান নিয়ে এখনো ধোঁয়াশা : ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সভাপতি ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাটের অবস্থান এখনো পরিষ্কার হয়নি। তিনি কোথায় আছেন, তা কেউ পরিষ্কার করছেন না। গত শনিবার বিকেলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বলেছিলেন, ‘সম্রাট গ্রেপ্তার কি নাÑ এ বিষয়ে আপনারা দ্রুত জানতে পারবেন।’ কিন্তু ২৪ ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও তার বিষয়ে কোনো তথ্য নেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তাদের কাছে।
একটি সংস্থার একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা গতকাল দেশ রূাপান্তরকে বলেন, সম্রাট গ্রেপ্তারের বিষয়ে সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে গতকাল রবিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত কোনো সবুজ সংকেত নেই। সম্রাট আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারির মধ্যেই রয়েছেন। সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে যে নির্দেশ আসবে সেই অনুযায়ী কাজ করবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তিনি আরও বলেন, সম্রাট ও খালেদের সুবিধাভোগীদের তালিকায় শীর্ষ রাজনীতিবিদ, সংগঠনের সুবিধাভোগী, পুলিশসহ বিভিন্ন পেশার লোকজন রয়েছেন।
ছয় দিনেও অধরা দুই আ.লীগ নেতা, দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা : ক্যাসিনোকাণ্ডে জড়িত পুরান ঢাকার আওয়ামী লীগের নেতা এনামুল হক, রুপন ভূঁইয়াসহ চারজনকে ছয় দিনেও গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি। তাদের ধরতে অভিযান চালানোর কথা বলে আসছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। পুলিশের ওয়ারী বিভাগের উপকমিশনার ইফতেখার আহমেদ বলেন, গেণ্ডারিয়া থানায় মানি লন্ডারিং আইনে করা দুটি মামলা তদন্ত করছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) । আর ওয়ারী থানায় করা অস্ত্র মামলাটির তদন্ত করছে ওই থানার পুলিশ। আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান চালানো হচ্ছে।
গত মঙ্গলবার দুপুরে সূত্রাপুর থানার বানিয়ানগরে এনামুল, তার ভাই রুপনের বাড়িসহ চারটি বাড়িতে অভিযান চালিয়ে ৫ কোটি ৫ লাখ টাকা, ৪ কোটি টাকার স্বর্ণালঙ্কার ও ৬টি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করে র্যাব। টাকা ও স্বর্ণালঙ্কারে দুই ভাইয়ের সিন্দুক ভরা ছিল। এ ছাড়া তারা গে-ারিয়া ও ওয়ারীতে আরও দুই ব্যক্তির বাসায় টাকা ও স্বর্ণালঙ্কার রাখতেন। ওই দুজনের একজন রুপনের বন্ধু মো. হারুন অর রশিদ। তার বাসা গেণ্ডারিয়ায়। অন্যজন তাদের কর্মচারী আবুল কালাম আজাদ, তার বাসা ওয়ারীতে। এনামুল গেণ্ডারিয়া থানা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি ও তার ছোট ভাই রুপন ভূঁইয়া একই কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক। তারা ওয়ান্ডারার্স ক্লাবসহ একাধিক ক্লাবের ক্যাসিনো চালাতেন বলে র্যাবের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
এ প্রসঙ্গে পুলিশ সদর দপ্তরের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, আওয়ামী লীগের এই দুই নেতা যাতে দেশত্যাগ করতে না পারে, সে জন্য নিষেধাজ্ঞা জারি করা আছে। দেশের সব বিমানবন্দর ও সীমান্ত এলাকায় সতর্কবার্তা পাঠানো হয়েছে।