বাসা ও অফিসে ২৩ দেশের মুদ্রা

নিয়মিত লন্ডনে টাকা পাঠাতেন সেলিম প্রধান

অনলাইন ক্যাসিনো কারবারের অন্যতম হোতা সেলিম প্রধান ওরফে ‘কাসিনো সেলিমের’ রাজধানীর গুলশান ও বনানীর বাসা ও অফিসে গত সোমবার রাত সাড়ে ৯টা থেকে গতকাল মঙ্গলবার বিকাল ৪টা পর্যন্ত অভিযান চালিয়েছে র‌্যাব। এ সময় বিপুল পরিমাণ নগদ টাকা, ২৩ দেশের মুদ্রা, বিদেশি মদ ও হরিণের চামড়া উদ্ধার করা হয়েছে। অভিযানে তার দুই সহযোগীকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এর আগে গত সোমবার দুপুরে থাই এয়ারের একটি বিমান থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। হরিণের চামড়া রাখায় বন্য প্রাণী আইনের মামলায় তাকে ছয় মাসের কারাদণ্ড দিয়েছে ভ্রাম্যমাণ আদালত। গতকালই মামলায় তাকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অনলাইন ক্যাসিনো থেকে সেলিম প্রধানের মাসিক আয় অন্তত ত্রিশ কোটি টাকা। চীন, কোরিয়াসহ ৫ দেশ থেকে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে বাংলাদেশের অনলাইনে ক্যাসিনো বা জুয়া খেলা। পাচার হচ্ছে শত শত কোটি টাকা। বিদেশ থেকন নিয়ন্ত্রণ করায় ওয়েবসাইট বন্ধ করেও অনলাইন ক্যাসিনোর কারবার ঠেকানো যাচ্ছে না।

এদিকে যুবলীগ নামধারী ঠিকাদার জিকে শামীমের ১০ দিনের রিমান্ডের মেয়াদ আজ শেষ হচ্ছে। অস্ত্র ও মাদক মামলায় র‌্যাব তাকে এই রিমান্ডে নেয়। মানি লন্ডারিং মামলায় তার আরও ১০ দিনের রিমান্ড চেয়ে আবেদন করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ- সিআইডি। ইতিমধ্যে এই মামলায় শামীমের ৭ দেহরক্ষীকে চার দিনের রিমান্ডে নিয়েছে সিআইডি।

র‌্যাব কর্মকর্তারা বলছেন, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে সেলিম প্রধান জানিয়েছেন, ক্যাসিনোর অর্থ নিয়মিত লন্ডনে পাঠাতেন তিনি। এছাড়া থাইল্যান্ডসহ আরও কয়েকটি দেশে হুন্ডির মাধ্যমে টাকা পাচার করেছেন। ২০১৮ সাল থেকে অনলাইনে ক্যাসিনো খুলে কয়েক হাজার কোটি টাকা আয় করেছেন। থাইল্যান্ডের পাতায়ায় তার একাধিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। তার সঙ্গে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের সুসম্পর্ক আছে।

সেলিমের কোম্পানির ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, পি২৪ গেমিং শুরুতে বিনোদনমূলক সফটওয়্যার তৈরি ও প্রকাশ করত। এখন তারা এশিয়ায় দনত বড় হতে থাকা ক্যাসিনো কারবারে সক্রিয় ভ‚মিকা রাখছে। এশিয়ার লাইভ ক্যাসিনো মার্কেটে প্রতিষ্ঠানটি যেন এক নম্বরে যেতে পারে, সেই চেষ্টা আছে তাদের। ২০১৬ সালে তারা শুধু কম্পিউটার গেমস বাজারে আনত। পরে অনলাইন জুয়া ও ক্যাসিনো কারবারে জড়িয়ে পড়ে। পি২৪-এর সঙ্গে বাংলাদেশে ১৫০টি অপারেটর ও ক্যাসিনো যুক্ত আছে। অনলাইনে বিশ্বের সবচেয়ে প্রচলিত ক্যাসিনোর সঙ্গে যুক্ত করে দেওয়ার ক্ষমতা আছে তাদের। জুয়াড়িদের মুঠোফোনে লাইভ ক্যাসিনোতে যুক্ত করে দেওয়ার সুবিধা তারা এনেছে গত বছরের ৭ ডিসেম্বর।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, সেলিম প্রধানের সঙ্গে আর্থিক খাতের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। সেলিম প্রধানের জাপান-বাংলাদেশ সিকিউরিটি প্রিন্টিং অ্যান্ড পেপারসে বিভিন্ন ব্যাংকের চেক বই ছাপা হয়। পাশাপাশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অফিসের নথিপত্রও ছাপানো হয়। তার এই প্রতিষ্ঠান রূপালী ব্যাংকের শীর্ষ ঋণখেলাপিদের একটি। সেলিমের কাছে ব্যাংকের পাওনা প্রায় ১০০ কোটি টাকা। ২০১৮ সালে ঋণটি পুনঃতফসিল করা হয়। 

নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক র‌্যাবের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, টেন্ডারবাজি ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্ত দিয়ে অস্ত্র চোরাচালানের সঙ্গে সেলিম প্রধানের সম্পৃক্ততা রয়েছে। বিএনপি ও আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে তার সার্বক্ষণিক যোগাযোগ আছে। লন্ডনে অবস্থানরত এক ‘প্রভাবশালী নেতার’ কাছে নিয়মিত অর্থ পাঠাতেন সেলিম প্রধান। তিনি আরও বলেন, চীন, কোরিয়া, ফিলিপাইন ও ইউক্রেন থেকে নিবন্ধিত বেটিং সাইটগুলোতেই মূলত বাংলাদেশিদের পদচারণা। এ সাইটগুলোতে ক্রিকেট, ফুটবল, রাগবি ম্যাচ চলাকালে লাইভ বাজি ধরার সুযোগ রয়েছে। এছাড়া যেসব ম্যাচ কোনো চ্যানেলে সম্প্রচার হয় না সেই ক্লাবের খেলা নিয়েও হয় বাজি।

সাইবার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অনলাইন গেমসের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ টাকা বিদেশে পাচার হচ্ছে, সেই সঙ্গে সাধারণ মানুষের অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্যও নিয়ে যাচ্ছে তারা। ক্যাসিনো-জুয়ার আসরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানের মধ্যেও দেশে চলছে অনলাইনে ক্যাসিনো গেমস বা জুয়া খেলা; যার আরেক নাম বেটিং। চলতি বছরের শুরুতে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন বিটিআরসি ১৭৬টি জুয়ার সাইটের গেটওয়ে বন্ধ করে দিলেও অবৈধভাবে অন্য গেটওয়ে ব্যবহার করে চালানো হচ্ছে সেগুলো।

তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ তানভীর হাসান জোহা বলেন, এটা একটা সঙ্ঘবদ্ধ চক্র। স্থানীয়ভাবে মোবাইল ফাইনান্সিয়াল যে সংস্থাগুলো আছে তাদের সাহায্যে খুব স্বল্পমূল্যে তারা চিপসগুলো সরবরাহ করছে। তরুণরা কিন্তু এই গেমটার প্রতি ঝুঁকে পড়ছে। এর মূল ডেভেলপার হচ্ছে চীন, কোরিয়া, ফিলিপাইন ও ইউক্রেনের মতো কিছু দেশ।

র‌্যাবের সংবাদ সম্মেললন : গতকাল বিকালে অভিযান শেষে র‌্যাবের গণমাধ্যম শাখার পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল সারওয়ার বিন কাশেম সংবাদ সম্মেলনে আসেন। তিনি বলেন, সোমবার রাত থেকে অপারেশন শুরু হয়ে মঙ্গলবার বিকাল পর্যন্ত অভিযান চলে। প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই শেষে আমরা তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছি। এরমধ্যে এ অনলাইন গেমিংয়ের বাংলাদেশের প্রধান সমন্বয়ক সেলিম। তার গুলশানের বাসা থেকে বিদেশি ৪৮টি মদ, ২৯ লাখ ৫ হাজার ৫০০ নগদ টাকা, তার বনানীর অফিস থেকে ২১ লাখ ২০ হাজার টাকা জব্দ করা হয়। সেই সঙ্গে ২৩টি দেশের ৭৭ লাখ ৬৩ হাজার টাকা সমমূল্যের মুদ্রা, ১৩টি ব্যাংকের ৩২টি চেক জব্দ করা হয়েছে। সেইসঙ্গে জব্দ করা হয়েছে অনলাইন ক্যাসিনো খেলার মূল সার্ভার ও ১টি ল্যাপটপ। এছাড়া দুটি হরিণের চামড়া জব্দ করা হয়েছে। চামড়া রাখার অপরাধে তাকে ৬ মাসের কারাদণ্ড দিয়েছে ভ্রাম্যমাণ আদালত।

সারোয়ার বিন কাশেম বলেন, ১৯৭৩ সালে ঢাকায় জন্মগ্রহণ করা সেলিম প্রধান তার ভাইয়ের হাত ধরে ১৯৮৮ সালে জাপান যান। সেখানে গিয়ে তার ভাইয়ের সঙ্গে গাড়ির ব্যবসা শুরু করেন। পরবর্তী সময়ে জাপানিদের সঙ্গে সম্পর্ক হওয়ায় পর সেখান থেকে তিনি থাইল্যান্ডে যান। থাইল্যান্ডে শিপইয়ার্ডের একটি ব্যবসা শুরু করেন। পরবর্তী সময়ে জাপানিদের মাধ্যমে উত্তর কোরিয়ার এক ব্যক্তির সঙ্গে পরিচয় হয়। যার নাম মিস্টার দু। এ মিস্টার দু সেলিমকে বাংলাদেশে একটি কনস্ট্রাকশন সাইট খোলার প্রস্তাব দেন। সেইসঙ্গে বাংলাদেশে একটি অনলাইন ক্যাসিনো খোলার পরামর্শ দেন। সেই সূত্র ধরে সেলিম প্রধান টি-২১ এবং পি২৪ নামে অনলাইন গেমিং সাইট চালু করেন। এর মূল কাজ হচ্ছে টাকার মাধ্যমে খেলা। আমরা জব্দকৃত কাগজপত্র ও সার্ভার পর্যালোচনা করে দেখতে পেয়েছি এই অনলাইন খেলার মাধ্যমে একটি গেটওয়ের মাধ্যমে প্রতি মাসে ৯ কোটি টাকা আয় হতো। এই রকম আরও কয়েকটি গেটওয়ে রয়েছে। সেলিম প্রধানের বাসা থেকে হরিণের চামড়া পাওয়ায় বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইন, টাকা জব্দের ঘটনায় মানি লন্ডারিং আইন ও মদ পাওয়ায় মাদকদ্রব্য আইনে মামলা হয়েছে। ওইসব মামলায় সেলিম প্রধান ও তার দুই সহযোগী আক্তারুজ্জামান ও রহমানকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।

র‌্যাব কর্মকর্তা সারোয়ার বলেন, অনলাইনে বিশ্বের সুপরিচিত ক্যাসিনোগুলোর সঙ্গে জুয়াড়িদের যুক্ত করার কাজ করতেন সেলিম। অনলাইনে ক্যাসিনো কার্যক্রমে অংশ নেওয়ার আগে প্রত্যেক জুয়াড়িকে নির্দিষ্ট ব্যাংকে অ্যাকাউন্ট খুলতে হতো। এখন পর্যন্ত এমন তিনটি ব্যাংকের নাম জানতে পেরেছে র‌্যাব। ব্যাংকগুলো হলো যমুনা ব্যাংক, কমার্শিয়াল ব্যাংক ও শিলং ব্যাংক। অ্যাকাউন্টগুলোয় নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা রাখতে হতো। খেলায় জিতলে বা হারলে ওই অ্যাকাউন্টে টাকা যোগ হতো বা কাটা যেত। সম্পূর্ণ লেনদেন হতো একটি গেটওয়ের মাধ্যমে। তিনি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান ‘প্রধান গ্রুপ’-এর কর্ণধার। তার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে জাপান-বাংলাদেশ সিকিউরিটি প্রিন্টিং অ্যান্ড পেপারস লিমিটেড, পি২৪ ল’ ফার্ম, এইউ এন্টারটেইনমেন্ট, পি২৪ গেমিং, প্রধান হাউস ও প্রধান ম্যাগাজিন। এর মধ্যে পি২৪ গেমিংয়ের মাধ্যমে তিনি জুয়াড়িদের ক্যাসিনোয় যুক্ত করতেন।