প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আগামীকাল চার দিনের সরকারি সফরে ভারত যাচ্ছেন। টানা তৃতীয়বারের মতো সরকার গঠনের পর এটিই প্রধানমন্ত্রীর প্রথম ভারত সফর। দুদিনের এক ইকোনমিক সামিটে অংশ নেওয়ার উদ্দেশ্যে এই সফর হলেও এটি ক‚টনৈতিক রাজনীতি এবং স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়াদির বিবেচনায় দুই দেশের কাছেই গুরুত্বপূর্ণ। ৫ অক্টোবর শনিবার শেখ হাসিনা ও নরেন্দ্র মোদির দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে।
ক‚টনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি বাংলাদেশের জন্য বড় আশার সফর।
রোহিঙ্গা ইস্যু, তিস্তার পানিসহ দুই দেশের অমীমাংসিত ইস্যু এবং সর্বশেষ আসামের নাগরিকপঞ্জি নিয়ে দুই প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক থেকে সুখবর আসবেÑ এই আশায় রয়েছে বাংলাদেশের মানুষ। তা ছাড়া সম্প্রতি ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে শেখ হাসিনার দুর্নীতিবিরোধী অভিযান নিয়েও আলোচনা হতে পারে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, গত এক মাসে ভারতের মন্ত্রী-এমপিদের হুঁশিয়ারি ‘আসামের অবৈধরা বাংলাদেশের নাগরিক এবং তাদের পাঠিয়ে দেওয়া হবে’Ñ বিষয়টি নিয়ে দেশব্যাপী উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। দুই প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে। যদিও জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশনের ফাঁকে শেখ হাসিনার সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে এ বিষয়ে উদ্বিগ্ন না হতে বাংলাদেশকে আশ্বস্ত করেন নরেন্দ্র মোদি। বাংলাদেশ প্রতিবেশী দেশকে এ ইস্যুতে বিশ্বাস করতে চায়।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরে দুই দেশের মধ্যে তিস্তার পানি বণ্টন ও রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন বিষয়ে আলোচনা হতে পারে। পাশাপাশি আটটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। যোগাযোগ, সংস্কৃতি, কারিগরি সহযোগিতা, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ খাতে এসব সমঝোতা হতে পারে।
সাবেক পররাষ্ট্র সচিব ওয়ালি উর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, রোহিঙ্গা ও তিস্তার সঙ্গে নতুন করে যুক্ত হয়েছে এনআরসি। ইউএন সফরে মোদির সঙ্গে শেখ হাসিনার এ বিষয়ে ইতিবাচক আলোচনা হলেও মানুষের উদ্বেগ রয়েছে। হাসিনা-মোদির আনুষ্ঠানিক বৈঠকে আসাম থেকে অবৈধদের বাংলাদেশে পাঠাবে না ভারতÑ এই সিদ্ধান্তই জানতে চায় মানুষ। রোহিঙ্গা ইস্যুতে সবসময় ভারত বাংলাদেশের পক্ষে থাকার ঘোষণা দিলেও আন্তর্জাতিক মহলে কোনো উদ্যোগ নেয়নি। রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানে ভারতের সরাসরি সমর্থন আদায় চায় জনগণ। আর তিস্তা নিয়ে তো মোদি বাংলাদেশ সফরে কথা দিয়েছিলেন, এটা তার সরকার বাস্তবায়ন করবে। তাই সব মিলিয়ে শেখ হাসিনার ভারত সফরে বড় প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, আগামী ৩-৪ অক্টোবর ইন্ডিয়া ইকোনমিক সামিট হবে ভারতে। এতে শেখ হাসিনার সঙ্গে যৌথভাবে কো-চেয়ার থাকতে পারেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। এ সামিটে অংশ নেওয়ার পাশাপাশি ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকেও অংশ নেবেন তিনি। ৫ অক্টোবর এ বৈঠক হওয়ার কথা।
এ সফরে দু-দেশের মধ্যে যোগাযোগ, সংস্কৃতি, কারিগরি সহযোগিতা, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ খাতে প্রায় আটটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হতে পারে। তবে এ সংখ্যা শেষ মুহূর্তে বাড়তে বা কমতেও পারে।
এ সফর সম্পর্কে ভারতে নিযুক্ত বাংলাদেশ হাইকমিশনার সৈয়দ মোয়াজ্জেম আলী গণমাধ্যমকে জানান, দুই প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে তিস্তা ও রোহিঙ্গা ইস্যুসহ সব বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে জানা গেছে, শেখ হাসিনা ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের (ডবিøউইএফ) ভারতীয় শাখা ইন্ডিয়ান ইকোনমিক ফোরাম-২০১৯ এ যোগ দিতে ৩ অক্টোবর সকালে চার দিনের সফরে দিল্লি পৌঁছাবেন। ওই ফোরামে প্রধানমন্ত্রী বিশেষ করে নিম্ন আয়ের দেশ থেকে মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়াসহ বাংলাদেশের সাম্প্রতিক সময়ের অগ্রগতি ও সমৃদ্ধি তুলে ধরবেন। এর পাশাপাশি তিনি বাংলাদেশের বর্তমান জিডিপি প্রবৃদ্ধি এবং বিগত কয়েক বছরে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে তার সরকারের ব্যাপক সাফল্যের কথাও উল্লেখ করবেন। তিনি ভারতের বড় বড় বিনিয়োগকারীকে বাংলাদেশে আরও বিনিয়োগেরও আহŸান জানাবেন। এ ছাড়া তিনি ভারতের তিনটি চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড এক্সচেঞ্জের নেতাদের সঙ্গে আগামী শুক্রবার যৌথভাবে বৈঠক ও মতবিনিময় করবেন।
ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে শনিবার (৫ অক্টোবর) বেলা সাড়ে ১১টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত ঐতিহাসিক হায়দ্রাবাদ হাউজে। পরে ভারতের প্রধানমন্ত্রী আয়োজিত মধ্যাহ্নভোজে যোগ দেবেন শেখ হাসিনা। বিকেলে শেখ হাসিনা ভারতের রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন। এদিকে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এস জয়শঙ্কর সকালে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন।
এ ছাড়া ভারত সফররত সিঙ্গাপুরের ডেপুটি প্রধানমন্ত্রী হেং সুয়ে কেট শুক্রবার বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন। তিনি রবিবার ভারতের কংগ্রেস পার্টির প্রধান সোনিয়া গান্ধীর সঙ্গেও বৈঠক করবেন।
প্রথম দিন বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ হাইকমিশন আয়োজিত সংবর্ধনা ও নৈশভোজে যোগ দেবেন প্রধানমন্ত্রী। এ ছাড়া জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবন ও কর্মভিত্তিক ফিচার ফিল্ম তৈরির বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনার জন্য ভারতের প্রখ্যাত চিত্রপরিচালক শ্যাম বেনেগাল রবিবার বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন। বাংলাদেশ-ভারত যৌথভাবে প্রযোজিত বঙ্গবন্ধুর ওপর নির্মিত চলচ্চিত্র মুজিববর্ষ ২০২০-২১ শেষ হওয়ার আগে মুক্তি পাবে। ভারত সফর শেষে প্রধানমন্ত্রী রবিবার বিকেলে দেশের উদ্দেশে দিল্লি ত্যাগ করবেন।