পদ্মার পানিতে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত

ভারতের বিহারে অতি বৃষ্টির কারণে বাংলাদেশের পশ্চিম ও মধ্যাঞ্চলের নদ-নদীর পানি বাড়ছে। গতকাল মঙ্গলবার গঙ্গা-পদ্মার তিন থেকে চারটি পয়েন্টে পানি বিপদসীমা অতিক্রম করেছে। ফলে পদ্মা তীরবর্তী জেলার মধ্যে রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, কুষ্টিয়ার বিভিন্ন স্থানে বন্যা দেখা দিয়েছে। নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে পানিবন্দি হয়ে পড়েছে হাজার হাজার মানুষ। পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রকৌশলীরা বলছেন, আগামী তিন-চার দিন পানি বাড়বে। এক সপ্তাহ বা তারও বেশি দিন বন্যা স্থায়ী হতে পারে।

গতকাল আবহাওয়ার পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, দেশের কোথাও ভারী বৃষ্টির শঙ্কা নেই এবং চলমান বৃষ্টি পরিস্থিতি আজ বুধবার থেকে অনেকটাই কমে যাবে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ রুহুল কুদ্দুস গতকাল রাতে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বুধবার (আজ) থেকে বৃষ্টি কমতে শুরু করবে। দুদিন বিরতি দিয়ে সীমিত পরিসরে আবার শুরু হতে পারে। তবে সেই বৃষ্টির মাত্রা গত কয়েক দিনের মতো হবে না।’

গতকাল রাজশাহী পয়েন্টে পদ্মার পানি বিপদসীমা ছুঁইছুঁই করছে। যেকোনো সময় বিপদসীমা ১৮.৫০ মিটার অতিক্রম করতে পারে বলে জানিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা। এরই মধ্যে নিম্নাঞ্চল জলমগ্ন হয়ে পড়েছে। কুষ্টিয়ায় শেষ মুহূর্তের বন্যায় বিপদসীমা অতিক্রম করে জেলার পাঁচটি উপজেলার আংশিক লোকালয়ে প্লাবিত হয়েছে। পদ্মা নদীতে পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় চাঁপাইনবাবগঞ্জের

চরাঞ্চলের আরও বেশকিছু গ্রাম বন্যাকবলিত হয়েছে। রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার দৌলতদিয়া ও দেবগ্রাম ইউনিয়নে আবারও পদ্মার ভাঙন শুরু হয়েছে। এতে করে ভাঙনের হুমকিতে রয়েছে দৌলতদিয়া লঞ্চ ও ফেরিঘাটসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা।

বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আরিফুজ্জামান ভ‚ঁইয়া গতকাল রাতে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ফারাক্কার গেট খুলে দেওয়ার সঙ্গে দেশের বন্যা পরিস্থিতির কোনো সম্পর্ক নেই। মূলত ভারতের বিহারে অতি বৃষ্টির পশ্চিম ও মধ্যাঞ্চলের নদ-নদীর পানি বাড়ছে। বাংলাদেশে কয়েক দিন ধরে যে বৃষ্টি হচ্ছে, তার কারণেও কিন্তু পানি বাড়ছে না। পানি বিহারের বন্যার কারণেই বাড়ছে। আর ফারাক্কার বাঁধ খুলে দেওয়ার খবরটিরও কোনো ভিত্তি নেই। এর অথেনটিক কোনো সোর্স নেই।’ তিনি বলেন, ‘এই সময়ে এমনিতেই ফারাক্কার অধিকাংশ গেট খোলাই থাকে। মার্চ-এপ্রিলের শুষ্ক মৌসুমে গঙ্গায় যখন পানি থাকে না তখন পানি বাড়লে ফারাক্কাকে দায়ী করা যেত; কিন্তু মে-অক্টোবর মৌসুমে স্বাভাবিকভাবেই নদ-নদীতে পানি বৃদ্ধি পায়।’

 

রাজশাহীতে পদ্মার পানি বিপদসীমা ছুঁইছুঁই : রাজশাহী পয়েন্টে পদ্মার পানি বিপদসীমা ছুঁইছুঁই করছে। যেকোনো সময় বিপদসীমা ১৮.৫০ মিটার অতিক্রম করতে পারে বলে জানিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা। এরই মধ্যে নিম্নাঞ্চল জলমগ্ন হয়ে পড়েছে। জেলার গোদাগাড়ী, পবা, চারঘাট ও বাঘায় উপজেলার চরাঞ্চলের বিপুলসংখ্যক মানুষ এরই মধ্যে পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। চরাঞ্চলের মানুষ নিরাপদ স্থানের সন্ধানে আবাস ছাড়তে শুরু করেছে। নগরীর পঞ্চবটি, শেখের চক এলাকায় পদ্মা নদীর ধারে বসবাসকারী কয়েকশ পরিবার এখন পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।

রাজশাহী পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপাত্ত সংগ্রহকারী এনামুল হক বলেন, গতকাল সকাল ৯টায় পানির উচ্চতা বেড়ে হয় ১৮ দশমিক ০৫ মিটার। দুপুর ১২টায় হয় ১৮ দশমিক ০৭ মিটার। আর বিকেল ৩টায় পানির উচ্চতা দাঁড়ায় ১৮ দশমিক ০৯ মিটার। অর্থাৎ প্রতি মুহূর্তেই বাড়ছে পদ্মার পানি।

রাজশাহী পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রধান প্রকৌশলী মোহাম্মদ আলী বলেন, পদ্মার পানি বাড়লেও আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। তবে রাজশাহীর গোদাগাড়ী, পবা, বাঘা ও চারঘাট উপজেলার চরাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। সেগুলোতে বন্যায় ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। রাজশাহী জেলা প্রশাসক হামিদুল হক বলেন, সোমবার পর্যন্ত রাজশাহীর চারটি উপজেলার চরাঞ্চলের মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়ে। যাদের মধ্যে এখন পর্যন্ত ৬০০ পরিবারকে চরাঞ্চল থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। তাদের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে।

 

চাঁপাইনবাবগঞ্জের নতুন এলাকা প্লাবিত : টানা বৃষ্টির সঙ্গে ফারাক্কার গেট খুলে দেওয়ার কারণে পদ্মা নদীতে পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় চাঁপাইনবাবগঞ্জের চরাঞ্চলের আরও বেশকিছু গ্রাম বন্যাকবলিত হয়েছে। বন্যায় চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর ও শিবগঞ্জ উপজেলার চরাঞ্চলের ১১ হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় পদ্মায় পানি বেড়েছে ১৮ সেন্টিমিটার। গতকাল দুপুর ১২টায় ২২ দশমিক ১২ সেন্টিমিটার দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তবে তা বিপদসীমার ৩৮ সেন্টিমিটার নিচে রয়েছে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার নারায়ণপুর, আলাতুলি, দেবীনগর, চরবাগডাঙ্গা ও শাহজাহানপুর ইউনিয়নের তিন হাজার পরিবার ও শিবগঞ্জ উপজেলার পাকা, উজিরপুর, মনাকষা, দুর্লোভপুর ও ঘোড়াপাখিয়া ইউনিয়নের আট হাজর পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। এসব এলাকায় ব্যাপক পরিমাণ ফসলি জমিও পানির নিচে তলিয়ে গেছে।

 

কুষ্টিয়ায় লোকালয় প্লাবিত : কুষ্টিয়ায় শেষ মুহূর্তের বন্যায় বিপদসীমা অতিক্রম করে জেলার পাঁচটি উপজেলার আংশিক লোকালয়ে প্লাবিত হয়েছে। গত সোমবার সকাল থেকে গতকাল মঙ্গলবার সকাল ১০টা পর্যন্ত বিপদসীমা অতিক্রমের মাত্রা রেকর্ড করেছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। আকস্মিক এই বন্যায় কৃষি জমির ফসল বিনষ্টের সঙ্গে চরম ভোগান্তির শিকার হয়েছে দুর্গত এলাকার মানুষ।

গত ১৬ সেপ্টেম্বর থেকে পদ্মা নদীতে ক্রমবর্ধমান পানিতে প্রথমদিকে দৌলতপুর উপজেলার নিম্নাঞ্চলের চারটি ইউনিয়নের প্রায় ৩৭টি গ্রামের ১০ হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়। কিন্তু এখন এই বন্যা আর নিম্নাঞ্চলই নয়, আরও চারটি উপজেলার আংশিক লোকালয়ে পানি ঢুকে পড়েছে।

বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড কুষ্টিয়ার নির্বাহী প্রকৌশলী পিযুষ কৃষ্ণ কুÐু জানান, ভারতের উত্তরাঞ্চলে অব্যাহত ভারী বর্ষণের ফলে গঙ্গা অববাহিকায় ১৬ দিন থেকে পানি বাড়তে থাকে। প্রতিদিন গড় দশমিক ৪ থেকে ৮ সেমি পানি বৃদ্ধি পাচ্ছিল। কুষ্টিয়ার হার্ডিঞ্জ ব্রিজ পয়েন্টে সোমবার পানি বৃদ্ধির পরিমাণ ছিল ১৪.১০ সেমি। যেখানে নির্ধারিত বিপদসীমা ১৪ দশমিক ২৫ সেমি। কিন্তু আকস্মিকভাবে গত ২৪ ঘণ্টায় পানি বৃদ্ধির হার দ্বিগুণ বেড়ে যাওয়ায় গতকাল সকাল ১০টায় তা বিপদসীমা অতিক্রম করেছে। সর্বশেষ বেলা ৩টায় হার্ডিঞ্জ ব্রিজ পয়েন্টে কাউন্ট হয়েছে ১৪ দশমিক ২৮ সেমি। এই বৃদ্ধির মাত্রা অব্যাহত রয়েছে। পূর্বাভাসমতে, এই বৃদ্ধির মাত্রা আগামী আরও সাত দিন থাকবে।

কুষ্টিয়া জেলা প্রশাসক আসলাম হোসেন জানান, তাৎক্ষণিকভাবে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে আক্রান্তদের সম্ভাব্য সহযোগিতার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে প্রয়োজনের তুলনায় তা অপ্রতুল। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ইতিমধ্যে সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন মহলে অবগত করা হয়েছে এবং ত্রাণ ও দুর্যোগ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ করা হচ্ছে প্রয়োজনীয় ত্রাণ সহায়তার জন্য।

 

দৌলতদিয়া লঞ্চ ও ফেরিঘাট হুমকির মুখে : রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার দৌলতদিয়া ও দেবগ্রাম ইউনিয়নে আবারও পদ্মার ভাঙন শুরু হয়েছে। এতে করে ভাঙনের হুমকিতে রয়েছে দৌলতদিয়া লঞ্চ ও ফেরিঘাটসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। দফায় দফায় পদ্মার পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় পাল্লা দিয়ে গ্রাস করছে নদীপাড়ের ঘরবাড়ি ও ফসলি জমি।

গত পাঁচ দিনে গোয়ালন্দ উপজেলার দৌলতদিয়া ইউনিয়নের ঢল্লাপাড়া, ১নং বেপারীপাড়া, জলিল মÐলের পাড়া এবং দেবগ্রাম ইউনিয়নের কাওলজানি গ্রামের কয়েকশ বিঘা ফসলি জমি নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। এছাড়া ভাঙনের শিকার হয়ে প্রায় ৩০০ পরিবারের ভিটেমাটি নদীতে বিলীন হয়েছে।

গতকাল দুপুরে সরেজমিনে দৌলতদিয়া লঞ্চঘাট সংলগ্ন ঢল্লাপাড়া, ১নং বেপারীপাড়া, হাতেম মেম্বার পাড়া এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, ক্ষতিগ্রস্তদের আহাজারিতে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের সৃষ্টি হয়েছে। অনেক পরিবার তাদের দীর্ঘদিনের ঠিকানা থেকে সহায়-সম্বল গুটিয়ে অন্যত্র চলে যাচ্ছে। এদের মধ্যে অনেকেই একাধিকবার ভাঙনের শিকার হওয়া পরিবার রয়েছে।

এদিকে দৌলতদিয়া লঞ্চ ও ফেরিঘাটের উজানে দেবগ্রামের কাওলজানি এলাকার ভাঙন দেখে ঘাট এলাকার স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। লঞ্চঘাট এলাকার পাশে থাকা মরিয়ম বিবি ও আ. খালেক শঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, লঞ্চঘাটের সামান্য দূরে কাওলজানি এলাকায় যেভাবে ভাঙন শুরু হয়েছে তাতে কখন যেন ঘাট এলাকায় ভাঙন শুরু হয়। ভাঙন শুরু হলে মুহূর্তের মধ্যে ঘাট এলাকার সব বিলীন হয়ে যাবে।

গোয়ালন্দ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রুবায়েত হায়াত শিপলু বলেন, ভাঙন অব্যাহত থাকলে দৌলতদিয়া ফেরি ও লঞ্চঘাট হুমকির মুখে পড়বে।

গত সোমবার বিকেলে ভাঙন এলাকা পরিদর্শন শেষে রাজবাড়ী-১ আসনের সংসদ সদস্য কাজী কেরামত আলী বলেন, এভাবে ভাঙতে থাকলে দৌলতদিয়া ফেরি ও লঞ্চঘাট রক্ষা করা কষ্টসাধ্য হয়ে পড়বে। তাই অন্তত দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের যাতায়াত ঠিক রাখতে জরুরি ভিত্তিতে ফেরি ও লঞ্চঘাট রক্ষা করতে জরুরিভাবে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পানি উন্নয়ন বোর্ডকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।