মনে করার চেষ্টা করুন তো চলমান ‘শুদ্ধি’ অভিযানে কে কে ধরা পড়ল? দুই সপ্তাহে যারা ধরা পড়ল তারা আওয়ামী লীগের কোন পর্যায়ের নেতা? অভিযানের প্রথমেই অভিযান চালিয়ে অবৈধ অস্ত্র, ইয়াবা ও টাকাসহ নিজ বাড়ি থেকে ধরা হয় খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়াকে। তিনি যুবলীগের একটা ইউনিটের (ঢাকা দক্ষিণ) সাংগঠনিক সম্পাদক। এর পরে ধরা হয় জিকে শামীমকে। তিনি যুবলীগের সমবায় সম্পাদক। আর তৃতীয় আলোচিত যে রাজনৈতিক নেতাকে ধরা হয় তিনি কৃষক লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য শফিকুল আলম ফিরোজ। এর বাইরে লোকমান হোসেন ভূঁইয়া, সেলিম প্রধানসহ আরও কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অভিযান চালিয়ে টাকা ও অবৈধ অস্ত্র মিলেছে আরও যাদের কাছে তাদের মধ্যেও তেমন উল্লেখযোগ্য পদধারী কেউ নেই। এবার ভেবে দেখুন, এদের কি রাজনৈতিক নেতা হিসেবে এর আগে চিনতেন? কেউ কেউ নিশ্চয়ই চিনতেন। কিন্তু কতজন চিনতেন? মানে, এরা নাম করার মতো কোনো নেতা ছিলেন না। ছিলেন, চুনোপুঁটিদের ওপরের সারিতে।
এদের মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত খালেদ, শামীম ও লোকমানকে ‘অপ্রকৃত আওয়ামী লীগার’ হিসেবে চিনিয়ে দিতে ব্যস্ত ক্ষমতাসীনরা। এরা নাকি কেউ ফ্রিডম পার্টি থেকে, কেউ যুবদল থেকে এসে যুবলীগে ঢুকে পড়েছে। আবার কেউ সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার মাথায় ছাতাধরা ব্যক্তি। এ নিয়ে অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, আওয়ামী লীগ-যুবলীগের ছিদ্র এত বড় কেন যা দিয়ে খালেদ-শামীমরা ঢুকে ডাকুরাজত্ব কায়েম করতে পারে? আর তারা এগারো বছর পরে চিহ্নিত হলো কেন? কেউ শুধু ধরা পড়ার পরই তাদের পূর্ব রাজনৈতিক পরিচয় সামনে আনা হয় কেন? দলে থেকে যখন চুরি, ডাকাতি, লুটপাট, সন্ত্রাস করে তখন কেন তারা নেতাদের প্রিয়ভাজন থাকে?
চট্টগ্রামের আওয়ামী লীগ দলীয় এমপি, জাতীয় সংসদের হুইপ সামসুল হক চৌধুরী যুবদল ও জাতীয় পার্টি করে এখন আওয়ামী লীগ নেতা। এই পরিচয় সংবাদমাধ্যমে এসেছে। তিনি ক্লাবভিত্তিক জুয়া থেকে মাসে কত টাকা পেয়ে থাকেন, সে হিসাবও এসেছে। অভিযোগ তুলেছেন আওয়ামী লীগের বর্ষীয়ান নেতা দিদারুল আলম চৌধুরী। তিনি এও বলেছেন যে, এই সামসুল হক চৌধুরী এক সময় আওয়ামী লীগের সমাবেশে বোমা হামলা চালিয়েছিলেন। সামসুল হক চৌধুরীকে তো দল থেকে বহিষ্কার করা হচ্ছে না। দলের নীতিনির্ধারকরা কেউ তার পুরনো পরিচয়কে সামনে এনে ‘অপ্রকৃত আওয়ামী লীগ’ ট্যাগ লাগাচ্ছেন না। ফেইসবুকে আওয়ামী লীগের ভার্চুয়াল কর্মীরাও এ নিয়ে সরব হচ্ছেন না। কিন্তু এই সামসুল হক চৌধুরীকেই যখন গ্রেপ্তার করা হবে (যদি হয়), কিংবা পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দিয়ে তারপর তার বাসায় বা অফিসে অভিযান চালানো হলে কেবল তখনই আওয়ামী লীগের নেতারা ও ভার্চুয়াল কর্মীরা তার পূর্ব রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে সরব হবেন হয়তো। আরেকটি প্রশ্নও অনেকে করছেন। তা হলো, এই অভিযানটি কি দুর্নীতিবিরোধী অভিযান নাকি মদ-জুয়া-ক্যাসিনোবিরোধী অভিযান? যদি দুর্নীতিবিরোধী অভিযান হয়ে থাকে তাহলে বারে, বিউটি পার্লারে, জুয়ার আসরে অভিযানে এত উৎসাহ কেন? এই ‘বড় মাপের’ অভিযানের মধ্যে ৩২৫ টাকাসহ পাঁচ জুয়াড়িকে গ্রেপ্তারের বাহবা কেন নিতে হবে? এখন পর্যন্ত অভিযানের যে ধরন তাতে যে কারও মনে হতে পারে যে এই অভিযানটি মূলত ক্যাসিনো-জুয়া-মদ সংশ্লিষ্ট অবৈধ টাকা আয়ে জড়িতদের বিরুদ্ধে পরিচালিত হচ্ছে।
যদিও প্রধানমন্ত্রী নিউ ইয়র্কে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেছেন, ‘সরকার আগে থেকেই দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে, যাতে এ ধরনের ঘটনা পুনরায় না ঘটতে পারে। এটা বলাই যায় যে, ওয়ান-ইলেভেন পুনরায় ঘটবে না। যদি কোনো অনিয়ম থেকে থাকে, আমি ব্যবস্থা নেব, আমরা ব্যবস্থা নেব। এবং সে যেই হোক না কেন, এমনকি তারা আমার দলের হলেও। যদি আমি দুর্নীতিবাজদের শাস্তি দিতে চাই, আমার ঘর থেকেই তা আগে শুরু করতে হবে।... প্রকল্প প্রস্তুতি থেকে শুরু করে প্রকল্পের কাজ পাওয়ার জন্য অর্থ বিতরণের সুযোগ নিয়ে কিছু লোক বিপুল সম্পদের মালিক বনে যাচ্ছেন। এই অর্থ চটের বস্তাতেও লুকিয়ে রাখা হচ্ছে এবং ওয়ান ইলেভেনের পটপরিবর্তনের পর আমরা এটা দেখেছি। হঠাৎ করে যে সম্পদ আসে তা দেখানো কিছু মানুষের স্বভাব। আমাদের সমাজের এই অংশটিকে আঘাত করতে হবে।’ প্রধানমন্ত্রীর এই কথায় হয়তো অনেকে আশা খুঁজে পাবেন। কিন্তু তার কথা আর এই অভিযানের মধ্যে যে বিস্তর ফারাক সে কথাও অনেকে তুলছেন।
প্রকল্প প্রস্তুতি থেকেই যে ডাকাতি শুরু হয়ে যায় তার সর্বশেষ উদাহরণ গতকাল ০২ অক্টোবরের দেশ রূপান্তরের লিড রিপোর্টটি। রূপপুরের বালিশ কা-কে হার মানানো ‘এবার বালিশ ২৭,৭২০ কভার ২৮,০০০’ শিরোনামে মামুন আবদুল্লাহর রিপোর্টে লেখা হয়, চট্টগ্রামে মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনে উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনায় (ডিপিপি) ৭৫০ টাকার বালিশ ক্রয়ে ব্যয় প্রস্তাব করা হয়েছে ২৭ হাজার ৭২০ টাকা, আর বালিশের কভরের দাম ধরা হয়েছে ২৮ হাজার টাকা, যার বাজার মূল্য ৫০০ টাকা। মাত্র ২০ টাকার হ্যান্ড গ্লাভসের দাম ধরা হয়েছে ৩৫ হাজার টাকা, আর ১৫ টাকার টেস্ট টিউবের দাম ধরা হয়েছে ৫৬ হাজার টাকা। বিল্ডিং নির্মাণে মাল্টিপ্লাগের দাম ধরা হয়েছে ৬ হাজার ৩০০ টাকা, যার বাজার মূল্য মাত্র ২৫০-৫০০ টাকা। অপারেশন থিয়েটারের রাবার ক্লথের বাজার মূল্য ৫-৭শ টাকা হলেও প্রকল্প প্রস্তাবে দাম ধরা হয়েছে ১০ হাজার টাকা, রেক্সিনের বাজার মূল্য ৩-৫শ টাকা হলেও প্রতিটি ৮৪ হাজার টাকায় কেনার প্রস্তাব করা হয়েছে। সুতি তোয়ালে বাজারে ১০০-১০০০ টাকায় পাওয়া গেলেও প্রস্তাবনায় ধরা হয়েছে ৫ হাজার ৮৮০ টাকা। ডাক্তারদের সাদা গাউনের বাজার মূল্য ১০০-২০০০ টাকা হলেও প্রকল্পে প্রস্তাব করা হয়েছে ৪৯ হাজার টাকা। সার্জিক্যাল ক্যাপ ও মাস্কের দাম ধরা হয়েছে ৮৪ হাজার টাকা, যার বাজারমূল্য মাত্র ১০০-২০০ টাকা। বাজারে সু-কভার প্রতিটির দাম ২০-৫০ টাকা, এখানে প্রস্তাব করা হয়েছে ১৭ হাজার ৫০০ টাকা। ক্লিনিক্যাল হেমাটোলজির ৩ কপি বইয়ের সেটের দাম ধরা হয়েছে ৬০ হাজার টাকা করে ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা। যার বাজার মূল্য কমিশন বাদে ২২ হাজার ৫২৫ টাকা। রেসপিরেটরি মেডিসিনের দুই খ-ের দাম ধরা হয়েছে ৮৬ হাজার টাকা করে মোট ২ লাখ ৫৯ হাজার টাকা। কিন্তু অনলাইনে এর বাজার মূল্য কমিশন বাদে ২৭ হাজার ৭৯ টাকা।
২ হাজার ৮০০ কোটি টাকা ব্যয়ের মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের এ প্রকল্পে এখনো উল্লিখিত দুর্নীতি সংঘটিত হয়নি সত্য। কিন্তু যারা এ দুর্নীতির বিশাল ক্ষেত্র তৈরি করেছেন তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা কি নেওয়া হবে? এর আগে এমন অনেক ভয়াবহ দুর্নীতির খবর সংবাদমাধ্যমে এসেছে। প্রকল্পের ২০ শতাংশ শেষ হওয়ার আগেই সব টাকা তুলে শুধু খেয়েই ফেলেনি, প্রকল্প ব্যয় ও সময় বাড়িয়ে দিয়েছে কয়েকগুণ এমন সংবাদও কম হয়নি। দুর্নীতি যে কতটা বিস্তৃত হয়েছে তার কয়েকটা খুচরা হিসাব দেখেই অনেকে হতবাক হয়েছেন। একটা বালিশ কিনে ফ্ল্যাটে ওঠাতে লাগে সাত হাজার টাকা, হাজার টন কয়লা বাতাসে খেয়ে ফেলে, ৩২০ টাকার বই হয়ে যায় ৮৮ হাজার টাকা, একটা পর্দার দাম হয়ে সাড়ে সাঁইত্রিশ লাখ টাকা, এক শিট টিন বা একটা সিলিং ফ্যানের দাম হয় এক লাখ টাকা। পানি শোধনের জ্ঞান নিতে কর্মকর্তাদের উগান্ডা যেতে হয় কয়েক কোটি টাকা ব্যয় করে, পুকুর খনন দেখতেও কোটি টাকা ব্যয়ে কর্মকর্তাদের বিদেশ যেতে হয়। ব্যাংক খাতে ১০ বছরে ১০ বড় কেলেংকারিতেই লোপাট হয়েছে ২২ হাজার ৫০২ কোটি টাকা (সূত্র : সিডিপি)। বর্তমান সরকার ক্ষমতা নেওয়ার সময় ২০০৯ সালে যেখানে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ ছিল ২২ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা, তা এখন বেড়ে হয়েছে প্রায় ১ লাখ ১১ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ সরকারের ১০ বছরে খেলাপি ঋণ বেড়েছে চারগুণ (সূত্র : একাত্তর টেলিভিশন)। আরও অনেক এমপি-মন্ত্রীদের সম্পদের পাহাড় গড়ার খবরও সংবাদমাধ্যমে এসেছে। বিদেশে টাকা পাচারে রেকর্ড, সুইস ব্যাংকে টাকা রাখার রেকর্ড, বিদেশে সেকেন্ড হোম করায় রেকর্ডসহ বহু দুর্নীতির খবর অনেকেরই জানা।
শেয়ারবাজার, হলমার্ক, বিসমিল্লাহ গ্রুপসহ আরও কত কত ভয়াবহ দুর্নীতি ঘটেছে এই এগারো বছরে। কিন্তু চলমান অভিযান কি সেই বড় বড় দুর্নীতির হোতাদের ধারেকাছেও ঘেঁষতে পেরেছে? তা কেন পারেনি তার উত্তর পাওয়া যাবে ২৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯ প্রথম আলোর রিপোর্টে, ‘অভিযানের সঙ্গে যুক্ত র্যাবের একাধিক কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ অধিবেশন শেষে দেশে ফেরার পর অভিযানের গতিপ্রকৃতি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যেতে পারে। তার আগ পর্যন্ত অভিযান যেভাবে চলছে, সেভাবেই চলবে। যাদের নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, তারা গ্রেপ্তার হলে ক্ষমতাসীন দলের অনেকের নাম বেরিয়ে আসবে। তাই ঝুঁকি নিতে চাইছে না আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।’ আরেক রিপোর্টে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পুলিশের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার বরাত দিয়ে পত্রিকাটি লিখেছে, যুবলীগের আলোচিত নেতা ইসমাইল হোসেন সম্রাটকে গ্রেপ্তারের জন্য গ্রিন সিগন্যালের অপেক্ষায় আছে পুলিশ।
এটা অনেকটা স্পষ্ট যে, অনেকের নাম বেরিয়ে আসার ভয় কাটিয়ে গ্রিন সিগন্যাল আসার ওপরই নির্ভর করছে চলমান অভিযানের ভবিষ্যৎ। এসব বিবেচনায় রেখেই অনেকে মনে করেন, আওয়ামী লীগ সরকারের পক্ষে এই অভিযান বেশি দূর এগিয়ে নেওয়া অসম্ভব। আর অভিযানে যে সব ব্যবসায়ী ও আওয়ামী লীগ নেতাদের নাম বেরিয়ে আসবে তাদের ধরতে গেলে এই দলটিতে নেতার আকাল পড়ে যাবে।
লেখক
চিকিৎসক ও কলামনিস্ট
sayantha15@gmail.co