টানা সাত মাস ধরে বিদেশিরা দেশের পুঁজিবাজার থেকে বিনিয়োগ প্রত্যাহার করে নিচ্ছেন। স্থানীয় মুদ্রার অবমূল্যায়ন না হওয়াসহ বিভিন্ন কারণে বিদেশিরা শেয়ার বিক্রি করে দিচ্ছেন, যা বিক্রির চাপ বাড়াচ্ছে। তবে বিদেশিদের তুলনায় শীর্ষস্থানীয় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের আরও বেশি আগ্রাসী ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে দেখা যাচ্ছে। লভ্যাংশের মৌসুমে স্থানীয় এসব প্রতিষ্ঠানের আগ্রাসী বিক্রির কারণে স্টক এক্সচেঞ্জের সূচক নেমে গেছে তলানিতে।
সরকারের পাওনাকে কেন্দ্র করে টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসির সঙ্গে গ্রামীণফোনের বিবাদের জেরে গত সাত মাস ধরেই বিদেশিরা পুঁজিবাজার থেকে বিনিয়োগ প্রত্যাহার করে নিচ্ছেন। এরই ধারাবাহিকতায় সেপ্টেম্বর মাসেও বিদেশিরা ৬০ কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগ তুলে নিয়েছেন। এর ফলে গত মার্চ থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত টানা সাত মাসে শেয়ার বিক্রির মাধ্যমে বিদেশিরা মোট ১৮২ কোটি টাকার বিনিয়োগ প্রত্যাহার করে নিয়েছেন। সদ্য শেষ হওয়া সেপ্টেম্বর মাসে ২৫৭ কোটি ৭৮ লাখ টাকার শেয়ার ক্রয়ের বিপরীতে ৩১৮ কোটি ১০ লাখ টাকার শেয়ার বিক্রি করেছেন।
বিদেশিদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে শীর্ষস্থানীয় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরাও শেয়ার বিক্রি বাড়িয়ে দিয়েছেন। এর মধ্যে আইসিবি ও লংকাবাংলা সিকিউরিটিজ থেকে সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে বেশি শেয়ার বিক্রির চাপ এসেছে। সাম্প্রতিক সময়ে এ দুই প্রতিষ্ঠান স্টক এক্সচেঞ্জের শীর্ষ বিক্রেতা হিসেবে গণ্য হচ্ছে। যদিও পুঁজিবাজারে সবচেয়ে বেশি লেনদেন আসে এ দুই প্রতিষ্ঠান থেকেই। গত ২২ মে থেকে আইসিবির নিট শেয়ার বিক্রি ছিল ৩৩০ টাকার বেশি। এরপর লংকাবাংলা সিকিউরিটিজ থেকেও বড় ধরনের বিক্রিচাপ আসে, যা এখনো অব্যাহত রয়েছে।
বিদেশি ও শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে বড় ধরনের বিক্রিচাপের কারণে ঢাকা ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের সব ধরনের সূচকের অবনতি ঘটেছে। গত ২২ মের পর থেকে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান মূল্যসূচক কমেছে ৩১৪ পয়েন্ট।
নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, দেশের শীর্ষ ব্রোকারেজ হাউজ লংকাবাংলা সিকিউরিটিজ থেকে গত দুই মাসেরও বেশি সময় ধরে শেয়ার বিক্রির চাপ আসছে। অধিকাংশ সময়ই নিট শেয়ার বিক্রির পরিমাণ কয়েক কোটি টাকার ঘরে সীমাবদ্ধ থাকলেও গত ৩০ সেপ্টেম্বর বড় ধরনের বিক্রির চাপ আসে এ ব্রোকারেজ হাউজ থেকে। সেদিন ব্রোকারেজ হাউজটির মোট লেনদেনের ৮৬ শতাংশ আসে শেয়ার বিক্রি থেকে। গত ৩০ সেপ্টেম্বর এ প্রতিষ্ঠানটি ২৩ কোটি টাকার শেয়ার ক্রয়ের বিপরীতে ১৪৫ কোটি ৭৮ লাখ টাকার শেয়ার বিক্রি করে। এর মধ্য দিয়ে গত কয়েক মাসের সেরা বিক্রেতা হিসেবে লংকাবাংলা সিকিউরিটিজের নাম উঠে আসে।
এ বিষয়ে লংকাবাংলা সিকিউরিটিজের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা খন্দকার সাফাত রেজা দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমাদের সিকিউরিটিজ হাউজ থেকে যে বিক্রিচাপ দেখা গেছে, তা মূলত এসেছে গ্রাহকদের কাছ থেকে। এখন গ্রাহক যদি শেয়ার বিক্রি করতে চান, আমরা তো বাধা দিতে পারি না। এ বিক্রিচাপের বড় অংশই এসেছে বিদেশিদের কাছ থেকে। তাদের অন্য দেশে বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে। পার্শ^বর্তী দেশে করহার কমানোর কারণে সেখানে চাঙ্গাভাব দেখা যাচ্ছে। এ কারণেও হয়তো তারা এখান থেকে শেয়ার বিক্রি করে সেখানে বিনিয়োগ করছেন। তবে আমরা বলতে পারি যে, আমাদের নিজস্ব পোর্টফোলিও থেকে শেয়ার বিক্রি করিনি।
এদিকে বিদেশি পোর্টফোলিও ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে রয়েছে ব্র্র্যাক ইপিএল স্টক ব্রোকারেজ, সিটি ব্রোকারেজ ও ইবিএল সিকিউরিটিজ। এসব প্রতিষ্ঠান থেকেও বিক্রিচাপ রয়েছে। গত ২৯ সেপ্টেম্বর ইবিএল সিকিউরিটিজ প্রায় ৯ কোটি টাকার শেয়ার ক্রয়ের বিপরীতে ২২ কোটি টাকার শেয়ার বিক্রি করে। এর বাইরে সাম্প্রতিক সময়ে বিক্রিচাপ এসেছে, ইউনিক্যাপ সিকিউরিটিজ, আর এন ট্রেডিং, এনসিসি ব্যাংক সিকিউরিটিজ, শাহজালাল ব্যাংক সিকিউরিটিজ, এবি সিকিউরিটিজ ও ডিবিএস থেকে। এসব প্রতিষ্ঠানের শেয়ার বিক্রি বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি লেনদেনের পরিমাণও কমে গেছে।
গতকালও বিক্রিচাপের কারণে ডিএসইর প্রধান মূল্যসূচক কমেছে ১৩ পয়েন্ট। লেনদেন নেমে এসেছে ৩৪৬ কোটি টাকায়। গতকাল ডিএসইতে ২০৯টি শেয়ারের দর কমেছে। বিপরীতে ১০৮টির শেয়ার দর বেড়েছে ও ৩৭টির দর অপরিবর্তিত ছিল।