তারুণ্যের প্রতিবন্ধকতা তারুণ্যের সম্ভাবনা

একটা দেশের তারুণ্যের ওপর সে দেশের স্থিরতা ও শান্তিময়তা অনেকাংশে নির্ভরশীল। বাংলাদেশের জনগোষ্ঠীর একটা বড় অংশ তরুণ হলেও বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতার কারণে তাদের মধ্যে স্থিরতা নেই। ফলে দেশের সামগ্রিক স্থিরতা এবং শান্তিময়তায় তা নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। তরুণদের একটা উল্লেখযোগ্য অংশ নানা ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত রয়েছে। এমনকি খুন-ধর্ষণের মতো চরম অপরাধও তাদের কারও কারও দ্বারা সংঘটিত হচ্ছে। সামাজিক অবক্ষয়ের দরুন শিক্ষার্থী কর্র্তৃক শিক্ষক লাঞ্ছিত হচ্ছে। গণমাধ্যমে যেসব খবর আসে, তার বাইরেও অনেক ঘটনা রয়েছে। এসব ঘটনা আমাদের তারুণ্যকে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করছে। অথচ দেশের উন্নয়ন ও সম্ভাবনা তৈরিতে তারা যে একটা বড় ভূমিকা রাখছে, তা এসব ঘটনায় ধামাচাপা পড়ছে।

তারুণ্যের এই বিপথগামিতার পেছনে সবচেয়ে যে বিষয়টি অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে, তা হলো কর্মসংস্থানহীনতা। এ ছাড়া পারিবারিকভাবে যে নৈতিক শিক্ষা পাওয়ার কথা, সেখানেও ঘাটতি রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে অপরাজনীতির প্রভাব, ক্ষমতার অপপ্রয়োগ ও আইনের যথাযথ প্রয়োগে ব্যর্থ হওয়া ইত্যাদি কারণগুলো তারুণ্যের মধ্যে অপরাধপ্রবণতা বৃদ্ধি করছে। তরুণ সমাজে স্থিতিশীলতা আনতে ব্যর্থ হলে টেকসই উন্নয়ন সম্ভব না! উন্নয়নও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যাবে।

বাংলাদেশের সামনে লক্ষ্য হচ্ছে, উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে সুদৃঢ় অবস্থান তৈরি করে উন্নত দেশে রূপান্তরিত হওয়া। সে ক্ষেত্রে মানুষের জীবনমান আরও উন্নত করা, মাথাপিছু আয় বাড়ানো, তরুণ প্রজন্মকে দক্ষতা ও যোগ্যতা অনুযায়ী কর্মে নিয়োগ দান, ২২ শতাংশ অতিদরিদ্র জনগোষ্ঠীকে দারিদ্র্যচক্র থেকে যত দ্রুত সম্ভব বের করা, কন্যাশিশুসহ মাতৃপ্রধান পরিবারগুলোকে সহায়তা করা ইত্যাদি কাজ করতে হবে। শিক্ষিত তরুণরা যেন দেশ-বিদেশে চাকরি করতে পারেন, শ্রমবাজারে ছড়িয়ে পড়তে পারেন, সেই ব্যবস্থাও সরকারকে করতে হবে। কর্মসংস্থানের ব্যবস্থাই হতে পারে এ দেশের তারুণ্যের জন্য সবচেয়ে বড় সমাধান। কর্মসংস্থানই তরুণদের পথচলাকে আনন্দময় করতে পারে।

কর্মসংস্থানের পরিকল্পনা সরকারের আছে। বর্তমান সরকার অনেক এগিয়েছে। আরও বাড়াতে হবে। যেসব পরিকল্পনা করা হয়েছে, সেগুলো বাস্তবায়ন করা গেলে এ ক্ষেত্রে অনেক সমাধান হবে। বেসরকারি খাতকে অনেক বেশি কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। প্রযুক্তি ক্ষেত্রে এগিয়ে যাওয়ায় অদক্ষ লোকের দাম নেই। অনেক ক্ষেত্রে জনবল ছাঁটাই করতে বিভিন্ন সংস্থা। প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা বাড়াতে হবে। কারিগরি শিক্ষায় অধিক গুরুত্ব দিতে হবে। তাহলে তরুণ সমাজকে স¤পদে পরিণত করতে অপেক্ষাকৃত সহজ হবে।

ব্রিটিশ সাময়িকী ইকোনমিস্টের ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (ইআইইউ) এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতি বছরই উচ্চশিক্ষা নিয়ে শ্রমবাজারে আসা চাকরি প্রার্থীদের প্রায় অর্ধেক বেকার থাকছেন অথবা তাদের চাহিদামতো কাজ পাচ্ছেন না। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, এই সময়ে বাংলাদেশের শতকরা ৪৭ ভাগ স্নাতকই বেকার। যেখানে ভারতে ৩৩ শতাংশ, পাকিস্তানে ২৮ শতাংশ, নেপালে ২০ শতাংশ এবং শ্রীলঙ্কায় ৭ দশমিক ৮ শতাংশ বেকার রয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে শ্রমশক্তির পরিমাণ ৫ কোটি ৬৭ লাখ। বছরে গড়ে তিন লাখের মতো কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হয়। বছরে ১৩ লাখের কর্মসংস্থানের প্রয়োজন।

আর আইএলওর তথ্য মতে, বর্তমানে বাংলাদেশে বেকারের সংখ্যা প্রায় তিন কোটি। বেকারত্বের এই ধারা অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশে দু-এক বছরের মধ্যে মোট বেকারের সংখ্যা ছয় কোটিতে দাঁড়াবে। বেকারত্ব বাড়ছে এমন ২০টি দেশের তালিকায় বাংলাদেশের স্থান ১২তম। বেকারের সংখ্যা দেড় দশকের তুলনায় বর্তমানে অনেক বেশি। বেকারদের শতকরা ৭৪ ভাগই তরুণ-তরুণী। কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা না করতে পারলে বিপুলসংখ্যক বেকার সমাজের বোঝা হয়ে যাবে। বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত হবে। তার নমুনা দেখতে পাচ্ছি। চীনের ক্ষেত্রেও তরুণ সমাজের একটি অংশ বেকার-বয়স্ক হয়ে বোঝা হয়ে গেছে। তরুণ সমাজের নিরানন্দ রুখতে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতেই হবে।

বাংলাদেশে কর্মসংস্থানের বড় তিনটি খাত পোশাক, চামড়া এবং ওষুধশিল্প। কিন্তু এ খাতের মূল পদগুলো বিদেশিদের দখলে। আর তার কারণ, আমাদের দক্ষ জনশক্তি নেই। আমরা পোশাকশিল্পের কথা জানি। সেটা কিন্তু পড়তির দিকেই। বাংলাদেশের ওষুধশিল্প কর্মসংস্থানের বড় একটি খাত। সরকারি চাকরির বাইরে প্রতি বছর এখন প্রায় ৭০ হাজার চাকরির ব্যবস্থা হয় এ শিল্পের মাধ্যমে। আরও কয়েকটি খাত কর্মসংস্থানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কৃষিজাত খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, জাহাজ নির্মাণ, পর্যটন ও হালকা কারিগরি নির্মাণশিল্প ইত্যাদি এ পর্যায়ে পড়ে। কিন্তু তারা চাহিদামতো দক্ষ জনশক্তি পাচ্ছে না। বাংলাদেশের পোশাকশিল্পে এখন দরকার ডিজাইনার, বিশেষ করে ফ্যাশন ডিজাইনার। এমবিএ ডিগ্রিধারী হচ্ছে, কিন্তু বেশির ভাগই বেকার থাকছে বা চাহিদামতো চাকরি পাচ্ছে না। অন্যদিকে ফ্যাশন ডিজাইনার আনছি বিদেশ থেকে। পোশাক খাতেই আমরা বছরে বিদেশিদের বেতন দিয়ে থাকি অন্তত পাঁচ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এ অবস্থা অনেক সেক্টরে বিরাজ করছে। শিক্ষার পরিমাণগত হার বাড়ছে কিন্তু চাহিদাসম্মত/কোয়ালিটি শিক্ষার হার খুব কমই বাড়ছে। এ থেকে উত্তরণে উন্নত শিক্ষানীতি ও বিশেষ পরিকল্পনা হাতে নিয়ে আন্তরিকতার সঙ্গে বাস্তবায়ন করতে হবে। মানসম্মত কারিগরি শিক্ষায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।

মাদকাসক্তি দেশের তারুণ্যের জন্য আরেকটি বড় প্রতিবন্ধকতা। এই প্রতিবন্ধকতা দূর করতে সরকার কঠোর অবস্থান নিলেও তা নির্মূল করা যাচ্ছে না। এ ক্ষেত্রে সচেতনতামূলক প্রচারণা এবং নৈতিক শিক্ষার প্রসারের বিকল্প নেই। ইন্টারনেটের কু-প্রভাবগুলোতেও অনেক তরুণ আসক্ত। আবার আকাশ সংস্কৃতির নেতিবাচক দিকগুলোও তরুণদের বিপথগামী করছে। এ ক্ষেত্রে মানবিক বোধ জাগ্রত করার প্রচেষ্টা চালাতে হবে। সে ক্ষেত্রে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং পরিবারের বড় ভূমিকা রয়েছে। তরুণদের জাগিয়ে তুলতে সমাজের সব অংশেরই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।

আমাদের তরুণদের উন্নত সম্ভাবনা আছে। দেশ-বিদেশে তার নমুনাও আমরা দেখতে পাই। ঝলমলে তারুণ্যের দুরন্ত হাওয়ায় উড়তে থাকা সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হবে আমাদের। এরাই সৃষ্টি করে নতুন কেতনের। এ জন্য সরকারি-বেসরকারি ও ব্যক্তি খাতের সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে আন্তরিকতার সঙ্গেই। ব্যাপক কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে পারলে তরুণশক্তিকে কাজে লাগাতে পারব। তাদের পথচলাও হবে মসৃণ। তখন কাজী নজরুলের কণ্ঠে সুর মিলিয়ে তরুণদের উদ্দেশে গাইব

‘ঐ নতুনের কেতন উড়ে, কালবোশেখীর ঝড়

তোরা সব জয়ধ্বনি কর

তোরা সব জয়ধ্বনি কর...’

লেখক : উপপরিচালক, বিআরডিবি, কুষ্টিয়া

abuafzalsaleh@gmail. com