তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তিতে আশ্বাস ও এনআরসিতে বাংলাদেশের পাশে থাকার প্রতিশ্রুতির মধ্যেই শেষ হলো প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দ্বিপক্ষীয় বৈঠক। গতকাল শনিবার নয়াদিল্লির হায়দরাবাদ হাউজে দুই শীর্ষ নেতার বৈঠকের পর দুই দেশের মধ্যে সাতটি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই হয়। পরে দুই প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে চুক্তি ও সমঝোতাপত্র বিনিময় হয়। ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে যৌথ তিনটি প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনও করা হয়।
ভারত-বাংলাদেশে সবশেষ জাতীয় নির্বাচনের পর গতকালই প্রথম আনুষ্ঠানিক দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে বসেন শেখ হাসিনা ও নরেন্দ্র মোদি। তিস্তা ও এনআরসি নিয়ে মোদির পক্ষ থেকে কোনো ঘোষণা না পেলেও এই সফরকে ইতিবাচক মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তিস্তা ছাড়া আরও ছয়টি অভিন্ন নদীর (মনু, মুহুরী, খোয়াই, গোমতী, ধরলা, দুধকুমার) পানিবণ্টনের বিষয়ে দুই নেতা অবিলম্বে একটি খসড়া কাঠামো প্রস্তুতে যৌথ নদী কমিশনকে নির্দেশ দেওয়ায় এ বিষয়ে আশাও দেখছেন তারা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. দেলোয়ার হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, যেখানে এনআরসি নিয়ে গত সপ্তাহে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে মোদি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে আশ্বাস দিয়েছেন এবং বলেছেন, এটা তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়। কাজেই এ বিষয়ে আলোচনা হলো কি না তাতে হতাশ হওয়ার কিছু নেই। তিনি আরও বলেন, ‘তবে দেশের মানুষ তিস্তার পানির যেমন সুষমবণ্টন চান, তেমনি অন্য নদীরগুলোর সমাধানও চান। কাজেই আমি মনে করি, এই সাতটি অভিন্ন নদীর পানি ভাগাভাগি নিয়ে যে দ্বিপক্ষীয় ফ্রেমওয়ার্ক তৈরি করা হচ্ছে, সেই একই ফর্মুলা ভবিষ্যতে তিস্তার ক্ষেত্রেও কাজে লাগানো যেতে পারে।’
বৈঠকের পর এক যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়, “প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘এসব বহুমুখী বহুমাত্রিক সহযোগিতার ফলে আমাদের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক বিশ্ববাসীর সম্মুখে সুপ্রতিবেশীসুলভ সম্পর্কের দৃষ্টান্ত বলে পরিগণিত হচ্ছে। আমি বিশ্বাস করি ভবিষ্যতে এই সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে।’ জবাবে নরেন্দ্র মোদি বলেন, ‘দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক বিশ্বে বন্ধুত্বের অনন্য নজির সৃষ্টি করেছে।’
বৈঠক সম্পর্কে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের দাবি, যৌথ বিবৃতিতে এনআরসি ও তিস্তা নিয়ে কোনো মন্তব্য না এলেও প্রধানমন্ত্রী প্রতিটি বিষয়ে দেশের মানুষের উদ্বেগ ও প্রত্যাশার কথা বলেছেন। তিনি মোদিকে মনে করিয়ে দিয়েছেন, তিস্তার পানিবণ্টন নিয়ে ২০১১ সালে দুই দেশের সরকার যে অন্তর্বর্তী চুক্তির কাঠামোয় একমত হয়েছিল, কবে তার বাস্তবায়ন হবেÑ বাংলাদেশের জনগণ কিন্তু অধীর আগ্রহে সেই অপেক্ষায় আছে। যৌথ বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ‘মোদি বলেছেন, তার সরকার তিস্তায় সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের (স্টেকহোল্ডার) সঙ্গে নিরন্তর কাজ করে চলেছে, যাতে যত দ্রুত সম্ভব তিস্তা চুক্তি সম্পাদন করা যায়।’
রোহিঙ্গাদের টেকসই প্রত্যাবাসনে ত্বরান্বিত প্রচেষ্টা চান দুই নেতা : যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, রোহিঙ্গাদের নিজ ভূমি মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে ‘নিরাপদ, দ্রুত ও টেকসই’ প্রত্যাবাসন ত্বরান্বিত করার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে গতকাল একমত হয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। সেই সঙ্গে তারা রোহিঙ্গাদের ফেরার জন্য রাখাইনে নিরাপত্তা পরিস্থিতি ও আর্থ-সামাজিক অবস্থার উন্নয়নসহ ‘বৃহত্তর প্রচেষ্টা’ নেওয়ার প্রয়োজন সম্পর্কেও ঐকমত্য প্রকাশ করেন।
প্রধানমন্ত্রী মিয়ানমারের বাস্তুচ্যুত মানুষদের সাহায্যে ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বরের পর থেকে ভারতের দেওয়া মানবিক সহায়তার জন্য বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন বলে যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়েছে। এতে বলা হয়, রোহিঙ্গাদের কক্সবাজারের অস্থায়ী শিবিরে আশ্রয়দানে বাংলাদেশ সরকারের মানবিক প্রচেষ্টায় সহযোগিতা করতে ভারত তাদের পঞ্চম কিস্তির মানবিক সহায়তা পাঠাবে।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, রাখাইন প্রদেশের নিরাপত্তা পরিবেশ ও আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতির উন্নতি ঘটিয়েই সেটা করতে হবে।
ভারতের রাষ্ট্রপতিকে সফরের আমন্ত্রণ প্রধানমন্ত্রীর : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আগামী বছর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন কর্মসূচিতে যোগদানে বাংলাদেশ সফরের জন্য ভারতের রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। গতকাল নয়াদিল্লিতে রাষ্ট্রপতি ভবনে তার সঙ্গে সাক্ষাৎকালে প্রধানমন্ত্রী এ আমন্ত্রণ জানিয়েছেন বলে পরে সাংবাদিকদের বলেন পররাষ্ট্র সচিব মো. শহীদুল হক।
ভারতের রাষ্ট্রপতিকে উদ্ধৃত করে পররাষ্ট্র সচিব বলেন, ‘বাংলাদেশ বিভিন্ন আর্থ-সামাজিক খাতে চমৎকার অগ্রগতি অর্জন করেছে। এটি এখন উন্নয়নের একটি রোল মডেল।’
সম্পর্ক ‘আরও উচ্চতায়’ নেওয়ার অঙ্গীকার জয়শঙ্করের : বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ককে ‘আরও উচ্চতায়’ নিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে ভারত। গতকাল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবারও এ অঙ্গীকার করেন।
বৈঠকের পর ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রবীশ কুমার এক টুইট বার্তায় বলেন, ‘জয়শঙ্কর বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের বিষয় সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারের কথা পুনর্ব্যক্ত করেছেন।’ জয়শঙ্করের বক্তব্য উদ্ধৃত করে তিনি আরও বলেন, ‘বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর অত্যন্ত আন্তরিক আলোচনা হয়েছে।’
বৈঠককালে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন, প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা ড. গওহর রিজভী, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম এবং ভারতে বাংলাদেশের হাইকমিশনার সৈয়দ মোয়াজ্জেম আলী উপস্থিত ছিলেন। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে ছিলেন বাংলাদেশে ভারতের হাইকমিশনার রীভা গাঙ্গুলি।