লাগেজ আরমান থেকে নেতা হয়ে ক্যাসিনো কারবারে

আলোচিত যুবলীগ নেতা ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাটের সহযোগী এনামুল হক আরমানের রাজধানীর মিরপুর ২ নম্বরের বাসায় অভিযান চালিয়েছে র‌্যাব-৪। গতকাল রবিবার দুপুর দেড়টার দিকে মিরপুর ২ নম্বর মসজিদ মার্কেটের পাশে ওই বাসায় অভিযান চালিয়ে চেকবই ও স্ট্যাম্প উদ্ধার করেছে র‌্যাব। এর আগে রবিবার ভোরে কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম উপজেলার আলকরা ইউনিয়নের কুঞ্জশ্রীপুর গ্রামের একটি বাড়ি থেকে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সভাপতি সম্রাট ও সহসভাপতি আরমান গ্রেপ্তার হন। ওই সময় ‘মদ্যপ’ থাকায় পরে আরমানকে ছয় মাসের সাজা দিয়ে কারাগারে পাঠিয়েছে ভ্রাম্যমাণ আদালত। গ্রেপ্তারের পর তাকে যুবলীগ থেকে বহিষ্কার করা হয়।

গতকাল সন্ধ্যায় মিরপুরে আরমানের বাসায় অভিযান শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন র‌্যাব-৪-এর অধিনায়ক (সিও) অতিরিক্ত ডিআইজি মো. মোজাম্মেল হক। এ সময় তিনি বলেন, দুপুর দেড়টা থেকে

 

 অভিযান শুরু হয়, চলে সন্ধ্যা সাতটা পর্যন্ত। অভিযানে বাসা থেকে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের মালিকানাধীন দলিল, ১২টি চেকবই ও ২০ থেকে ২৫টি বø্যাংক স্ট্যাম্প উদ্ধার করা হয়েছে। স্ট্যাম্পগুলোতে বিভিন্ন মানুষের স্বাক্ষর রয়েছে। তিনি বলেন, ১০টি দলিল আরমানের দ্বিতীয় স্ত্রী বীথি বেগমের নামে এবং দুটি দলিল আরমানের নামে। তার স্ত্রীকে খোঁজা হচ্ছে। তাকে পেলে সব বিষয়ে জানা যাবে।

র‌্যাবের এই কর্মকর্তা বলেন, মিরপুরের সি-বøকের এই ভাড়া বাসায় আরমানের দ্বিতীয় স্ত্রী ও চার সন্তান থাকেন। আরমান মাঝেমধ্যে এখানে যাতায়াত করতেন। তার প্রথম স্ত্রীও এই বাসায় মাঝেমধ্যে আসতেন।

তিনি বলেন, আমরা মনে করি র‌্যাবের অভিযানের বিষয়টি আগে থেকেই তারা জানতে পারেন। ভোর সাড়ে চারটার দিকে আরমানের স্ত্রী ও তার সন্তানরা বাসা থেকে বের হয়ে গেছেন। এ বাসা থেকে তেমন কিছু উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। তল্লাশি শেষে দ্বিতীয় তলার ফ্ল্যাটের তিনটি রুম সিলগালা করা হয়েছে। অভিযানের শুরু থেকে র‌্যাব সদর দপ্তরের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আনিসুল হক উপস্থিত ছিলেন।

কে এই আরমান

আরমান গ্রেপ্তারের পর একে একে বের হয়ে আসছে তার উত্থানের তথ্য। আরমানের ঘনিষ্ঠ একাধিক যুবলীগ নেতা দেশ রূপান্তরকে জানান, একসময় রাজধানীর বায়তুল মোকাররম এলাকায় লাগেজ বিক্রি করা আরমানই এখন প্রভাবশালী যুবলীগ নেতা। পাকিস্তান ও সিঙ্গাপুর থেকে লাগেজসহ বিভিন্ন পণ্য এনে বায়তুল মোকাররমে বিক্রি করতেন তিনি। সেই সুবাদেই সিঙ্গাপুরের ক্যাসিনোতে আসা-যাওয়া ছিল তার। আরমান একসময় বিএনপির রাজনীতি করতেন। এর মধ্যেই খালেদা জিয়ার নিকটাত্মীয় ‘বাউন্ডারি ইকবাল’ হিসেবে পরিচিত ইকবাল হোসেনের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা বাড়ে। ইকবালের মাধ্যমে হাওয়া ভবনে যাতায়াত শুরু করেন আরমান। সেই সময় ক্ষমতায় থাকা বিএনপির ছত্রচ্ছায়ায় মতিঝিল ক্লাবপাড়ায় প্রভাবশালী হয়ে ওঠেন তিনি। তখনই ফকিরাপুলের কয়েকটি ক্লাবের জুয়ার আসর নিয়ন্ত্রণ করা শুরু করেন। বিএনপি ক্ষমতাচ্যুত হলে যুবলীগ নেতা সম্রাটের ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠেন তিনি। সম্রাট ঢাকা দক্ষিণ যুবলীগের সভাপতি হলে সহসভাপতি করা হয় আরমানকে। এ সময় ক্যাসিনোর লাভজনক ব্যবসা সম্পর্কে সম্রাটকে ধারণা দেন তিনি। সে থেকেই রাজধানীর ক্যাসিনো জগতের অবিসংবাদিত নিয়ন্ত্রক হয়ে ওঠেন ইসমাইল হোসেন সম্রাট আর তার ডান হাত এনামুল হক আরমান। আরমানের বড় পরিচয় যুবলীগ নেতা সম্রাটের হয়ে ক্যাসিনোর টাকা সংগ্রহ করতেন তিনি। যদিও যুবলীগের অনেক নেতার দাবি, আরমানের মাধ্যমেই ক্যাসিনোর সঙ্গে জড়িত হন সম্রাট। রবিবার ভোরে আটকের আগ পর্যন্ত আরমানের নাম তেমন একটা শোনা যায়নি। পরে জানা যায় সম্রাট ও আরমান পরস্পর যোগসাজশে রাজধানীতে গড়ে তোলেন অবৈধ ক্যাসিনো সাম্রাজ্য।

র‌্যাবের গোয়েন্দারা বলছেন, সম্রাটের অবৈধ ক্যাসিনো বাণিজ্য যেসব যুবলীগ নেতা পরিচালনা করতেন তার মধ্যে আরমান অন্যতম। সম্রাট ও সাঈদের পরেই ক্যাসিনো ব্যবসায় সবচেয়ে বেশি নামডাক আরমানের। ক্যাসিনো বাণিজ্যের মাধ্যমেই সম্রাটের সঙ্গে আরমানের সুসম্পর্ক হয়। পরে যৌথভাবে তারা রাজধানীর ক্যাসিনোগুলো পরিচালনা করেন। ক্যাসিনো বাণিজ্য করে সম্রাটের পাশাপাশি অঢেল সম্পদের মালিক হয়েছেন আরমান। প্রতি রাতে ক্যাসিনো থেকে আসা সম্রাটের ৪০ লাখ টাকা আদায় ও হিসাব-নিকাশ করতেন আরমান।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, আরমান চলচ্চিত্র প্রযোজক হিসেবেও আত্মপ্রকাশ করেন। সম্প্রতি তিনি শাকিব খানকে নায়ক হিসেবে রেখে দুটি সিনেমা তৈরি করেন। নিজেই প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান খোলেন। ‘দেশ বাংলা মাল্টিমিডিয়া’ নামের চলচ্চিত্র প্রোডাকশন হাউজের প্রধান এই আরমান। গত ঈদুল আজহায় মুক্তি পাওয়া শাকিব খান ও বুবলী অভিনীত ‘মনের মতো মানুষ পাইলাম না’ সিনেমাটির প্রযোজক আরমান। এটি আরমানের প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের প্রথম ফিল্ম। এরপর শাকিব খানের বিপরীতে নবাগত এক নায়িকাকে নিয়ে ‘আগুন’ নামের দ্বিতীয় ফিল্মের কাজও শুরু হয় আরমানের প্রযোজনায়।