উন্নয়ন প্রকল্প মানেই যেন কর্মকর্তাদের বিদেশ ভ্রমণ। ‘পুকুর পুনঃখনন’-এর দক্ষতা, লিফট কেনার অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য বিদেশ ভ্রমণের আলোচনার মধ্যেই চরাঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে নেওয়া নতুন একটি প্রকল্পের অধীনে ৫৩ কর্মকর্তা বিদেশে স্ট্যাডি ট্যুর বা সফরে যাবেন।
নোয়াখালীর সুবর্ণচর ও কোম্পানীগঞ্জ এবং চট্টগ্রামের সন্দ্বীপে এই প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রকল্পের মাধ্যমে উপকূলীয় অধিবাসীদের নিরাপদ বসতি স্থাপন ও তাদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন করা হবে বলে প্রকল্প প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে।
প্রকল্পটির উদ্যোগী হিসেবে রয়েছে ভূমি মন্ত্রণালয়। বাস্তবায়ন করবে পানি উন্নয়ন বোর্ড। সম্প্রতি পরিকল্পনা কমিশনে এই প্রকল্পের প্রস্তাবনা (ডিপিপি) এসেছে। ডিপিপি থেকে জানা গেছে, প্রায় ১৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ‘চর ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড সেটেলমেন্ট প্রজেক্ট’ হাতে নেওয়া হচ্ছে। এর মাধ্যমে উপকূলীয় চরাঞ্চলের ছয় হাজার ভূমিহীন জনগোষ্ঠীকে খাসজমি বন্দোবস্ত দেওয়া এবং নতুন উপকূলীয় চরাঞ্চলে বসবাসরত জনগণের ক্ষুধা ও দারিদ্র্য হ্রাস করা হবে বলে বলা হয়েছে। তিন বছরের এই প্রকল্পে ৭ কোটি ৮৭ লাখ ৭১ হাজার টাকা দেবে উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা ইফাদ। বাকি ৭ কোটি ১১ লাখ ২১ হাজার টাকা বাংলাদেশ সরকারের।
পরিকল্পনা কমিশনের পর্যালোচনা এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাবনা থেকে জানা গেছে, এই প্রকল্পের আওতায় ৫৩ জনের বৈদেশিক স্টাডি ট্যুর রাখা হয়েছে। আর এই ট্যুর বাবদ ২ কোটি টাকার সংস্থান রাখা হয়েছে। এর মধ্যে সরকারের নিজস্ব তহবিলের ১ কোটি এবং বৈদেশিক সহায়তার ১ কোটি টাকা। কিন্তু এখানে কোন দেশ, কাদের, কোথায় এবং কী ধরনের স্টাডি ট্যুর হবে তা প্রকল্প প্রস্তাবনায় বিস্তারিত উল্লেখ করা হয়নি। পাশাপাশি প্রকল্পের আওতায় ১২ জনের চার্জ অ্যালাউন্স বাবদ সরকারি খাত থেকে ৭৪ লাখ টাকার সংস্থান রাখা হয়েছে। জিওবি খাতে এই ব্যয় বাদ দিতে হবে। তবে একান্ত প্রয়োজনে এটা প্রকল্প সাহায্য খাত থেকে করা যেতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রশিক্ষণ খাতে জিওবি অংশ থেকে ৫০ লাখ টাকা বরাদ্দ প্রস্তাব করা হয়েছে। এখানেও কোনো বিস্তারিত বিবরণ উল্লেখ করা হয়নি। এটা ৫ লাখ টাকা করার জন্য প্রস্তাব দিয়েছে পরিকল্পনা কমিশনের সেচ উইং। এই প্রকল্পের জন্য ১ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি জিপ কেনার প্রস্তাব করা হয়েছে। এই ব্যয় যৌক্তিক করার জন্য বলা হয়েছে।
এ ব্যাপারে কার্যপত্রে সেচ উইংয়ের অভিমতে বিদেশ ট্যুরে ইতিবাচক সাড়া দেখা যায়। সেখানে বলা হয়েছে, প্রকল্পটি ছোট এবং বৈদেশিক সহায়তায় বাস্তবায়িত হবে বিধায় বৈদেশিক স্টাডি ট্যুর বাবদ প্রকল্প সাহায্য থেকে ১ কোটি টাকার সংস্থান রাখা যেতে পারে। এ ছাড়া প্রস্তাবিত স্টাডি ট্যুরে বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি), অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি), পরিকল্পনা বিভাগের কার্যক্রম বিভাগ, একনেক অনুবিভাগ ও পরিকল্পনা কমিশনসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা সংস্থার প্রতিনিধি অন্তর্ভুক্ত করে ব্যাচ পুনর্গঠন করা যেতে পারে বলে মত দিয়েছে কমিশন।
প্রস্তাবিত প্রকল্পের জন্য ২০১৭ সালে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা করা হয় ইফাদ ও নেদারল্যান্ডস সরকারের পক্ষ থেকে। সেই সমীক্ষার আলোকেই এই প্রকল্প।
প্রকল্পের প্রেক্ষাপটে জানা গেছে, নেদারল্যান্ডস সরকারের আর্থিক ও কারিগরি সহায়তায় ১৯৮০ সাল থেকে সমুদ্র থেকে ভূমি পুনরুদ্ধার ও চর উন্নয়নের কাজ শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চল, বিশেষ করে নোয়াখালী জেলায় চর উন্নয়ন ও বসতি স্থাপন প্রকল্প-১, ২, ৩, ও ৪-এর মাধ্যমে ১৯৯৪ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত ব্যাপক চর উন্নয়ন এবং ভূমি মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ভূমি বন্দোবস্তের কার্যক্রম হাতে নেওয়া হয়। ইতিমধ্যে এ প্রকল্পের মাধ্যমে ২৫ বছরে সমুদ্র থেকে জেগে ওঠা ৪৫ হাজার একর জমির সার্বিক উন্নয়ন সাধন করে ভূমি মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত ৩৫ হাজার ভূমিহীন পরিবারকে কৃষি খাসজমি বন্দোবস্ত প্রদান করে পুনর্বাসন করা হয়েছে।
অন্যতম বাস্তবায়নকারী সংস্থা নোয়াখালী জেলা প্রশাসক তন্ময় দাসের কাছে ৫৩ জনের বিদেশ সফরের ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি জানান, প্রকল্পটি এখনো পাস হয়নি। প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটিতে অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়েছে। এখানে প্রায় ১৮টি কম্পোনেন্ট আছে। ফলে বিস্তারিতভাবে আমি কিছুই বলতে পারব না। তবে প্রকল্প পরিচালকের সঙ্গে আলাপ করলে বিস্তারিত জানা যাবে।
বিদেশ ট্যুরের ব্যাপারে বিশ্বব্যাংকের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন অভিমত ব্যক্ত করে বলেন, নদী বা সমুদ্র যেখানে থাকে বা আছে, সেখানে চর থাকবেই। কিন্তু চর থাকলেই সেখানে দরিদ্র মানুষ থাকবে, সেটা ঠিক না। চর ও চরের মানুষের উন্নয়নের জন্য বিদেশে স্টাডি ট্যুর করতে হবে, এটা হাস্যকর। একজন শিশুও বলতে পারবে এটার প্রয়োজন আছে কি না।
কয়েক দিন আগে বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্র্তৃপক্ষের (বিএমডিএ) একটি প্রকল্পের আওতায় ‘পুকুর পুনঃখনন’-এর দক্ষতা নিতে এই প্রকল্পের ১৬ জন কর্মকর্তার বিদেশ সফরের জন্য ১ কোটি ২৮ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়। এর কয়েক দিন পরেই জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ে লিফট কেনার কাজে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের টাকায় সুইজারল্যান্ড ও স্পেন সফরের কথা ছিল উপাচার্যসহ ৯ জনের একটি দলের। এখন উপাচার্য যাচ্ছেন না। তবে বাকি আটজন যাচ্ছেন বলে জানা গেছে।