৮৮% শ্রমিককে নিয়োগপত্র দেন না মালিকপক্ষ

শ্রম আইন অমান্য করে দেশের অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে কর্মরত শ্রমিকদের ৮৮ শতাংশকেই কোনো নিয়োগপত্র দেন না মালিকপক্ষ। তাদের ৭০-৮০ শতাংশই কর্মস্থলে মৌখিক ও শারীরিক নির্যাতনের শিকার হন। বিনা নোটিসে চাকরিচ্যুত হন ৬১ শতাংশ শ্রমিক। এছাড়া আইন অনুযায়ী কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা, কর্মঘণ্টা, মজুরির ক্ষেত্রেও বড় ধরনের বৈষম্যের শিকার হন তারা। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজ (বিলস) ও অ্যাকশনএইড বাংলাদেশের যৌথ গবেষণায় উঠে এসেছে এ সব তথ্য। গতকাল সোমবার ‘বিশ্ব শোভন কর্মদিবস’ উপলক্ষে জাতীয় প্রেস ক্লাবে আয়োজিত শ্রমিক সমাবেশ ও আলোচনা সভায় গবেষণা প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়।

অনুষ্ঠানে জানানো হয়, হোটেল-রেস্টুরেন্ট, অটোমোবাইল, নির্মাণ খাত, বিউটি পার্লার ও অনলাইন ব্যবসা এই পাঁচটি অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে কর্মরত শ্রমিকদের ওপর ২০১৮ সালে গবেষণাটি চালানো হয়। প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক মোস্তাফিজ আহমেদ।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে বর্তমানে মোট জনশক্তির ৮৫ ভাগই অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে কর্মরত; যার সংখ্যা ৫ কোটি ৭০ লাখ। তাদের ৯০ ভাগই তরুণ। যার ৯২ শতাংশ নারী ও ৮২ ভাগ পুরুষ। বাংলাদেশের শ্রম আইন-২০০৬ ও আন্তর্জাতিকভাবে ৮ ঘণ্টা কর্মঘণ্টা স্বীকৃত হলেও অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের প্রায় ১০-১৬ ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করান মালিকপক্ষ। অতিরিক্ত শ্রম দিলেও তাদের অন্তত ৬৪ শতাংশই ওভারটাইম পান না। নিয়মিত মজুরি থেকে বঞ্চিত ৬০ শতাংশ শ্রমিক। ৯৮ শতাংশই নিজ পেশায় সরকার নির্ধারিত মজুরি জানেন না।

প্রতিবেদন অনুসারে, বিলম্বে উপস্থিতিসহ নানা কারণে ৬১ শতাংশ তরুণ শ্রমিক মালিকদের পূর্ব নোটিস ছাড়াই চাকরিচ্যুত হন। চাকরিচ্যুতির হার হোটেল ও রেস্টুরেন্ট খাতে সবচেয়ে বেশি ৭৬ শতাংশ। আইন অনুযায়ী, শিশুশ্রম নিষিদ্ধ হলেও প্রায় সব খাতেই শিশু শ্রমিক নিয়োগ করা হয়। অপ্রাতিষ্ঠানিক খাত ঝুঁকিপূর্ণ হলেও ৬৬ শতাংশ শ্রমিকের কোনো সুরক্ষা সরঞ্জাম নেই। ৭০ শতাংশ শ্রমিকের দক্ষতা উন্নয়নের কোনো ব্যবস্থা করে না কর্র্তৃপক্ষ। কর্মক্ষেত্রে নির্যাতনের শিকার ৬২ শতাংশ শ্রমিক অভিযোগ করতে পারেন না। কারণ অভিযোগের কোনো স্থান নেই।

অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে ‘শোভন কাজ’ নিশ্চিত করতে বিলস ও অ্যাকশন এইডের পক্ষ থেকে ৯ দফা সুপারিশ তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে শ্রমিকদের জন্য সুনির্দিষ্ট নীতিমালা তৈরি, বিদ্যমান আইনের বাস্তবায়ন, শ্রম পরিদর্শকের ক্ষমতা বৃদ্ধি, শ্রমিকের ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ উল্লেখযোগ্য।

সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে শ্রম মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সদস্য ইসরাফিল আলম বলেন, ‘বাংলাদেশে শ্রমিক অধিকার সবচেয়ে পশ্চাৎপদ অবস্থায় রয়েছে। এমনকি শ্রমিক নিষ্পেষণে বাংলাদেশ বিশ্বের দ্বিতীয় ঝুঁকিপূর্ণ দেশ।’ এজন্য ট্রেড ইউনিয়নগুলোর রেষারেষিকে দায়ী করেন তিনি।

সমাজতান্ত্রিক শ্রমিক ফ্রন্টের সভাপতি রাজেকুজ্জামান রতন বলেন, ‘শ্রমিকদের দুর্গতির জন্য অসংগঠিত অবস্থা প্রধানত দায়ী। শ্রমের মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের শ্রমিক হিসেবে স্বীকৃতি সবার আগে প্রয়োজন।’

অনুষ্ঠানে শ্রমিক নেতারা বলেন, অধিকার প্রতিষ্ঠায় প্রয়োজনে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন করতে হবে।

বিলসের ভাইস চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসাইনের সভাপতিত্বে সমাবেশে বক্তব্য দেন কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের যুগ্ম মহাপরিদর্শক ড. মোস্তাফিজুর রহমান, শ্রমিক নেতা মেসবাহউদ্দিন আহমেদ, ডা. ওয়াজেদুল ইসলাম খান, চৌধুরী আশিকুল আলম, আবুল হোসাইন ও অ্যাকশন এইড বাংলাদেশের উপ-পরিচালক ফারিয়া চৌধুরী প্রমুখ।