প্লাস্টিক দূষণ মোকাবিলায় প্রস্তুতি জরুরি

খাবার থেকে শুরু করে ওষুধ, প্রসাধনী অথবা প্রযুক্তিপণ্যÑ প্রতিটি ক্ষেত্রে মানুষ ব্যবহার করছে পরিবেশ-বিধ্বংসী প্লাস্টিক, যা সমুদ্র ও প্রকৃতি দূষণে মারাত্মকভাবে দায়ী। স্থায়িত্ব, কম খরচ এবং বিভিন্ন আকার ও এর সহজলভ্যের কারণেই প্লাস্টিকের ব্যবহার দিন দিন বাড়ছে। ভোক্তা সমাজ ও উৎপাদনকারীদের মানসিকতা এবং আচরণই এর জন্য দায়ী। প্লাস্টিক অপচনশীল রাসায়নিকদ্রব্য, যা পরিবেশে সহজে মিশে না। তাই পরিবেশের ওপর প্লাস্টিক নেতিবাচক প্রভাব বিস্তার করে। ব্যবহৃত প্লাস্টিক যখন আমরা যেখানে-সেখানে ফেলে দিই, তখন সেই প্লাস্টিক চলে যায় ড্রেন, খাল-বিল, নদী-নালা এবং চূড়ান্ত পর্যায়ে সমুদ্রে। ফলে জীববৈচিত্র্যের ওপরও ফেলছে মারাত্মক প্রভাব।

সাম্প্রতিক বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৩ মিলিয়ন টন প্লাস্টিক প্রতি বছর সাগরে পতিত হওয়ার ফলে ২০৫০ সালের মধ্যে সাগরে মাছের তুলনায় প্লাস্টিকের পরিমাণ বৃদ্ধি পাবে। আরেক হিসাবে বিশ্বজুড়ে প্রতি মিনিটে ৩৩ হাজার ৮০০টি বোতল এবং ব্যাগ সাগরে গিয়ে পড়ছে। বছরে যার পরিমাণ ৮০ লাখ টন, যা জলজ প্রাণীর জন্য হুমকি। সমুদ্রের ঢেউ এবং সূর্যের আলোর প্রভাবে প্লাস্টিকের পণ্য ধীরে ধীরে টুকরো হয়ে মাইক্রোপ্লাস্টিকে পরিণত হয়। পানি ও অন্যান্য খাদ্যের সঙ্গে একসময় এই মাইক্রোপ্লাস্টিক বিভিন্ন জীবের দেহে প্রবেশ করে। একসময় ফুড চেইন বিশেষ করে মাছের মাধ্যমে মানুষের শরীরেও প্রবেশ করে, যা মানবদেহে চরম স্বাস্থ্য বিপর্যয় ঘটায়। এ ছাড়া ক্লোরিনযুক্ত প্লাস্টিক বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ নির্গত করে, যা ভূগর্ভস্থ ও ভূ-পৃষ্ঠীয় পানির সঙ্গে মিশে যায়। আর এভাবেই পানি গ্রহণে তা খাদ্যচক্রে ঢোকার মাধ্যমেও প্রতিনিয়ত আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি। অন্যদিকে প্লাস্টিক উৎপাদন প্রক্রিয়ায় গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ হয়, যা জলবায়ু পরিবর্তনে ভূমিকা রাখছে।

এক সমীক্ষায় দেখা যায়, প্রতি বছর প্লাস্টিক উৎপাদনে প্রায় ১৭ মিলিয়ন ব্যারেল তেল ব্যবহার করা হয়। এক কেজি প্লাস্টিক উৎপাদনে প্রায় দুই থেকে তিন কেজি পরিমাণ বিষাক্ত কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গত হয়, যা বৈশ্বিক উষ্ণায়নে ভূমিকা রাখে। বিশ্বে সবচেয়ে বেশি প্লাস্টিক দূষণসম্পন্ন ২০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১০তম। পৃথিবীতে এখন প্রতি বছর মাথাপিছু ৬০ কেজি প্লাস্টিক ব্যবহার করা হয়। উত্তর আমেরিকা, পশ্চিম ইউরোপ এবং জাপানের মতো শিল্পোন্নত দেশগুলোতে এই পরিমাণ মাথাপিছু ১০০ কেজিরও বেশি। তবে আশার কথা হচ্ছে, বাংলাদেশে পাশের দেশগুলোর তুলনায় এ পরিমাণ এখনো অনেক কম।

বেসরকারি সংস্থা ওয়েস্ট কনসার্নের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৪ সালে বাংলাদেশের মানুষ মাথাপিছু ৩ দশমিক ৫ কেজি প্লাস্টিক ব্যবহার করেছে। আর রি-সাইকেলের হার মাত্র ৯ দশমিক ২ শতাংশ। বিশ্বে প্লাস্টিক রি-সাইক্লিংয়ের শীর্ষে রয়েছে জাপান। শিল্প-কারখানা থেকে শুরু করে গৃহস্থালির ফেলে দেওয়া জিনিসকে কীভাবে পুনর্ব্যবহার করা যায় সেদিকে তারা খুবই মনোযোগী। সে জন্য তারা আলাদাভাবে ও পরিষ্কারভাবে এসব বর্জ্য সংরক্ষণ করে থাকে। তারা বিশ্বাস করে মানুষ চাইলেই প্রকৃতির দূষণ বন্ধ করা সম্ভব। কিন্তু ব্যবহার কম হলেও বাংলাদেশের পরিবেশের ওপর এর ক্ষতিকর প্রভাব অনেক বেশি। কারণ, অনেক দেশের তুলনায় বাংলাদেশের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা তুলনামূলক খারাপ। ফলে প্লাস্টিক, কাচ, কাগজ, কাপড় বা পচনশীল দ্রব্য আলাদাভাবে ব্যবস্থাপনা না করায় অধিকাংশ প্লাস্টিকের মতো অপচনশীল দ্রব্য মিশছে মাটি এবং পানিতে। মানুষের মধ্যে প্লাস্টিকের ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে সচেতনতা না থাকায় নির্দিষ্ট স্থানে নির্দিষ্ট দ্রব্য ফেলার সংস্কৃতি এখনো বাংলাদেশে গড়ে ওঠেনি। ফলে যেখানে-সেখানে ফেলায় নদী-নালা ও খাল-বিলের পানির অবিরাম প্রবাহধারা দেশের অধিকাংশ প্লাস্টিক বয়ে নিয়ে ফেলছে সমুদ্রে।

বিশ্বে প্লাস্টিক দূষণের শীর্ষ দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম ফিলিপাইন। কয়েক দিন আগে একটি বেসরকারি চ্যানেলের প্রতিবেদনে দেখতে পাই, চলতি বছরের জুন মাস থেকে ফিলিপাইনের রাজধানী ম্যানিলা শহরের পাশে বাহানাম নামক একটি গ্রামে চলছে প্লাস্টিকের বিনিময়ে খাদ্য কর্মসূচি। প্রতি দুই কেজি প্লাস্টিকের বিনিময়ে এক কেজি চাল দিচ্ছে সেখানকার গ্রাম কর্র্তৃপক্ষ। প্রত্যেকেই নিজেকে একজন পরিবেশ সুরক্ষাকর্মী মনে করেই প্লাস্টিক সংগ্রহ করছে। দরিদ্র এই এলাকায় প্রতি কেজি চালের দাম ৩০ থেকে ৪০ পেসো। এভাবে প্লাস্টিকের বিনিময়ে চাল পেয়ে অনেকেই খুশি। প্লাস্টিকের দূষণ কমিয়ে পরিবেশ ভালো রাখা ও দারিদ্র্যবিমোচনই এই কর্মসূচির লক্ষ্য। তাদের এই কর্মসূচিতে মানুষের আগ্রহ ক্রমেই বাড়ছে। এই প্রক্রিয়ায় হয়তো একসময় তারা প্লাস্টিক দূষণ কমিয়ে প্রায় শূন্যের কোঠায় নিয়ে আসতে সক্ষম হবে। তবে বাংলাদেশ বিশ্বের প্রথম দেশ, যা ২০০২ সালে পলিথিন ব্যবহার নিষিদ্ধ করে এবং নিউ ইয়র্কে অনুষ্ঠিত সমুদ্র সম্মেলনে ২০২৫ সালের মধ্যেই স্বেচ্ছায় সামুদ্রিক দূষণ কমিয়ে আনার প্রতিশ্রুতিও দেয়।

প্লাস্টিক দূষণরোধের জন্য আমাদের ভোগ, উৎপাদন, ভোক্তা, আচরণ ও রাজনৈতিক চিন্তা-চেতনায় ব্যাপক পরিবর্তন আনতে হবে। এখনই সরকারি আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে প্লাস্টিকের রি-সাইকেলে মনোযোগী হতে হবে। এর বিকল্প ব্যবহারে যেমন পলিথিনের ব্যাগের পরিবর্তে পাটের ব্যাগ, প্লাস্টিকের জগের পরিবর্তে কাচের জগ, সিরামিকের কাপ এবং ঘর-গৃহস্থালিতে বাঁশ, বেত ও কাঠের তৈরি আসবাবপত্র ইত্যাদি ব্যবহারে নিজেকেই গুরুত্ব দিতে হবে, তা না হলে প্লাস্টিক দূষণরোধ কখনোই সম্ভব হবে না। ফলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এই পৃথিবী বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়বে।

লেখক : প্রকৌশলী ও লেখক

nazmulhussen@yahoo.co