গহনা ছাড়া নারীর সাজসজ্জা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। আটপৌরে জীবনে কিংবা অনুষ্ঠানে গহনা চাই-ই চাই। আর সেটা হতে হবে যুগোপযোগী ও নান্দনিক। তাই পরিবর্তন ও পরিবর্ধনের মধ্যেই গহনা পাচ্ছে নিত্যনতুন চেহারা।
অনুষ্ঠানে মেয়েদের প্রথম পছন্দ ভারী গহনা। সোনা, রূপা, মুক্তা এই ধরনের গহনাগুলোই বরাবর পছন্দের তালিকার শীর্ষে। এখন এই ধারায় কিছুটা পরিবর্তন এসেছে। ভারী গহনার চেয়ে হালকা কিছুতেই এখন স্বাচ্ছন্দ্য বেশি। গলায় অল্পসংখ্যক মুক্তা দিয়ে তৈরি একটি মালাতেই আকর্ষণীয় লুক আসে। আর শিক্ষার্থী, কর্মজীবী নারীদের দিনের অনেকটা সময় বাইরে কাটাতে হয় বলে তারা বেছে নেন হালকা গহনা। হাতে বানানো গহনার প্রতি বেশ আগ্রহ তৈরি হয়েছে। কাঠ, পুঁতি দিয়ে তৈরি যে কোনো গহনা জনপ্রিয় হচ্ছে। নানা ব্যস্ততায় মার্কেটে গিয়ে ঘুরে গহনা কেনার সময় কম বলে অনেকেরই প্রথম পছন্দ হয়ে উঠেছে অনলাইনের নানা পেইজগুলো।
হ্যান্ডপেইন্টেড গহনার পেইজ ‘কথক’। পঁচ বন্ধু তিষা, পূজা, অনির্বাণ, রাহী আর রাঘব মিলে তৈরি করছেন কথক। তাদের প্রধান মনোযোগ গ্রাহকের ভালো লাগার দিকে । গহনায় ভিন্নতা আনা থেকে শুরু করে গ্রাহকের দুয়ার পর্যন্ত পৌঁছানো সমস্তটাই তারা বেশ যত্ন নিয়ে করেন। কথক-এ বেশিরভাগ গহনাই হ্যান্ডপেইন্টেড হলেও এক ধরনের নিজস্বতার ছাপ আছে। পোর্ট্রেট ও গহনায় তুলে এনেছেন কথক-এর শিল্পীরা।
ভিন্নধারার হ্যান্ডপেইন্টেড কাজের ট্রেন্ড বিষয়ে জানতে চাইলে তারা বলেন, ‘সব দেশেই নিজস্ব ট্র্যাডিশনাল অলংকার থাকে যেটা আমাদের দেশে নেই বললেই চলে। স্থানীয় অ্যাভেইলেবল ম্যাটেরিয়ালের ব্যবহার আর বাংলা আর্ট কালচারের চৰ্চা ঘিরেই এই সেক্টরে কোনো কাজ হয় না তেমন। এ জন্যই লোকাল ম্যাটেরিয়াল যেমন কাঠ বা মাটির সঙ্গে আর্ট মিলিয়ে ট্রেন্ডি কিন্তু ট্র্যাডিশনাল অর্নামেন্টস শুরু করেছিলাম আমরা।
আমরা যখন শুরু করি তখন অর্নামেন্ট সেক্টরে এই ইমেজটাকে ফোকাসে রেখে কাজ করার মতো একটা অনলাইন পেইজই ছিল। এখন কিন্তু অনেক পেইজ এই ধরনের কাজ শুরু করায় এটা আসলেই একটা ট্রেন্ড হয়ে গিয়েছে। হুটহাট বাইরে যাওয়ার সময়, কোনো মিটিংয়ে, অফিস চলাকালীন যে কোনো সময়ের জন্যই এ ধরনের গহনাগুলো বেশ আরামদায়ক।’
এক্সক্লুসিভ গহনা নিয়ে কাজ করছেন ‘কণ্ঠীর বাক্সে’র কর্ণধার তানজিলা অমি। প্রায় দুই বছর ধরে তিনি নিজ হাতেই গহনা বানাচ্ছেন। কানের দুল, ব্রেসলেট, হিজাব পিন_ এগুলোতে বৈচিত্র্য থাকলেও অমি মূলত বানান গলার মালা। খুব সিম্পল থেকে শুরু করে বেশ ভারী গহনাও তিনি বানিয়ে যাচ্ছেন গ্রাহকদের পছন্দ অনুযায়ী। কোনো বিশেষ উৎসব বা সময়কে কেন্দ্র করে নয়, অমির গহনার চাহিদা থাকে পুরো বছর জুড়েই। এক ডিজাইনের গহনা বেশিসংখ্যক বানান না অমি। এমনকি কিছু গহনা মাত্র এক পিসইতৈরি করেন। এই বিষয়ে তানজিলা অমি’র মতামত হচ্ছে, ‘আমি যখন থেকে কাজ শুরু করেছি তখন থেকেই পাকিস্তানি আর ইন্ডিয়ান গহনায় বাজার সয়লাব ছিল। এখনো তেমন আছে। সেই গহনাগুলো কম দামে এনে দেশে বেশিদামে বিক্রি করাটা যেন খুব স্বাভাবিক একটা প্রক্রিয়া হয়ে গিয়েছিল। সবাই ধরেই নিয়েছিলেন গহনা মানেই ইন্ডিয়ান আর পাকিস্তানি। আমি এই ধারণায় বদল আনতে চেয়েছিলাম। আর সে চেষ্টাই করছি।
আমাদের দেশে এখনো যেহেতু ম্যাটেরিয়ালস হাতে বানানো হয় না তাই উপাদানগুলো বাইরে থেকে আনতে হয়। সেগুলো দিয়েই আমি এক্সক্লুসিভ গহনা বানাই। এখন এই গহনার চাহিদাও অনেক বেশি। সবাইকে চাইলেও তাই দেওয়া সম্ভব হয় না।’
অমি মূলত কাজ করেন নানা ধরনের মুক্তা, স্টোন আর এক্সক্লুসিভ বিভিন্ন ধরনের বিডস দিয়ে। ‘কণ্ঠীর বাক্স' খুব অল্পসংখ্যক গহনা বানায় বলে সেগুলোর ডিজাইনও গড়পড়তা হয় না। আর এই গহনার গ্রাহক ২৫ বছর বয়স থেকে শুরু করে সব বয়সী নারীই। উৎসবে বা ঘরোয়া অনুষ্ঠানের জন্য এই এক্সক্লুসিভ গহনার ট্রেন্ড তৈরি করতে পেরেছেন তানজিলা অমি।
এছাড়াও অফিসে পরার জন্যও তার বানানো গহনা বেশ আরামদায়ক। কণ্ঠীর বাক্সের গহনার দাম মূলত ৩০০ থেকে শুরু করে ২৫০০ টাকা পর্যন্ত। তিনি চেষ্টা করেন দাম সাধ্যের মাঝেই রাখতে, যেন সবাই চাইলেই কিনতে পারেন।
এক্সক্লুসিভ গহনার কথা যেহেতু বলাই হচ্ছে, তখন পরিচয় করিয়ে দেওয়া যাক ‘পার্ল প্যারাডাইজ বাই সাবরিনা’র সঙ্গে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা শেষ করে অন্য কোনো পেশা বা চাকরির কথা না ভেবে অনলাইনেই মুক্তার গহনার দোকান খুলেছেন। নানা বৈচিত্র্যের মুক্তার বাহারে সাজানো তার পেইজ। এখানে পাওয়া যাচ্ছে আসল মুক্তার তৈরি মালা, ব্রেসলেট। আরও আছে ন্যাচারাল স্টোন আর শেল দিয়ে বানানো গহনাও। মুক্তার গহনা বেশ দামিই বলা চলে। তবে সাবরিনা জানান, ‘আমি চাই আসল মুক্তার গহনা যেন একদম সাধ্যের বাইরে চলে না যায়। সবাইকে যতটা সম্ভব স্বল্পমূল্যে মুক্তার গহনা পৌঁছে দেওয়ায়ই আমার লক্ষ। ট্রেন্ড যতই বদলাক মুক্তার গহনার চাহিদা কখনোই কমে না। বিভিন্ন রঙের মুক্তা দিয়ে তৈরি গহনা এখনো সব বয়সী নারীর কাছে দারুণ জনপ্রিয়।’
গলায় যদি মালা নাও পরা হয়, কানে মুক্তার ছোট্ট এক জোড়া টপ অথবা হাতে একটা মুক্তার ব্রেসলেটও সাজে এনে দেয় ভিন্নতা। সাবরিনার পেইজের গ্রাহকরা বিভিন্ন বয়সের নারী। করপোরেট কর্মী, চিকিৎসক এসব পেশার নারীই তার নিয়মিত গ্রাহক। চিকিৎসা পেশায় খুব বেশি চাকচিক্য রাখা যায় না বলে ট্রেন্ডি মুক্তার মালাটাই তাদের পছন্দের শীর্ষে। তার পেইজে গহনা পাওয়া যাচ্ছে ১২০০ টাকা থেকে ৭০,০০০ টাকায়।
অনলাইন শপগুলোতে ইদানীং চাহিদা বাড়ছে বিখ্যাত চিত্রশিল্পীদের আঁকা ছবি, দেশ ও দেশের বাইরের নানা চিত্রশিল্পীদের মুখচ্ছবি দিয়ে হাতে আঁকা অথবা প্রিন্টেড গহনাগুলোর। মালা, আংটি, দুল, চুড়ি সবখানেই এখন হাতে আঁকা হচ্ছে বিখ্যাত সেই চিত্রকর্মগুলো। ভ্যান গগের স্ট্যারি নাইট, অ্যামন্ড ব্লসোম, তাস উইথ পপিস, স্টিল লাইফ এগুলো বিভিন্নভাবেই উঠে আসে গহনায়। বিখ্যাত চিত্রশিল্পীদের মাঝে সবার আগে গহনাতে আসে ভ্যান গগ, ফ্রিদা কাহলো, রাফায়েল, টাইটিয়ান, পাবলো পিকাসো, লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির নাম। যদি বাঙালি চিত্রশিল্পীর নাম বলতে হয় তবে চলে আসে পটুয়া শিল্পী যামিনী রায়ের কথা। তার আঁকা বিখ্যাত ছবিগুলো এখন অনেকের গহনা ক্যানভাসে শোভা পায়। কাঠের বেইজে রঙিন পুঁতি দিয়ে সাজিয়ে মালাগুলোতে নিয়ে আসা হয় নানা বৈচিত্র্য। সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে জার্মান সিলভার দিয়ে তৈরি মালাও। চিত্রশিল্পীদের নিয়ে বেশ অনেকদিন ধরেই কাজ করে যাচ্ছেন অনলাইন পেইজ ‘আরুণিকা’র কর্ণধার অরুণিতা। ফ্রিদা কাহলো, ভ্যান গগ থেকে শুরু করে আরুণিকার গহনায় জায়গা করে নিয়েছেন সত্যজিৎ রায়, ফেলুদা, শার্লক হোমস, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরসহ আরও অনেকে।
গহনার নিত্যবদল হওয়া ট্রেন্ড নিয়ে অরুণিতা বলেন, ‘আমাদের গহনার ম্যাটেরিয়াল মূলত কাঠ আর রং। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নতুন নতুন ম্যাটেরিয়াল- যেমন নিজেদের তৈরি করা কেমিক্যাল বেস, ক্লে, মাটি, সুতা, পাট এসব ব্যবহার করা হচ্ছে। আছে ফেল্ট ফেব্রিকও।’ ফেল্ট ফেব্রিক আমাদের দেশে এখনো খুব বেশি জনপ্রিয় বা পরিচিত নয়। এটা খুব হালকা কাপড়ের মতো নরম ফেব্রিক। তাতে রঙিন পুঁতি বসিয়েও এখন সুন্দর গহনা বানানো হচ্ছে। এই নতুন ট্রেন্ডটি গ্রাহকরা বেশ ভালোভাবেই গ্রহণ করছেন বলে জানালেন তিনি। ফেল্ট দিয়ে যে শুধু মালাই বানিয়েছেন তাই নয়। শুরুতে টিপ, এরপর দুল, আর এবারের পূজায় মালা। গহনার ভিন্নতায় আরও নান্দনিক জিনিস নিয়ে কাজ করার ইচ্ছা অরুণিতার।
যারা গহনায় একটু গর্জিয়াস লুক চান তাদের জন্য এই ধরনের হ্যান্ডপেইন্ট গহনা সব সময় কার্যকর নয়। তবু এই গহনাগুলোর গ্রাহকও বেশ। অরুণিতা জানালেন, ‘আরুণিকায় সব ধরনের গ্রাহকই আছেন। আমাদের প্রোডাক্ট ভ্যারাইটি কিন্তু অনেক বেশি। তাই গ্রাহকও নানারকম। শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী সবাই মোটামুটি আমাদের গ্রাহক তালিকায় আছেন। শুধু নিজেদের জন্যই না, বিদেশি বন্ধুবান্ধব, কলিগ, মা-বাবার জন্য উপহার হিসেবেও অনেকে নিয়মিত কেনাকাটা করেন আমার কাছ থেকে।’ আরুণিকার গহনাগুলোর দাম একদম কম। বলতে গেলে হাতের নাগালেই। সব বয়সী ক্রেতা আছে বলেই দামটাকে কখনোই ঊর্ধ্বমুখী হতে দেননি অরুণিতা। গহনার এই ভিন্ন চাহিদাই বলে এখন ট্রেন্ড এক জায়গায় সীমাবদ্ধ নেই। দিনে দিনে গহনায় আসছে নানা পরিবর্তন, যুক্ত হচ্ছে ভিন্ন ধারা। পুরনো দিনের ডিজাইনও আসছে ঘুরেফিরে। কাঠের গয়নার সঙ্গে এ বছর বেশ ভালো একটা ট্রেন্ড যাচ্ছে ফোম আর কাঠের তৈরি কাঠগোলাপ, শিউলিসহ বেশকিছু নান্দনিক ফুলের দিকে। দাম হাতের নাগালে হওয়ায় মেয়েরা এই ফুলের গহনাগুলো বেশ পছন্দ করছেন।
অনলাইনের অন্যতম জনপ্রিয় শপের নাম রঙবতী। দুই বান্ধবী ফাহমিয়া আর নাইমার নিজস্ব ডিজাইনে নকশা করা গহনা তৈরি হয় এখানে। গ্রাহকদের ভালো লাগার কথা ভাবনায় রেখে তারা সুযোগ রেখেছেন গহনা কাস্টমাইজড করার। যে কোনো ডিজাইন তাদের দিলে তারা সেটা বানিয়ে দেবেন নিজস্ব কারিগর দিয়ে। রঙবতীর অন্যতম কর্ণধার ফাহমিয়া ইব্রাহীম জানান, ‘তাদের গহনাগুলো মূলত ব্রাস মেটালে তৈরি। এই মেটালটি তৈরি হয় কপার আর জিংকের সংমিশ্রণে। ভিন্ন ধারার হয় বলে গহনার ক্রেতাও আছেন নিয়মিত। বর্তমানে বেশ ভালো একটা ট্রেন্ডের ধারা বজায় রেখে চলেছে রঙবতী। ২৫ বছর বয়সী তরুণী থেকে শুরু করে মধ্যবয়সী নারীরাও এই মেটালের গহনাগুলো বেশ পছন্দ করছেন।’
রঙবতীর গহনার মাঝে আছে নেকলেস, চোকার, কানের দুল, ব্রেসলেট, পায়েল, আংটি, নূপুর, বালা, খোঁপার কাঁটা ইত্যাদি।
এ তো গেলো অনলাইনে গহনার পালাবদলের গল্প। তাহলে দোকানে কেমন চলছে গহনার ট্রেন্ড?
ভারত, পাকিস্তান, চীন বা অন্য যেকোনো দেশ থেকে যতই গহনা আসুক না কেন বাঙালি নারীদের সব সময়ের পছন্দ নিজের দেশের গহনাই। আর এই পছন্দের তালিকায় শুরুতেই আছে আড়ং, কনক, পিরান, অঞ্জন’স, বিবিয়ানা, বিশ্ব রঙ, যাত্রা, দেশাল। দেশীয় এইসব ব্র্যান্ডের দোকানেই আপনি পাবেন ধাতু আর রঙিন সুতায় বানানো গলার মালা, কানের দুল, হাতের বালা, চুড়ি, খোঁপার কাঁটা, রুপার গহনা, পায়েল, জামদানিসহ বিভিন্ন মোটিফের গহনা, চামড়ার গহনা, মাটি, পিতলের তৈরি গহনা। দেশীয় ঐতিহ্য ধরে রেখে নিত্যনতুন গহনা নিয়ে এই ব্র্যান্ডগুলো কাজ করে যাচ্ছে সব সময়।
গহনার যত্ন
শখ করে যে গহনাটা কিনলেন নিশ্চয়ই চাইবেন না সেটি তার ঔজ্জ্বল্য হারিয়ে ফেলুক! তাই গহনারও যত্ন নিতে হবে নিয়ম করে।
w সোনা, রুপা বা মেটাল জাতীয় গহনার সঙ্গে জার্মান সিলভারের গহনা রাখবেন না। ভিন্ন ভিন্ন ধাতুর গহনা একসঙ্গে রাখলে তাদের মধ্যে বিক্রিয়া ঘটে গহনা উজ্জ্বলতা হারাতে পারে। বিভিন্ন গহনার জন্য আলাদা আলাদা বক্স রাখুন।
w বক্সে রাখার আগে টিস্যু দিয়ে গহনাগুলো ভালো করে মুড়িয়ে নেবেন।
w গহনা সংরক্ষণের জন্য ব্যবহার করুন এয়ারটাইট বক্স। বক্স যেন শুকনো থাকে সেদিকে লক্ষ রাখুন।