নির্যাতনের অভিযোগ জানাতে চালু করা ওয়েবপেইজ বন্ধ করে দেওয়ার পর গতকাল বৃহস্পতিবার নতুন একটি পেইজ খুলেছেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষার্থীরা। গত বুধবার বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) ২০১৬ সালে খোলা পেইজটি বন্ধ করে দেয়। এই সময়ে জমা পড়েছিল শিক্ষার্থীদের নির্যাতনসংশ্লিষ্ট ১৬৬টি অভিযোগ। নিরাপত্তা পরিস্থিতি বিবেচনায় এনে এটি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন বিটিআরসির চেয়ারম্যান মো. জহুরুল হক। এদিকে পেইজ বন্ধের ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন শিক্ষার্থীরা।
বুয়েটের একাধিক শিক্ষার্থী জানিয়েছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে ভিন্নমতের কারণে সাধারণ শিক্ষার্থীদের নির্যাতনের ঘটনা বহুদিনের। নির্যাতনের অভিযোগ জানাতে বুয়েটের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (সিএসই) বিভাগের কয়েক শিক্ষার্থী ২০১৬ সালে ওয়েবপেইজটি চালু করেন। এই সময়ে শিক্ষার্থীরা নির্যাতনসংশ্লিষ্ট ১৬৬টি অভিযোগ করেছেন। এসব অভিযোগের বিষয়ে জানানো হলেও তা বন্ধে প্রশাসন কার্যকর কোনো উদ্যোগ হয়নি। নাম প্রকাশ না করার শর্তে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের এক শিক্ষার্থী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কতটা নিচে নামতে পারলে এই কাজ করা সম্ভব চিন্তা করুন। শিক্ষার্থীদের জীবন-মরণের সঙ্গে রাষ্ট্র মজা করছে।’
গতকাল বুয়েট ক্যাম্পাসে দেশ রূপান্তরের সঙ্গে কথা হয় সিএসই বিভাগের কয়েক ছাত্রের। তারা কেউই নাম প্রকাশ করতে রাজি হননি। তাদের অভিযোগ, হলে ছাত্রলীগের নির্যাতনের ঘটনা ভয়াবহ। ভয়ে এসব বিষয়ে কেউ মুখ খোলেন না। এ বিষয়ে প্রভোস্টকে অভিযোগ জানিয়েও কাজ হয় না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রভোস্টকে জানালে উল্টো নির্যাতনের শিকার হতে হয়।
শিক্ষার্থীরা জানিয়েছেন, হলে থাকলে ছাত্রলীগের কর্মসূচিতে যাওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। কেউ অংশ না নিলে তার ওপর নেমে আসে নির্যাতনের খড়গ। শিক্ষার্থীরা যাতে নাম প্রকাশ না করে অভিযোগ জানাতে পারেন সেজন্য ওয়েবপেইজটি চালু করা হয়েছিল। বন্ধ হওয়ার আগে ১৬৬টি অভিযোগ সার্ভারে জমা পড়েছিল। এর মধ্যে বেশ কয়েকটি অভিযোগ জমা পড়ে গত রবিবার রাতে আবরার ফাহাদ হত্যার পর।
বিটিআরসি গত বুধবার এক চিঠিতে ইন্টারনেট গেটওয়ে (আইজিডব্লিউ) ও ইন্টারনেট সেবা প্রদানকারীদের (আইএসপি) ওয়েবপেজটি বন্ধের নির্দেশ দেয়। বিষয়টি জানাজানি হয় রাতের দিকে। জানতে চাইলে বিটিআরসির চেয়ারম্যান মো. জহুরুল হক বলেন, ‘নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও খারাপ করতে পারে, এই আশঙ্কা থেকে পেইজটি বন্ধ করা হয়েছে।’
পেইজটি দেখভালের দায়িত্বে থাকা সিএসই বিভাগের অধ্যাপক মোস্তফা আকবর বলেন, ‘আমাদের কাজ অভিযোগগুলো জমা দেওয়া। জমা পড়া অভিযোগগুলো দুই মাস আগে প্রিন্ট করে ছাত্রকল্যাণ পরিচালককে দেওয়া হয়। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় বা হল প্রশাসন দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।’ এ বিষয়ে জানতে চাইলে ছাত্রকল্যাণ পরিচালক মিজানুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, তিন মাস আগে তিনি এ দায়িত্ব পান। তার সময় তিনটি র্যাগিংয়ের অভিযোগ উঠলে হল পর্যায়ে অভিযুক্ত শিক্ষার্থীদের সর্বোচ্চ শাস্তি দেওয়া হয়েছে। অধিকতর তদন্তের জন্য বিষয়গুলো উপাচার্যের কাছে পাঠানো হয়েছে। কিন্তু এখনো কমিটি হয়নি।
বন্ধ হওয়া পেইজের অভিযোগগুলো ঘেঁটে দেখা যায়, র্যাগিং, ছাত্রলীগের মারধর, আবাসন ও ক্যান্টিন সমস্যা, শিক্ষকদের ক্লাসের উপস্থিতি ইত্যাদি বিষয়ে অভিযোগ করেছেন শিক্ষার্থীরা। আবরার হত্যার ঘটনায় অভিযুক্ত বুয়েট ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মেহেদি হাসান ওরফে রাসেলের বিরুদ্ধেও শিক্ষার্থীদের নিপীড়ন করার অভিযোগ রয়েছে। শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করেন, সরকার, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বা হলের কোনো বিষয়ে সমালোচনা করলে শিবির-সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ তোলা হয়। ছাত্রলীগের নির্যাতনের ভয়ে তারা স্বাধীনভাবে মতামত প্রকাশ করতে ভয় পান। র্যাগিংয়ের নামে শিক্ষার্থীদের মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন করা হয়।
পেইজে জমা হওয়া অভিযোগ থেকে জানা যায়, আবরার হত্যায় জড়িতরা সাধারণ ছাত্রদের নানাভাবে নির্যাতন করতেন। এ হত্যার পর গ্রেপ্তার বুয়েট ছাত্রলীগের সহসম্পাদক আশিকুল ইসলাম ওরফে বিটু, উপদপ্তর সম্পাদক মুজতবা রাফিদ, উপ-সমাজকল্যাণ সম্পাদক ইফতি মোশারফ ওরফে সকালের বিরুদ্ধেও একটি অভিযোগে করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, অভিযুক্তরা তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক প্রকৌশল বিভাগের একজন শিক্ষার্থীকে মারধর করে হল থেকে বের করে দেন এবং তার এক লাখ টাকা দামের একটি ল্যাপটপ রেখে দেন।
সেখানে একটি অভিযোগে বলা হয়, ২০১৮ সালের নভেম্বর মাসে এম এ রশিদ হলের ৪০৫ নম্বর কক্ষে একজন ছাত্রকে মারধর করেন বুয়েট ছাত্রলীগের কয়েক নেতা। মারধরের কারণে তার পায়ের রগ ছিঁড়ে যায়। এ ছাড়া ২০১৮ সালের আগস্টে নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের সময়েও বিভিন্ন হলে শিক্ষার্থীদের মারধর করা হয়।