বুয়েট ভিসির ওপর ক্ষুব্ধ প্রধানমন্ত্রীও

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ হত্যাকান্ডের পর সঙ্গে সঙ্গে ক্যাম্পাসে না যাওয়া এবং জানাজায় অংশ না নেওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য (ভিসি) অধ্যাপক সাইফুল ইসলামের ওপর ক্ষুব্ধ হয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বিস্ময় প্রকাশ করে বলেছেন, এ কেমন ভিসি? কেমন অভিভাবক? একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী দায়িত্বশীলদের খোঁজ নিতে বলেছেন, কেন একজন অভিভাবক হয়ে ছাত্রের খুনের ঘটনায় দুদিন ধরে ক্যাম্পাসে যাননি তিনি?

প্রধানমন্ত্রী আরও বলেছেন, এক দিনে তো এই ঘটনা ঘটেনি। এ রকম টর্চারের খবর নিশ্চয়ই বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে আগেও ছিল। ভিসি চাইলে সরকার উচ্চ পর্যায়ে এবং ক্যাম্পাসেই সবাইকে নিয়ে এই সমস্যার সমাধান করতে পারতেন। তার এ ব্যাপারে সতর্ক থাকা উচিত ছিল। তিনি কেমন অভিভাবক? আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের দুই নেতা এবং ভিসির ঘনিষ্ঠ একজন শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, আবরার হত্যার ঘটনার দিন সকালেই প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে ভিসির সঙ্গে যোগাযোগ করা হয় এবং হত্যার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর থাকার জন্য বলা হয়। প্রধানমন্ত্রী পুলিশের মহাপরিদর্শককে (আইজিপি) নিজে ফোন করে খুনিদের গ্রেপ্তার এবং বিশ^বিদ্যালয় প্রশাসনকে সর্বোচ্চ সহযোগিতার নির্দেশ দেন।

বুয়েটের একজন শিক্ষক জানান, এর আগে ভিসি স্যারকে সময়মতো কোনো কাজে পাওয়া যেত না। বিভিন্ন সময়ে র‌্যাগিং নিয়ে ছাত্ররা তার কাছে অভিযোগ করে এ রকম আচরণের শিকার হয়েছেন।

আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির একাধিক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, গত মঙ্গলবার আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় ও ছাত্রলীগ নেতাদের শেখ হাসিনা বলেন, আবরার হত্যার সঙ্গে জড়িতদের বিষয়ে কোনো ছাড় নয়। ছাত্রলীগ নেতাদের নির্দেশ দিয়ে তিনি বলেন, যাদের নাম এসেছে তাদের দল থেকে এখনই বহিষ্কার করতে হবে। ঘটনার দুদিন পরও ভিসির ক্যাম্পাসে না যাওয়া এবং আবরারের জানাজায় অংশ না নেওয়ার বিষয়টি অবহিত করলে শেখ হাসিনা ক্ষোভ প্রকাশ করে ভিসির সমালোচনা করেন। তিনি সিনিয়র নেতাদের বলেন, উনি কেন যাননি বিষয়টি জানা দরকার।

এ ছাড়া গত বুধবার আওয়ামী লীগের বিভিন্ন অঙ্গ-সংগঠনের সম্মেলন নিয়ে কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে সন্ধ্যায় গণভবনে অনুষ্ঠিত বৈঠকেও প্রধানমন্ত্রী ভিসির সমালোচনা করেন।

একজন সাংগঠনিক সম্পাদক বলেন, প্রধানমন্ত্রী ভিসিকে ফোন করে ঘটনার জন্য ছাত্রদের কাছে ক্ষমা চাইতে বলেছেন এবং প্রধানমন্ত্রীর ধমক খেয়েই বুধবার ভিসি কুষ্টিয়ায় আবরারের কবর জেয়ারত করতে গিয়েছেন।

এদিকে গতকাল শুক্রবার ক্ষমতাসীন দলের রাজনৈতিক জোট ১৪ দলের বৈঠক থেকেও বুয়েট ভিসির এই দুদিনের নীরবতা নিয়ে সমালোচনা করা হয়েছে। এ ব্যাপারে ১৪ দলের মুখপাত্র আওয়ামী লীগ নেতা নাসিম বলেন, বুয়েটের ভিসি তাৎক্ষণিকভাবে সেখানে গেলেন না কেন? এটা অত্যন্ত দুঃখজনক, একজন ভিসির কাছে এ ধরনের আচরণ আশা করি না। সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্যদের নিয়ে অস্থিরতার দিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, আমরা অত্যন্ত উদ্বিগ্ন হই, যখন দেখি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো প্রশ্নবিদ্ধ হয়। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কেন প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে? কী কারণে হচ্ছে? বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে একের পর এক ঘটনা ঘটছে, এ নিয়ে আমরা উদ্বিগ্ন।

জাসদের সভাপতি ও সাবেক তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু বলেন, তার একজন ছেলেকে নির্মমভাবে হত্যা করা হলো, অথচ তিনি দুদিনে ক্যাম্পাসে যাননি। এটা তো হতে পারে না। তাকে জবাবদিহি করতে হবে ওই সময় তিনি কী করছিলেন?  তিনি বলেন, ‘আমরা মনে করি এ বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি দেওয়া উচিত। সুযোগ্য ব্যক্তি, দায়িত্বশীল ব্যক্তি এবং যোগ্য ব্যক্তিকে এ ধরনের উচ্চ পদে বসানো উচিত।’

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালও গতকাল বলেছেন, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) প্রশাসন আরেকটু সতর্ক থাকলে হয়তো আবরার হত্যাকা-ের মতো ঘটনা নাও ঘটতে পারত। কেননা সেখানে প্রশাসনের অনুমতি ছাড়া পুলিশ  ঢুকতে পারে না। তিনি বলেন, কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে যাতে আবরার হত্যার মতো কোনো ঘটনা না ঘটে সেজন্য প্রশাসনকে সতর্ক হতে হবে। ভবিষ্যতে প্রশাসন ছাত্রদের প্রতি আরও নজর দেবে।

আবরার হত্যাকান্ডের পর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ‘দ্রুত ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থতার জন্য’ সমালোচনার মুখে থাকা উপাচার্য সাইফুল ইসলামের পদত্যাগ দাবি করেছে বুয়েট শিক্ষক সমিতিও।

গত ৬ অক্টোবর রাতে আবরারকে পিটিয়ে হত্যা করে বুয়েটের শেরেবাংলা হলের ছাত্রলীগ নেতারা। পরে এ ঘটনায় আবরারের বাবা ১৯ জনকে আসামি করে মামলা করেন।