সাবসিডিয়ারি কোম্পানি বিশেষ করে রিটেইল চেইন শপ ‘স্বপ্ন’র টানা লোকসানে মূল কোম্পানি এসিআই লিমিটেড অস্তিত্ব সংকটের ঝুঁকিতে রয়েছে বলে মনে করছে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (এসইসি)। এসিআইয়ের লোকসান নিয়ে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রতিবেদন পর্যালোচনায় কোম্পানিটিতে এমন সংকট দেখতে পেয়েছে এসইসি। কমিশন সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
তবে স্বপ্নসহ কয়েকটি সাবসিডিয়ারির টানা লোকসানের পরিপ্রেক্ষিতে এসিআইয়ের বিশেষ নিরীক্ষার যে প্রস্তাব ডিএসই দিয়েছে, তাতে একমত নয় এসইসি। এসিআইয়ের সাবসিডিয়ারিগুলোর লাভ লোকসানের হিসাব স্পষ্টভাবে থাকায় তা নিয়ে বিশেষ নিরীক্ষার প্রয়োজন নেই বলে মনে করছে এসইসি। এদিকে স্বপ্নসহ কয়েকটি সাবসিডিয়ারির বড় ধরনের লোকসান সত্ত্বেও এসিআইয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী কোম্পানি কর্তৃপক্ষ। স্বপ্নসহ কয়েকটি সাবসিডিয়ারির লোকসানের কারণে ২০১৮-১৯ হিসাব বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিক থেকে মূল কোম্পানি এসিআই লিমিটেড লোকসানে রয়েছে। কয়েকটি সাবসিডিয়ারি প্রতিষ্ঠানের ব্যাংকঋণ ও সুদ ব্যয়ের কারণে এমন লোকসানের মুখে পড়েছে এসিআই। এ কারণে কোম্পানিটির শেয়ারে বিনিয়োগ করে বড় অঙ্কের লোকসানে পড়েছেন শেয়ারহোল্ডাররা। চলতি হিসাব বছরের তৃতীয় প্রান্তিক পর্যন্ত এসিআই লিমিটেডের সমন্বিত দীর্ঘ ও স্বল্পমেয়াদি ঋণ রয়েছে মোট ৩ হাজার ৫২০ কোটি টাকা। এর মধ্যে সাবসিডিয়ারি প্রতিষ্ঠান এসিআই লজিস্টিকের অধীনস্ত রিটেইল চেইন শপ স্বপ্নতে সুদবাবদ ব্যয় সবচেয়ে বেশি। ২০০৮ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকেই এ প্রতিষ্ঠানটি টানা লোকসান দিয়ে আসছে। ২০১৮-১৯ হিসাব বছরের তৃতীয় প্রান্তিক পর্যন্ত স্বপ্নর পুঞ্জীভূত লোকসান হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে।
এসিআইয়ের লোকসানে স্বপ্নর প্রভাব রয়েছে জানিয়ে এসিআইয়ের প্রধান অর্থ কর্মকর্তা প্রদীপ কর দেশ রূপান্তরকে জানান, স্বপ্নকে সাপোর্ট দেওয়ার জন্য এসিআইয়ের ম্যানেজমেন্ট প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তারা আশা করছেন, স্বপ্নর এ সমস্যা থাকবে না। স্বপ্ন মূল লোকসান কিন্তু ব্যাংকঋণ ও এর সুদ বাবদ ব্যয়। বিদেশি ক্রেতারা স্বপ্নতে বিনিয়োগের আগ্রহ দেখাচ্ছেন, তবে কিছুই এখনো চূড়ান্ত হয়নি। স্বপ্ন ছাড়াও আরও কয়েকটি সাবসিডিয়ারি লোকসান প্রসঙ্গে প্রদীপ কর জানান, তথ্যপ্রযুক্তিসহ কিছু স্টার্টআপ টাইপের ব্যবসা রয়েছে, যেগুলো এখনো বিনিয়োগ পর্যায়ে রয়েছে। এছাড়া এসিআই হেলথকেয়ার নামে আরও একটি সাবসিডিয়ারি রয়েছে, যেখানে প্রায় হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠান বাণিজ্যিক কর্মকা- শুরু করলে সেখান থেকে রিটার্ন আসা শুরু করবে। এর বাইরে কয়েকটি সাবসিডিয়ারি রয়েছে, যেগুলো লোকসানে রয়েছে। আমরা চেষ্টা করছি লোকসান কমিয়ে আনতে।
ডিএসইর গত ৩১ আগস্টের হিসাবে এসিআইয়ে উদ্যোক্তা পরিচালকদের শেয়ার রয়েছে ৩৫ দশমিক ২৮ শতাংশ। আর প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের রয়েছে ৪১ দশমিক ৭৫ শতাংশ শেয়ার। প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আইসিবি ও ঢাকা ব্যাংক সিকিউরিটিজের উল্লেখযোগ্য শেয়ার রয়েছে। এসিআইয়ে বিনিয়োগ করে বড় ধরনের লোকসানে রয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা। গত দুই বছরে এ কোম্পানির শেয়ারের দর কমেছে ৬০ শতাংশ।
এ বিষয়ে এসিআই লিমিটেডের প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী ঢাকা ব্যাংক সিকিউরিটিজের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ আলী বলেন, কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদ শেয়ারহোল্ডারদের স্বার্থরক্ষায় ব্যর্থ হয়েছে। পাশাপাশি স্বপ্নর ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের অদক্ষতাও শেয়ারহোল্ডারদের ক্ষতি করছে।
পর্যালোচনায় দেখা যায়, এসিআইয়ের সাবসিডিয়ারিগুলো ১০টি খাতে বিভক্ত। এর মধ্যে পাঁচটি খাতে বড় অঙ্কের লোকসান গুনতে হচ্ছে। এর বাইরে নির্দিষ্ট করা নয়, এমন কয়েকটি ছোট খাতেও লোকসান দিতে হচ্ছে এসিআইকে। এছাড়া লাভজনক সাবসিডিয়ারি থেকেও মুনাফা কমতে দেখা গেছে। ফলে ধারাবাহিকভাবে পণ্য বিক্রি থেকে আয় বাড়লেও দীর্ঘ সময় ধরে সাবসিডিয়ারি কোম্পানিগুলোর লোকসান টানতে গিয়ে মূল কোম্পানির আর্থিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ছে। সাবসিডিয়ারির জন্য নেওয়া ব্যাংকঋণের ফাঁদে পড়ে চলতি হিসাব বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে ৩৭ কোটি ৫৩ লাখ টাকা নিট লোকসানে পড়েছে এসিআই। অথচ আগের বছরের একই সময়ে ৪০ কোটি টাকা নিট মুনাফায় ছিল। সাবসিডিয়ারি ও যৌথ উদ্যোগ মিলিয়ে মোট ১৮টি কোম্পানি রয়েছে এসিআই গ্রুপে।
২০১৮-১৯ হিসাব বছরের তৃতীয় প্রান্তিক পর্যন্ত পণ্য বিক্রি থেকে এসিআইয়ের আয় হয়েছে ৪ হাজার ৬২৭ কোটি টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৮ শতাংশ বেশি। বিপরীতে প্রশাসনিক, বিক্রি ও বাজারজাতকরণ ব্যয় বেড়েছে প্রায় সাড়ে ১০ শতাংশ। আর সুদ বাবদ ব্যয় হয়েছে ২২৬ কোটি টাকা, যা আগের বছরের প্রথম ৯ মাসের তুলনায় প্রায় ৪৭ শতাংশ বেশি। মূলত সুদ বাবদ ব্যয় বাড়ায় চলতি হিসাব বছরের ৯ মাসে নিট লোকসান দাঁড়িয়েছে ৩৭ কোটি ৬৩ লাখ টাকা, যার মধ্যে ৩৪ কোটি ৯৭ লাখ টাকা লোকসান হয়েছে তৃতীয় প্রান্তিকে (জানুয়ারি-মার্চ)।
এসিআইয়ের সাবসিডিয়ারিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি লোকসান দিচ্ছে রিটেইল চেইন শপ ‘স্বপ্ন’। এ কোম্পানিটি চলতি হিসাব বছরের ৯ মাসে ১১১ কোটি ৬৫ লাখ টাকার করপূর্ব লোকসান দিয়েছে। কনজ্যুমার ব্র্র্যান্ড খাতে এসিআইয়ের করপূর্ব লোকসান হচ্ছে ৪৯ কোটি টাকা। এছাড়া অ্যানিমেল হেলথ, খাদ্য ও প্লাস্টিক খাতে ৩৫ কোটি টাকার বেশি করপূর্ব লোকসান দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ওষুধ রপ্তানির উদ্দেশ্যে গঠিত এসিআই হেলথকেয়ার লিমিটেডও লোকসানে রয়েছে। এর বাইরে নির্দিষ্ট করা নয়, এমন কয়েকটি ছোট খাতে ১২ কোটি ৭৬ লাখ টাকা লোকসান দিয়েছে এসিআই। তবে ফার্মাসিউটিক্যালস, ক্রপ কেয়ার অ্যান্ড পাবলিক হেলথ, মোটরস, পিউর ফ্লাওয়ার ও লবণ খাতের ব্যবসায় মুনাফা অব্যাহত আছে।
২০১৮-১৯ হিসাব বছরের ৯ মাসে স্বপ্নকে সুদ বাবদ ৮৯ কোটি ৪২ লাখ টাকা ব্যয় করতে হয়েছে, যা পুরো গ্রুপের সুদ ব্যয়ের প্রায় ৪০ শতাংশ। আগের বছরের একই সময় স্বপ্নর সুদ বাবদ ব্যয় ছিল ৬৩ কোটি ৭১ লাখ টাকা। এসিআইয়ের মোট রেভিনিউর ১৫ দশমিক ৫ শতাংশ আসে স্বপ্ন থেকে।