বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) কর্র্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠানটিতে সকল রাজনৈতিক সংগঠনের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার যে ঘোষণা দিয়েছে, তার মধ্য দিয়ে ছাত্র ও শিক্ষকরাজনীতি নিয়ে নানা বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়েছে। একই সঙ্গে এই সিদ্ধান্ত সংবিধান প্রদত্ত গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক অধিকারসমূহের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে এ নিয়ে নানা গুরুতর প্রশ্নও উঠছে। ছাত্রাবাসে আবরার ফাহাদের নির্মম হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের এক পর্যায়ে শুক্রবার এই সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়টির উপাচার্য। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও ছাত্র সংগঠনের বর্তমান ও সাবেক নেতারা যেমন এই সিদ্ধান্তের সমালোচনা ও বিরোধিতা করছেন তেমনি নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরাও সিদ্ধান্তটি পুনর্বিবেচনার দাবি জানিয়েছেন। অন্যদিকে বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যেও বুয়েটে রাজনৈতিক সংগঠন বন্ধের ঘোষণা বা প্রকারান্তরে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধের বিষয়টি তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। এই পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্ববিদ্যলয় বা উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্র ও শিক্ষকরাজনীতি বিষয়ে বস্তুনিষ্ঠ মীমাংসা জরুরি হয়ে পড়েছে।
বুয়েটে আজ যে সংকট সৃষ্টি হয়েছে সেটাকে দেশের অন্যান্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের বিদ্যমান বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখার সুযোগ নেই। কয়েক দশক ধরেই বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে টর্চার সেল ও গেস্টরুম নির্যাতন এবং র্যাগিংয়ের মাধ্যমে ছাত্রছাত্রীদের ওপর ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের সমর্থক ছাত্র সংগঠনের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার চর্চা চলছে। এই সন্ত্রাসী তৎপরতা যেমন ছাত্ররাজনীতির নামে চলে আসছে, তেমনি শিক্ষক রাজনীতির নামে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনগুলো ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা ও দমননীতির বাহকে পরিণত হয়েছে। এই সংকট অগণতান্ত্রিকতার এবং শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের স্বাধীন মতপ্রকাশসহ সাংবিধানিক অধিকার হরণের। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নিয়মিত ছাত্র সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে এবং
যথাযথ প্রক্রিয়ায় সুষ্ঠুভাবে নির্বাচিত শিক্ষকরা প্রশাসন পরিচালনা করলে হয়তো এই সংকট আজ এতটা প্রকট আকার ধারণ করত না।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালিত হচ্ছে পাকিস্তান আমলে জারি হওয়া ১৯৬২ সালের অধ্যাদেশ অনুযায়ী। ওই অধ্যাদেশে সকল প্রকার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ রাজনৈতিক দলভিত্তিক শিক্ষকরাজনীতি নিষিদ্ধ। উল্লেখ্য, স্বাধীনতার পর অধ্যাদেশটিতে নামকরণের পরিবর্তন ছাড়া তেমন কোনো পরিবর্তন হয়নি। শিক্ষকদের রাজনীতি নিষিদ্ধের পাশাপাশি ওই অধ্যাদেশের ১৬ ধারায় স্পষ্টভাবে বলা আছেÑ ছাত্রসংসদ, হলসংসদ ছাড়া ছাত্রকল্যাণ পরিচালকের লিখিত অনুমোদন না নিয়ে কোনো ধরনের ছাত্রসংগঠন বিশ্ববিদ্যালয়ে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করবে না। এমনকি ক্যাম্পাসে সভা বা এ ধরনের কর্মকাণ্ড না করার কথাও বলা আছে তাতে। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়েও একাধিকবার বুয়েটে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু কার্যত সেখানে যেমন শিক্ষকরা বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তেমনি ছাত্র রাজনীতিও চালু ছিল। আজ তাই নতুন করে রাজনৈতিক সংগঠনের কার্যক্রম নিষিদ্ধের ঘোষণা দেওয়ার আগে এই উত্তর প্রয়োজন যে, তাহলে এতদিন ধরে ছাত্র সংগঠনগুলো কী করে সেখানে কাজ করছিল। এই প্রশ্নেরও উত্তর প্রয়োজন যে অধ্যাদেশে উল্লেখ থাকলেও সেখানে ছাত্র সংসদ নির্বাচন হচ্ছে না কেন?
এটা স্পষ্ট যে, বুয়েটে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধের যে ঘোষণা এখন এলো তা বিদ্যমান সংকটের কারণগুলো সমাধানের চেষ্টা না করে উল্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী-শিক্ষক তথা প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকের সংবিধান প্রদত্ত মৌলিক রাজনৈতিক অধিকার হরণের দৃষ্টান্ত স্থাপন করছে। বুয়েট বা যেকোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনৈতিক সংগঠনের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা সংবিধানের
তৃতীয় ভাগে বর্ণিত মৌলিক অধিকারসমূহের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। সংবিধানের ৩৭ অনুচ্ছেদে ‘শান্তিপূর্ণ ও নিরস্ত্র অবস্থায় সমবেত হইবার এবং জনসভা ও শোভাযাত্রায় যোগদানের অধিকার’ নিশ্চিত করা হয়েছে। ৩৮ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে ‘সমিতি বা সঙ্ঘ গঠন করিবার অধিকার প্রত্যেক নাগরিকের থাকিবে’ এবং ৩৯ অনুচ্ছেদে ‘চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা এবং বাকস্বাধীনতার নিশ্চয়তা দান’ করা হয়েছে। ফলে এখন এই প্রশ্ন উঠছে যে, একটি বিশ্ববিদ্যালয় সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক এমন সিদ্ধান্ত নিতে পারে কি না?
বিশ্ববিদ্যালয়ে সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, মাস্তানি, র্যাগিং, নিপীড়ন, নির্যাতন সর্বোপরি ছাত্র হত্যার মতো অপরাধকে কেবলই ছাত্ররাজনীতির সংকট হিসেবে তুলে ধরা যেমন একদেশদর্শী, তেমনি অপরিণামদর্শী। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনীতি করার অধিকার থাকা সত্ত্বেও শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের স্বাধীন মতপ্রকাশের ওপর নানারকম বাধা ও বলপ্রয়োগের অনেক দৃষ্টান্ত সম্প্রতি দেখা যাচ্ছে। সেখানে রাজনীতি নিষিদ্ধ করা হলে শিক্ষার্থী-শিক্ষকরা জাতীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় এবং রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক-মতাদর্শিক বিষয়ে কতটা স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশ করতে পারবেন বা সভা-সমাবেশ করতে বা সংগঠিত হতে পারবেন তা সহজেই অনুমেয়। অনেকে মনে করেন, এভাবে প্রকাশ্য রাজনৈতিক সংগঠনের তৎপরতা নিষিদ্ধের মধ্য দিয়ে গোপন রাজনৈতিক তৎপরতা এবং উগ্রবাদী সংগঠনগুলোর তৎপরতার পথকে উৎসাহিত করা হয়। এ অবস্থায় বুয়েটে রাজনৈতিক সংগঠনের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্তটি অবশ্যই পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে বুয়েটসহ দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়মিত ছাত্র সংসদ নির্বাচন আয়োজন করাসহ নিয়মতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংগঠনসমূহের গণতান্ত্রিক সহাবস্থান নিশ্চিত করা জরুরি। নইলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কেবল শিক্ষার্থী-শিক্ষকদের কণ্ঠই স্তব্ধ হবে না বিশ্ববিদ্যালয়গুলো মতপ্রকাশ ও জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র হিসেবেও অগুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়।