অগ্রিম ঘুষ না পেয়ে ক্রসফায়ারের হুমকি বন কর্মকর্তার

ঘুষের অর্থ অগ্রিম না দেওয়ায় সুন্দরবনের নীলকমল অভয়ারণ্যের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শ্যামা প্রসাদ রায় এবং তার অধীনস্থ বন বিভাগের কর্মচারীদের বিরুদ্ধে স্থানীয় মৎস্যজীবী ও জেলেদের বনদস্যুদের মতো ‘ক্রসফায়ারে’ হত্যার হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। গতকাল শনিবার দুপুরে খুলনা প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে এই অভিযোগ করেন ওই এলাকার মৎস্যজীবী ও জেলেরা। জেলেরা বলছেন, ওসি শ্যামা প্রসাদ রায় মোটা অঙ্কের টাকা ঘুষের চুক্তিতে তাদের নীলকমল অভয়ারণ্য এলাকায় নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে ইলিশ আহরণের সুযোগ করে দেন। কিন্তু সম্প্রতি সরকারি নিষেধাজ্ঞা অনুযায়ী তারা ইলিশ শিকার বন্ধ রাখলেও ওসি মাসিক চুক্তির টাকা অগ্রিম দাবি করেন। আর তা না দেওয়ায় ক্ষিপ্ত হয়ে জেলেদের ওপর হামলাসহ নানাভাবে হয়রানি করছেন শ্যামা প্রসাদ।      

সংবাদ সম্মেলনে ফুলতলা উপজেলার দামোদর গ্রামের মৎস্যজীবী সুপ্তি এন্টারপ্রাইজের মালিক বাচ্চু আলী বেগ লিখিত বক্তব্যে বলেন, ‘গত জুন মাসে ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শ্যামা প্রসাদ রায় চুক্তির মাধ্যমে আমাদের নীলকমল অভয়ারণ্যে নিয়ে যান। তিনি মাসে আড়াই লাখ টাকা চুক্তিতে আমাদের ইলিশ আহরণের জন্য পাস দিতে সম্মত হন। আমরা তিন মাসের চুক্তির সাড়ে ৭ লাখ টাকা পরিশোধও করি। কিন্তু ইতিমধ্যে মাছ ধরা বন্ধ হওয়ায় গত ৭ অক্টোবর আমরা সাগর থেকে উঠে আসার জন্য প্রস্তুতি নিই। এ সময় তিনি

(ওসি) তার কর্মচারীদের সঙ্গে নিয়ে আমাদের কাছে এসে মাসিক চুক্তির টাকা অগ্রিম দাবি করেন। আমরা তাকে টাকা দিতে অস্বীকার করলে তিনি ফাঁকা ফায়ার করে আতঙ্ক সৃষ্টি এবং জেলেদের বেদম প্রহার করেন। এতে অনেক জেলে মারাত্মক আহত হন। যার মধ্যে হান্নান গাজী নামের একজন জেলে হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন।’

বনরক্ষীদের নির্মমতা সেখানেই শেষ হয়নি জানিয়ে বাচ্চু আলী বেগ আরও বলেন, ‘নীলকমলের ওই ওসি এবং কর্মচারীরা দ্রুতগতিসম্পন্ন ট্রলার নিয়ে সাগরে টহলে গিয়ে জেলেদের মাছ ধরা ট্রলার তাড়া করেন। পাখি শিকারের মতো এলোপাতাড়ি গুলি করতে থাকেন। জেলেদের পাস পারমিট ট্রলার আটক করে জোর করে নীলকমলে নিয়ে আসেন। সিওআর করার নামে প্রতি ট্রলার থেকে কমপক্ষে এক লাখ টাকা করে আদায় করেন সরকারি রসিদ ছাড়াই। সরকারি রাজস্ব রসিদ চাইলে ওসি জেলেদের পিটিয়ে পিঠের চামড়া তুলে ফেলার হুমকি দেন। এছাড়া এসিএফ এবং ডিএফও’দের দেওয়ার নামে ৩২টি ট্রলারের প্রতিটি থেকে ১০পিস করে অন্তত লাখ টাকা মূল্যের ৩২০ পিস ইলিশ জোর করে নিয়ে নেন।’

লিখিত বক্তব্যে আরও অভিযোগ করা হয়, নীলকমলের হাতিমঘানি, কলাতলা, সেচখালি ও বালির গাং এলাকায় শত শত জেলে প্রতি গোনে মাছ/কাঁকড়া ধরে চুক্তির মাধ্যমে। এই জেলেদের কাছ থেকে বহদ্দার শংকর (ডুমুরিয়া), আশরাফুল (গড়ইখালী) ও মালেক গণির (গোবরা) মাধ্যমে বনরক্ষীরা যাবতীয় বাজার খরচ এবং মাসিক তিন লাখ টাকা ঘুষ নিয়ে থাকে।

এর আগে ২০১৮ সালে কালাবগি স্টেশনে কর্মরত থাকাকালে বন কর্মকর্তা শ্যামা প্রসাদ রায়ের বিরুদ্ধে দাকোপ থানায় চাঁদাবাজির মামলা হয়েছিল বলেও সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করা হয়।

এদিকে সংবাদ সম্মেলন চলাকালে ওসি শ্যামা প্রসাদ রায় নিজের অপরাধ স্বীকার করে মৎস্যজীবী বাচ্চু আলী বেগের মোবাইল ফোনে কল করে সংবাদ সম্মেলন না করতে বারবার অনুরোধ করতে থাকেন। যা সেখানে উপস্থিত সব সাংবাদিক শুনেছেন।

সংবাদ সম্মেলনে অন্যদের মধ্যে খুলনা জেলা মৎস্যজীবী সমিতির সভাপতি বিকাশ চন্দ্র বিশ্বাস এবং মৎস্যজীবী মো. আলী হায়দার ও মো. আসলাম হোসেন উপস্থিত ছিলেন।

সংবাদ সম্মেলন শেষে তার বিরুদ্ধে করা অভিযোগের ব্যাপারে জানতে ওসি শ্যামা প্রসাদ রায়ের মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি ধরেননি।

তবে সুন্দরবন বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) বসিরুল আল মামুন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘জেলে ও মৎস্যজীবীদের অভিযোগের কথা আমি শুনেছি। অবিলম্বে তদন্ত করে ওসি শ্যামা প্রসাদ রায়সহ অভিযুক্ত সব কর্মচারীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’