ইউকসু নির্বাচনের দাবি বুয়েটিয়ানদের

সৎ, মেধাবী ও দেশপ্রেমিক নেতৃত্ব তৈরির উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বছরই গঠিত হয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ বা ইউকসু। ১৯৬২ সালে বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে যাত্রা শুরুর পর ৫৭ বছরের ইতিহাসে সেখানে এ পর্যন্ত ইউকসুর ২১টি কমিটি গঠিত  হয়েছে। ২০০১ সালে হয় সর্বশেষ কমিটি। এরপর দীর্ঘ ১৮ বছর ধরে কার্যকর নেই এই ছাত্র সংসদ। নেই এ বিষয়ে কোনো উদ্যোগও। তবে ছাত্রলীগ নেতাদের মারধরে আবরার ফাহাদের মৃত্যুতে সেখানে সংগঠনভিত্তিক রাজনীতি বন্ধের পরে নতুন করে আলোচনায় এসেছে ইউকসু। দাবি উঠেছে শিক্ষার্থীদের স্বার্থেই অবিলম্বে ছাত্র সংসদটি

কার্যকর করতে হবে। বর্তমান শিক্ষার্থীরা চাইলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনও বিষয়টি ভেবে দেখবে বলে জানিয়েছে।

বুয়েটের ছাত্র কল্যাণ উপদেষ্টা (ডিএসডব্লিউ) মিজানুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আপাতত ইউকসু নিয়ে আমাদের কোনো চিন্তাভাবনা না থাকলেও শিক্ষার্থীরা দাবি জানালে বিষয়টি ভেবে দেখবে প্রশাসন।’ 

বিষয়টি নিয়ে বুয়েট অ্যালামনাইয়ের সভাপতি অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে জানান, জাতীয় রাজনৈতিক দলগুলোর অঙ্গসংগঠন হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো কার্যক্রম চালাতে পারবে না, এমন দাবি জানিয়েছিলেন তারা। আবার ছাত্ররা যেন যেকোনো ইস্যুতে সংগঠিত থাকতে পারে সেটিও তাদের চাওয়া। এই অবস্থায় তার ভাষ্য, অবশ্যই ইউকসু নির্বাচন দিতে হবে এবং বুয়েট ক্যাম্পাসে তার কার্যক্রমও থাকতে হবে।

তবে এজন্য কিছুটা সময়ের প্রয়োজন বলেও উল্লেখ করেন তিনি। তিনি বলেন, ‘এর আগে বিভিন্ন সময়ে ইউকসু থেকে বিভিন্ন লোক নির্বাচিত হয়েছেন। তারা বুয়েট প্রশাসন পরিচালনার ক্ষেত্রে সহযোগিতা করেছেন। তবে বিরাট একটা হত্যাকাণ্ড হলো তাই কিছুটা সময়ের প্রয়োজন।’

বর্তমান শিক্ষার্থীদের লিখিত দাবির মধ্যে ইউকসুর বিষয়টি না থাকলেও তাদের অনেকেই এই প্রতিবেদকের কাছে নাম প্রকাশ না করার শর্তে ইউকসুর নির্বাচনের পক্ষে মত দিয়েছেন। তাদের একজন বলেন, অধিকার আদায়ের জন্যই আমাদের এমন কিছু দরকার। প্রশাসন যেন হুট করেই শিক্ষার্থীদের স্বার্থবিরোধী কোনো সিদ্ধান্ত নিতে না পারে সেজন্যই ইউকসু গুরুত্বপূর্ণ। 

ইউকসুর একাধিক সাবেক নেতা ও বুয়েটের সাবেক শিক্ষার্থী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ছাত্র সংসদ থাকলে অ্যাকাডেমিক কাউন্সিলসহ বিভিন্ন সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী পরিষদে শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিত্ব থাকে। তখন শিক্ষার্থীদের অনেক দাবি মানতে প্রশাসন বাধ্য হয়। যেহেতু এখন রাজনীতিশূন্য তাই সাধারণ ছাত্রদের দাবিদাওয়া আদায়ের জন্য ইউকসুর প্রয়োজনীয়তা অনেক। রাজনীতি বন্ধ কোনো সমাধান হতে পারে না। প্রয়োজনে সাদা, হলুদ প্যানেল করে ইউকসু নির্বাচন দেওয়ার দাবি জানান তারা। 

স্বাধীনতার পর ১৯৭২-৭৩ সালে ইউকসুর সাবেক নির্বাচিত জিএস আকরামুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ইউকসু নির্বাচন দরকার। তবে সেটি দলীয়ভাবে না হয়ে স্বতন্ত্রভাবে হতে পারে। দলীয়ভাবে হলে এই ইউকসু শিক্ষার্থীদের কাজে আসবে না।’ 

১৯৭৪ সালে জাসদ ছাত্রলীগ থেকে নির্বাচিত জিএস ইঞ্জিনিয়ার মুনীর উদ্দীন আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এই মুহূর্তে ইউকসুর প্রয়োজনীয়তা অনেক। যতদিন ইউকসু সচল ছিল ততদিন এরকম কিছু হয়নি।’ রাজনীতি বন্ধের সিদ্ধান্তের সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করে তিনি বলেন, ‘সরাসরি ইলেকশনের মাধ্যমে ইউকসু নেতা নির্বাচিত হলে বুয়েটের জন্য ভালো হবে।’

বুয়েটের বস্তু ও ধাতব প্রকৌশল বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী পৃথু পিয়াস ধর দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সাধারণ ছাত্রদের স্বার্থ নিয়ে দাবিদাওয়া উঠলে সে বিষয়গুলোতে প্রতিনিধিত্ব করার জন্য প্ল্যাটফর্ম দরকার।’ ছাত্রদের প্রয়োজনেই ইউকসু দরকার বলে মনে করেন তিনি। তিনি বলেন, ‘বিভিন্ন সময়ে নানা কারণে ইউকসু বন্ধ হয়ে গেলেও এখন সচল হওয়া দরকার।’

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ইন্ডাস্ট্রিয়াল প্রোডাকশন এবং নগর অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগ দুটির দুই সাবেক শিক্ষার্থী বলেন, ‘ক্যাম্পাসে এখন কেউই ইউকসু নিয়ে আলোচনা করছে না। তবে আমরা চাইছিলাম ইউকসু হোক। ছাত্রদের দাবি নিয়েই তো ইউকসু কাজ করে। তাই ছাত্রদের প্রয়োজনেই ইউকসু এখন সময়ের দাবি।’

ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ থেকে পূর্ণাঙ্গ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে বুয়েটের যাত্রা শুরু ১৯৬২ সালে। তখন এর নাম দেওয়া হয় পূর্ব পাকিস্তান প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রকল্যাণ পরিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ১৯৬২-৬৩ সালে প্রথম ছাত্র সংসদের কমিটি গঠিত হয়। সে কমিটিতে সভাপতি ছিলেন ফজলে হোসেন এবং সাধারণ সম্পাদক ছিলেন মো. আনিস। এরপর ১৯৬৪-৬৫ সালের কমিটি থেকে সভাপতির বদলে সহসভাপতি (ভিপি) পদ চালু হয়। এভাবে ১৯৭২-৭৩ সাল পর্যন্ত বিরতিহীনভাবে ছাত্র সংসদের ১১ কমিটি গঠিত হয়েছিল। মাঝে স্বাধীনতার পর প্রতিষ্ঠানটির নাম পরিবর্তন করে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) রাখা হলেও ছাত্র সংসদ থাকে আগের নামেই। এরপর বিভিন্ন সময়ে নির্বাচনের মাধ্যমে আরও ১০টি কমিটি হয়। ২০০১ সালে ইউকসুর সর্বশেষ কমিটি নির্বাচিত হয়। এ কমিটির ভিপি নির্বাচিত হয়েছিলেন গোলাম মোর্শেদ লায়ন ও জিএস হাসিব মোস্তাবসির।