কাতারের বিপক্ষে ১০ অক্টোবর ম্যাচের আগের দিন সংবাদ সম্মেলনে এক সংবাদকর্মী মজা করেই বলছিলেন, ‘বাংলাদেশ হচ্ছে প্রিভিউ’র দল। ম্যাচের আগের দিন দল নিয়ে রাশি রাশি ইতিবাচক সংবাদ প্রকাশিত হবে। আর পরের দিন ম্যাচ রিপোর্ট জুড়ে থাকবে হতাশা আর বাজে খেলার সমালোচনা।’
ফুটবলে বাংলাদেশের গত কয়েক বছরের ইতিহাস ঘাঁটলে কথাগুলোর সত্যতা মিলবে। তবে কাতারের বিপক্ষে ২-০ তে হেরে যাওয়া ম্যাচের বাংলাদেশ নিয়ে বলতে গেলে কিন্তু নড়েচড়ে বসতেই হচ্ছে। ম্যাচ না জিতলেও চোখে আরাম দেওয়া ফুটবলে বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামের হাজার বিশেক দর্শকের হৃদয় কিন্তু ঠিকই জিতে নিয়েছিল বাংলাদেশ। এশিয়ার বর্তমান চ্যাম্পিয়নদের বিপক্ষে ম্যাচটা যদি বাংলাদেশ জিতেও যেত অবাক হওয়ার কিছু থাকত না। সেই ম্যাচটাই আজ বাংলাদেশকে দিচ্ছে ভালো খেলার অনুপ্রেরণা। সেটা পুঁজি করে কলকাতার সল্ট লেক স্টেডিয়ামে আজ রাত ৮টায় (বাংলাদেশ সময়) ভারতের মুখোমুখি হবে জামাল ভুঁইয়ারা। উপমহাদেশের ফুটবলে ভারত সেরার আসনটি নিজের করে নিয়েছে বহুদিন। সাফের গণ্ডি ছাড়িয়ে এখন দেশটি ফুটবলে নিজে চাইছে অন্য উচ্চতায় উঠতে। কাঁড়ি কাঁড়ি অর্থলগ্নি করে মানে-গুণে তারা এগিয়েছে বেশ। এর মধ্যেই প্রাথমিক লক্ষ্য পূরণ করেছে এশিয়ান কাপে খেলার মধ্য দিয়ে। তারপরও প্রতিপক্ষ যখন বাংলাদেশ তখন একটা অস্বস্তি কাজ করেই তাদের মধ্যে। অন্তত শেষ দু’টি লড়াইয়ে ভারতকে খানিকটা দিকভ্রান্তই ঠেকেছে। ২০১৩ কাঠমান্ডু সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে গ্রুপপর্বে বাংলাদেশ যখন জয়ের সুবাস পাচ্ছে, ঠিক তখনই ভারতের রক্ষাকর্তা হয়ে আবির্ভূত হন সুনিল ছেত্রি। যোগ করা সময়ে তার ফ্রি-কিকে ম্যাচটা ১-১-এ শেষ হয়। পরের বছর গোয়ায় ফিফা প্রীতি ম্যাচেও ঠিক একইভাবে সেই যোগ করা সময়ের গোলেই বাংলাদেশকে জয় বঞ্চিত করেছিলেন ছেত্রি। ২০০৯ সালের পর তিন বার সাফ শিরোপা জিতলেও বাংলাদেশ তাদের কাছে অজেয়ই থেকে গেছে। আজও যদি রেকর্ডটা অব্যাহত থাকে, সেটা যত না আঘাত হয়ে দেখা দেবে ভারতের জন্য, ততটাই আশীর্বাদ হয়ে আসবে বাংলাদেশের কাছে। কারণ আজ জামালদের কেবল ছেত্রিদের মোকাবিলা করলেই চলছে না, বড় এক পরীক্ষা দিতে হবে সল্ট লেকের ৬০ হাজার ভারত সমর্থকের কাছেও। যদিও কাতারকে ভয় ধরিয়ে দেওয়া এই বাংলাদেশ নিজেদের নির্ভীক দাবি করে চাইছে ভারতের মাটিতে জয়মাল্য পরতে। আগের ২৬ বারের দেখায় ভারতকে মাত্র তিনবার হারিয়েছিল বাংলাদেশ। ২০০৩ সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে সেমিফাইনালে সাডেন ডেথের সেই জয়ের পর আর জিততে পারেনি তারা। বদলে যাওয়া এই বাংলাদেশ জয়খরাটা কাটাতে চায় আজ। ৬০ হাজার ভারত সমর্থকের বিপক্ষে তারা চাইছে ফুটবলটাকে উপভোগ করতে। দলের ৩৯ বছর বয়সী কোচ জেমি ডে’র কথায়, ‘আমি যদি খেলোয়াড় হতাম, তখন আমি চাইতাম এই বিষয়টাকে উপভোগ করতে। এত দর্শকের সামনে খেলাটা বড় এক অভিজ্ঞতা। আশা করব ছেলেরা শঙ্কিত না হয়ে ম্যাচটা উপভোগ করবে। চাইব ছেলেরা ভালো খেলুক, যেমনটা তারা শেষ ম্যাচে খেলেছে।’ জেমি এটাকে বড় একটা সুযোগ হিসেবেও দেখছেন শিষ্যদের জন্য, ‘নিজেদের প্রমাণের এটা হতে পারে বড় একটা মঞ্চ। তারা নিশ্চয়ই আত্মবিশ্বাস ধরে রেখে নিজেদের সেরাটাই দিতে চাইবে।’
কাতারের বিপক্ষে ৪-২-৪-২ ফরমেশনে খেলিয়ে সফল হয়েছিলেন জেমি ডে। কাউন্টার অ্যাটাকে বেশ কিছু সুযোগ তৈরি করে কাতারের রক্ষণে ফাটল ধরিয়েছে বাংলাদেশের ফরোয়ার্ডরা। ভারতের বিপক্ষেও একই কৌশলে খেলার ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি, ‘আমাদের রক্ষণ নিরেট রেখেই খেলতে হবে। কারণ ভারতের আক্রমণভাগ অনেক শক্তিশালী। তারা নিজেদের মাঠের সুফল নিয়ে চাইবে আমাদের আক্রমণে ব্যস্ত রাখতে। তাই কোনো সুযোগ তাদের দেওয়া যাবে না। আর নিজেদের পাওয়া সুযোগগুলো কাজে লাগাতে হবে, যেটা কাতারের বিপক্ষে আমরা কাজে লাগাতে পারিনি।’ বাংলাদেশ কোচ একটা হুঁশিয়ারিও দিয়ে রাখলেন প্রতিপক্ষ দলকে, ‘কাতারের বিপক্ষে আজ যেভাবে খেলেছি, সেটা খেলতে পারলে এটা বলতে পারি আমাদের হারাতে হলে ভারতকে অবশ্যই আমাদের চেয়েও ভালো ফুটবল খেলতে হবে। নয়তো এই ম্যাচে যে কোনো কিছুই ঘটতে পারে। আমরা যদি সুযোগ পূর্ণ ব্যবহার করতে পারি, ম্যাচের ফল আমাদের দিকেও আসতে পারে। তবে তার জন্য আমাদের সেরাটাই দিতে হবে।’
বাংলাদেশ অধিনায়ক জামাল ভুঁইয়া নিজেদের চাপমুক্ত দাবি করে উল্টো ভারতের দিকেই চাপটা ঠেলে দিতে চাইলেন, ‘এই ম্যাচটির জন্য দু’দলের ফুটবলাররাই নিশ্চয় মুখিয়ে আছে। অনেক দর্শকের সামনে খেলা বলে আমাদের ওপর কোনো চাপ নেই। উল্টো ভারতেরই বেশি চাপ থাকবে ভালো ফুটবল খেলার, ম্যাচটা জেতার। সেটাই হয়তো তাদের জন্য বড় বাধা হয়ে দেখা দিতে পারে। আমি আমার সতীর্থদের শুধু একটা কথাই বলব, ম্যাচটা উপভোগ করো। নিজেদের সেরাটা দিতে শক্তিশালী ভারতের বিপক্ষে তিন পয়েন্ট অর্জন করো।’
সংবাদ সম্মেলনের শেষভাগে জামাল এই ম্যাচের মাহাত্ম্যটা বোঝাতে চেয়েছেন এভাবে, ‘আমরা যদি কাল (আজ) ম্যাচটা জিতি তবে এটা বাংলাদেশের ফুটবলকে বদলে দেবে। তাই ফুটবলকে এগিয়ে নেওয়ার একটা বড় সুযোগ।’ জামালরা নিশ্চয় সেরাটা দিয়েই এই সুযোগটা কাজে লাগাতে চাইবেন।