মানবতাবিরোধী অপরাধ

বাবা-ছেলেসহ গাইবান্ধার ৫ জনের মৃত্যুদণ্ড

একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় গাইবান্ধায় গণহত্যা, হত্যা, নির্যাতনসহ বিভিন্ন মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় গাইবান্ধার পাঁচ যুদ্ধাপরাধীকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের রায় দিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। বিচারিক কার্যক্রম শেষে গতকাল মঙ্গলবার এ মামলার রায় ঘোষণা করেন বিচারপতি মো. শাহীনুর ইসলামের সমন্বয়ে গঠিত তিন বিচারপতির এই আদালত। ট্রাইব্যুনালের অন্য দুই সদস্য হলেন বিচারপতি মো. আমির হোসেন ও বিচারপতি মো. আবু আহমেদ জমাদার।

দণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন আবদুল জব্বার মণ্ডল, তার দুই ছেলে জাছিজার রহমান খোকা ও মো. আবদুল ওয়াহেদ মণ্ডল, রঞ্জু মিয়া ও মো. মনতাজ আলী বেপারি ওরফে মমতাজ। আসামিদের মধ্যে রঞ্জু মিয়া কারাগারে। বাকি চার আসামি এখনো পলাতক। গতকাল রায় ঘোষণার আগে সকালে রঞ্জুকে কারাগার থেকে ট্রাইব্যুনালের কাঠগড়ায় হাজির করা হয়। আইন অনুযায়ী দণ্ডপ্রাপ্তরা এক মাসের মধ্যে এ রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে আপিল করতে পারবেন। তবে কারাগারে থাকা রঞ্জু মিয়া এ সুযোগ পেলেও পলাতকরা যেদিন গ্রেপ্তার হবেন কিংবা আত্মসমর্পণ করবেন তখনই তারা আপিল করতে পারবেন।

মামলার নথিপত্র অনুযায়ী, আসামিরা সবাই গাইবান্ধা সদরের নান্দিনা ও চকগয়েশপুর এলাকার বাসিন্দা। মুক্তিযুদ্ধের সময় তারা জামায়াতে ইসলামীর সক্রিয় সদস্য ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তারা সবাই স্থানীয় রাজাকার বাহিনীতে নাম লেখান এবং এলাকায় হত্যা, গণহত্যা, স্বাধীনতাকামী মানুষের ওপর নির্যাতন, হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষদের ধর্মান্তরিতকরণ ও দেশ ত্যাগে বাধ্য করার মতো মানবতাবিরোধী অপরাধ করেন। এ ধরনের অপরাধের চারটি অভিযোগ আনা হয় পাঁচ আসামির বিরুদ্ধে। অভিযোগের সব সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে বলে ১৭৬ পৃষ্ঠার রায়ে বলা হয়।

একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের জন্য ২০১০ সালের মার্চে গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে এ নিয়ে ৪০টি মামলার রায় ঘোষিত হলো। এসব রায়ে মোট ৯৪ জনের সাজা হয়েছে। এর মধ্যে মৃত্যুদণ্ডের রায় হয়েছে ৬৭ আসামির বিরুদ্ধে।

গাইবান্ধায় মানবতাবিরোধী অপরাধের এ মামলায় মোট ছয় আসামি থাকলেও তদন্ত চলাকালে আজগর আলী খান নামে এক আসামি মারা যান। গত বছর ১৭ মে আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে এ মামলার বিচারকাজ শুরু হয়। সাক্ষ্যগ্রহণ ও উভয়পক্ষের আইনজীবীদের যুক্তি-তর্কের শুনানি নিয়ে গত ২১ জুলাই মামলার রায় যেকোনো দিন ঘোষণা করা হবে মর্মে তা অপেক্ষমাণ রাখে ট্রাইব্যুনাল। আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে শুনানিতে ছিলেন প্রসিকিউটর মোখলেসুর রহমান বাদল। কারাগারে থাকা আসামি রঞ্জু ও পলাতকদের পক্ষে শুনানিতে ছিলেন রাষ্ট্র নিযুক্ত আইনজীবী মোহাম্মদ আবুল হাসান।

প্রসিকিউটর মোখলেসুর রহমান বাদল রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের সময় আসামিরা ওই এলাকায় হানাদার বাহিনীর সহযোগিতায় নিষ্ঠুরভাবে মানুষকে হত্যা করেছে। ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ও ভুক্তভোগীদের সাক্ষ্যে বিষয়টি উঠে এসেছে। আমরা সন্দেহের ঊর্ধ্বে উঠে অভিযোগ প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছি বলেই আদালত প্রত্যেককে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে।’

আসামিপক্ষের আইনজীবী মোহাম্মদ আবুল হাসান বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের সময় আসামি রঞ্জু মিয়ার বয়স ছিল মাত্র ১৪ বছর। তিনি কোনোভাবেই তখন রাজাকার বাহিনীতে যোগ দেওয়ার মতো অবস্থায় ছিলেন না। আমরা এ রায়ের বিরুদ্ধে দেশের সর্বোচ্চ আদালতে আপিল করব। আশা করি তিনি খালাস পাবেন। আর যারা পলাতক তারা গ্রেপ্তার হলে কিংবা আত্মসমর্পণ করলে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’

যেসব অভিযোগে দণ্ড :

প্রথম অভিযোগ : ১৯৭১ সালের ১৪ জুন আসামিরা পাকিস্তান বাহিনীকে সঙ্গে নিয়ে গাইবান্ধা সদরের বিষ্ণুপুর গ্রামে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা করে দুজনকে হত্যা, নির্যাতন, লুটপাট ও হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষদের দেশত্যাগে বাধ্য করার অভিযোগে পাঁচ আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে ট্রাইব্যুনাল।

দ্বিতীয় অভিযোগ : ১৯৭১ সালের ১৮ অক্টোবর আসামিরা পাকিস্তান বাহিনীর সহযোগিতায় গাইবান্ধার সাহাপাড়া ইউনিয়নের নান্দিনা গ্রামে হামলা করে নয়জনকে হত্যা, নির্যাতন ও লুটপাট করে। এই অভিযোগে আসামি আবদুল জব্বার, খোকা, ওয়াহাব ও মনতাজকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে আদালত।

তৃতীয় অভিযোগ : ১৯৭১ সালের ১৮ অক্টোবর আসামিরা আরও কয়েকজন রাজাকারকে সঙ্গে নিয়ে গাইবান্ধা সদরের সাহাপাড়া ইউনিয়নের দৌলতপুর গ্রামে গিয়ে হামলা চালিয়ে পাঁচজনকে হত্যা করে। এ অভিযোগে আসামি আবদুল জব্বার, খোকা, ওয়াহাব ও মনতাজকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে ট্রাইব্যুনাল।

চার নম্বর অভিযোগ : ১৯৭১ সালের ১৮ অক্টোবর গাইবান্ধার জেলা সদরের সাহাপাড়া ইউনিয়নের নান্দিনা, ভবানীপুর ও চকগয়েশপুর গ্রামে হামলা চালায় আসামি ও পাকিস্তান বাহিনী। সেখানে তারা নিরস্ত্র মুক্তিযোদ্ধা ওমর ফারুক, ইসলামউদ্দিন ও নবী হোসেনসহ সাতজনকে গুলি করে হত্যা করে। এ অভিযোগে পাঁচজনকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে ট্রাইব্যুনাল।