প্রস্তাবিত প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের সক্ষমতা জোরদারকরণ প্রকল্পে লুটপাটের ‘নীল নকশার’ তথ্য পাওয়া গেছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২৯১ কোটি টাকার এ প্রকল্পে ২০০ জন কর্মকর্তা যাবেন বিদেশ ভ্রমণে, এদের প্রত্যেকের জন্য বরাদ্দ ৬ লাখ টাকা। এই ২০০ জনের মধ্যে ৫০ জন যাবেন ‘স্টাডি ট্যুরে’। ধারণা করা হচ্ছে, এ শিক্ষা সফরের নামে তারা আসলে প্রমোদ ভ্রমণ করবেন।
জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভার প্রকল্পটি অনুমোদন পেলে আগামী বছরের জানুয়ারি থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে কাজ শেষ করার লক্ষ্য ধরা হয়েছে। এর আওতায় প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের সদর দপ্তরে একটি নতুন নয়তলা ভবন, সাভারে একটি কেন্দ্রীয় ঔষধাগার (চারতলা), আট জেলায় নতুন আটটি জেলা প্রাণিসম্পদ ভবন (চারতলা) এবং ময়মনসিংহে একটি নতুন বিভাগীয় ভবন করা হবে।
প্রস্তাবিত প্রকল্পে ৯১টি গাড়ি কিনতে বরাদ্দ চেয়েছে অধিদপ্তর। নথিপত্র ঘেঁটে দেখা গেছে, পরিকল্পনা কমিশন এসব গাড়ি কেনা ও
প্রকল্পের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুললেও বিদেশ ভ্রমণে ছিল চুপ। এর কারণ অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ৫০ জনের স্টাডি ট্যুরের ওই দলে পরিকল্পনা কমিশনের একাধিক কর্মকর্তার নাম রয়েছে। তাই কমিশনও কোনো আপত্তি জানায়নি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিকল্পনা কমিশন প্রস্তাবিত প্রকল্পের অন্যান্য বিষয় নিয়ে প্রশ্ন তুললেও বিদেশ ভ্রমণ নিয়ে নীরব থাকার নেপথ্যে থাকতে পারে ‘লুটপাটের একটা যোগসাজশ’।
উন্নয়ন প্রকল্পের প্রস্তাবনা (ডিপিপি) ঘেঁটে জানা গেছে, খাদ্য নিরাপত্তা ও প্রাণিজ আমিষের উৎপাদন নিশ্চিতে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়ানোর প্রয়োজন। এজন্য সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে ২৯১ কোটি ৪৫ লাখ টাকা ব্যয়ে নতুন প্রকল্প নিতে চায় অধিদপ্তর। প্রকল্পের আওতায় ২০০ কর্মকর্তা বিদেশ ভ্রমণ করবেন। এর মধ্যে ১৫০ জন যাবেন দুই সপ্তাহের প্রশিক্ষণে আর ৫০ জন শিক্ষা সফরে। এজন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১২ কোটি টাকা। এ হিসাবে জনপ্রতি বরাদ্দ ৬ লাখ টাকা। তারা কোন কোন দেশ ভ্রমণ করবেন প্রকল্প পাসের পর তা চূড়ান্ত করবে অধিদপ্তর। অবশ্য উপজেলা কর্মকর্তা থেকে মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাই যে এই সুযোগ পাবেনÑ তা চূড়ান্ত করা হয়েছে।
এ বিষয়ে কথা হয় মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী আশরাফ আলী খান খসরুর সঙ্গে। দেশ রূপান্তরকে তিনি বলেন, কোনো কর্মকর্তাই এমনি এমনি ঘুরতে যাবেন না। সবাই প্রশিক্ষণ নিতেই যাবেন। ৫০ জন কর্মকর্তার শিক্ষা সফরের বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তিনি প্রকল্প প্রস্তুতকারীদের সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেন।
বিষয়টি নিয়ে স্পষ্ট ধারণা পেতে মন্ত্রণালয়ের ‘ফোকাল পয়েন্টের’ দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা ডা. হাসান ইমামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রকল্প তৈরিতে সম্পৃক্ত ঢাকা জেলার প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ড. মো. এমদাদুল হক তালুকদারের সঙ্গে কথা বলতে বলেন। ডা. এমদাদুল হক তালুকদার দেশ রূপান্তরকে জানান, তিনি সম্পৃক্ত থাকলেও কোনো তথ্য দিতে পারবেন না। তথ্য পেতে প্রাণিসম্পদ অর্থনীতিবিদ ডা. কে এম আতাউর রহমানের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন তিনি। আতাউর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, প্রকল্পের আওতায় কর্মকর্তারা কোন কোন দেশ ভ্রমণ করবেন, সেটা পরে নির্ধারণ করা হবে। প্রকল্পের আওতায় যেসব গাড়ি কেনার কথা ছিল, পরিকল্পনা কমিশন সেটা অনুমোদন দেয়নি। গাড়ির সংখ্যা কমানো হচ্ছে। প্রশিক্ষণ বা শিক্ষা সফর নিয়ে পরিকল্পনা কমিশন কোনো প্রশ্ন তোলেনি। এজন্য তা অপরিবর্তিত থাকবে।
প্রকল্পের আওতায় দেশের ভেতরেও ১২০ জন কর্মকর্তার প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। এজন্য বরাদ্দ ধরা হয়েছে ২২ লাখ টাকা। যেখানে বিদেশে ২০০ জনের প্রশিক্ষণ ও শিক্ষা সফর বাবদ ব্যয় ধরা হয়েছে ১২ কোটি টাকা। বিদেশ ভ্রমণে এত ব্যয় ধরা হলেও পরিকল্পনা কমিশন কেন চুপ সে বিষয়ে জানতে চাইলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কমিশনের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, প্রকল্প অনুমোদনের নামে এখন যা হচ্ছে, তা যোগসাজশেই হচ্ছে। সাধারণত দেখা যায়, মন্ত্রণালয় বা অধিদপ্তর পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তাদের বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে বিদেশ ভ্রমণে নিয়ে যাচ্ছে, যা আসলে প্রমোদ ভ্রমণই। প্রস্তাবিত প্রকল্পের ডিপিপিতে পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তাদের নাম থাকলে তা পাস করাতে সুবিধা হয়। এ প্রকল্পেও তেমনই হয়েছে। বিষয়টি স্বীকার করে অধিদপ্তরের প্রাণিসম্পদ অর্থনীতিবিদ ডা. আতাউর দেশ রূপান্তরকে বলেন, প্রকল্প পাসের সুবিধার্থে প্রাণিসম্পদ সংক্রান্ত কাজে সম্পৃক্ত পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তাদের শিক্ষা সফরে রাখা হয়েছে। কিন্তু তারা সংখ্যায় খুব বেশি নয়।
প্রকল্পসংশ্লিষ্ট পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তারা জানান, সম্প্রতি প্রস্তাবিত প্রকল্পটির ওপর কমিশনের প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভা হয়েছে। সভায় গাড়ি ক্রয়সহ বিভিন্ন বিষয়ে প্রশ্ন তোলা হলেও প্রশিক্ষণ বা শিক্ষা সফর নিয়ে কোনো আপত্তি জানানো হয়নি। এ বিষয়ে জানতে চাইলে কমিশনের কৃষি, পানিসম্পদ ও পল্লী প্রতিষ্ঠান বিভাগের উপপ্রধান শাহীনূর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, এখনো কোনো কিছু চূড়ান্ত হয়নি। প্রকল্প এখনো প্রাথমিক পর্যায়েই রয়েছে। বিদেশ ভ্রমণ নিয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আপনারা সাংবাদিকরা তো এসব নিয়েই নিউজ করেন। শোনেন, এখানে কেউ আনন্দ-ফুর্তি বা কেনাকাটা করার জন্য বিদেশ যাবেন না। সবাই প্রশিক্ষণ নিতেই যাবেন। তাদের জন্য এটা জরুরি।’ এসব কথা বলার পরপরই ‘সচিবালয়ে মিটিংয়ে আছি’ বলে মোবাইল ফোনের সংযোগ কেটে দেন তিনি।
অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, সাধারণত স্বল্প ও মধ্যমেয়াদি প্রশিক্ষণের জন্য ভারত, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামের মতো দেশে যান প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা। এছাড়া প্রয়োজন অনুসারে অন্যান্য দেশের যাওয়ার রেকর্ড রয়েছে। প্রস্তাবিত প্রকল্পে জনপ্রতি ৬ লাখ টাকা করে বরাদ্দ রাখা অযৌক্তিক। অবশ্য প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) ডা. হীরেশ রঞ্জন ভৌমিক বলছেন, বিদেশ ভ্রমণে এই ব্যয় যৌক্তিকই। দেশ রূপান্তরকে গতকাল বুধবার তিনি বলেন, উচ্চতর প্রশিক্ষণের জন্য সাধারণত ভারত, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ডের মতো দেশে পাঠানো হয়। অনেক সময় ইউরোপের বিভিন্ন দেশেও পাঠানো হয়। ভারত বা থাইল্যান্ডের মতো প্রতিবেশী দেশে দুই সপ্তাহের প্রশিক্ষণে এত খরচ হবে কেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, বরাদ্দ রাখা হয়েছে, ব্যয় না হলে ফেরত যাবে। কোন পর্যায়ের কর্মকর্তারা যাবেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, উপজেলা পর্যায়ের কর্মকর্তাসহ ঊর্ধ্বতন সবাইকে এই প্রশিক্ষণ ও শিক্ষা সফরে রাখা হয়েছে। প্রকল্প পাস হলে প্রয়োজন অনুসারে কোন কোন দেশে যাবে তা ঠিক করা হবে।
প্রকল্পের আওতায় অন্যান্য কার্যক্রমের মধ্যে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর ৭৮ কোটি টাকায় জিপ, মিনিবাস, মাইক্রোবাসসহ মোট ৯১টি গাড়ি ক্রয়ের প্রস্তাব করেছে। এর মধ্যে ৭৩টি জিপ কিনতেই প্রস্তাব করা হয়েছে ৬৮ কোটি টাকা। বাকিগুলো অন্য গাড়ি। এ প্রস্তাবে পিইসি সভায় আপত্তি জানানো হয়েছে। মোট ৬৩টি গাড়ি কেনার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে; ব্যয় ধরা হয়েছে ৫৩ কোটি ৬২ লাখ টাকা। এর মধ্যে ৫২টি জিপের জন্য ৪৮ কোটি টাকা বরাদ্দের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
প্রকল্পের গাড়ি ক্রয়সহ বিভিন্ন বিষয় প্রশ্ন তোলা হলেও বিদেশ ভ্রমণ নিয়ে কোনো আপত্তি না জানানোর বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের পরামর্শক অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, এখানে প্রকল্পের অন্যান্য ব্যয় ও উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। বিভিন্ন খাতে ব্যয় কমানো হয়েছে। কিন্তু বিদেশ ট্যুর নিয়ে কোনো প্রশ্ন করেনি পরিকল্পনা কমিশন। এতে অনুমান করা যায়, পারস্পরিক যোগসাজশ রয়েছে। তিনি আরও বলেন, কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণের প্রয়োজন রয়েছে, কিন্তু সম্পৃক্ত নয় এমন ব্যক্তি যুক্ত করা অযৌক্তিক। একই সঙ্গে অতিরিক্ত ব্যয় সংস্থান রাখাও উচিত না। এতে জনগণের অর্থ তছরুপ হওয়ার ঝুঁকি থাকে ।