রংপুরের পীরগঞ্জের ভেণ্ডাবাড়ি পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রে সামসুল ইসলাম নামে এক বৃদ্ধকে মাদক কারবারি সন্দেহে রাতভর আটকে রেখে নির্যাতন করে হত্যার অভিযোগ উঠেছে। এ খবর পেয়ে বিক্ষুব্ধ গ্রামবাসী গতকাল বুধবার সকালে তদন্ত কেন্দ্র ঘেরাও করলে পুলিশ ৩০ রাউন্ড রাবার বুলেট ছোড়ার পাশাপাশি লাঠিপেটা করে। এতে ১৫ জন গুলিবিদ্ধসহ আহত হয়েছেন কমপক্ষে ২৫ জন। এ ঘটনায় পাঁচ পুলিশ সদস্যকে প্রত্যাহার (ক্লোজড) এবং একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
পুলিশের দাবি, সামসুল ইসলাম একজন মাদক কারবারি। চোলাই মদসহ গত মঙ্গলবার রাতে তাকে গ্রেপ্তার করে ভেণ্ডাবাড়ি তদন্ত কেন্দ্রের পুলিশ সদস্যরা। পরে বুধবার সকালে হাজতের জানালার গ্রিলের সঙ্গে গায়ের ফতুয়া দিয়ে তার ফাঁস দেওয়া মরদেহ দেখা যায়। তবে পরিবারের সদস্যরা বলছেন, ভেণ্ডাবাড়ি পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের ইনচার্জ এসআই আমিনুল ও তার সোর্স জিয়া ছাগল ব্যবসায়ী শামসুলকে আটক করে এক লাখ টাকা দাবি করে। টাকা দিতে রাজি না হওয়ায় তাকে মাদক কারবারি সাজিয়ে সারা রাত নির্যাতন করে হত্যা করা হয়েছে। নিহত শামসুল পীরগঞ্জের শান্তিপুর মির্জাপুর এলাকার প্রয়াত মফিজউদ্দিনের ছেলে।
সামসুলের মেয়ে সান্তনা ও ভাই শরিফুল সাংবাদিকদের বলেন, সামসুল ছাগল কেনা-বেচা করতেন। তিনি বৃদ্ধ মানুষ, জীবনে কোনোদিন তিনি চোলাই মদের ব্যবসা করেননি। ভেণ্ডাবাড়ি পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই আমিনুল এবং তার সোর্স জিয়া সামসুলকে আটক করে এক লাখ টাকা উৎকোচ দাবি করেন। টাকা দিতে রাজি না হওয়ায় তাকে চোলাই মদের কারবারি বানিয়ে তদন্ত কেন্দ্রে নিয়ে গিয়ে সারা রাত নির্যাতন করে হত্যা করা হয়। আর হত্যার ঘটনাকে ধামাচাপা দিতে আত্মহত্যার কথা বলছে পুলিশ।
প্রত্যক্ষদর্শীরা দেশ রূপান্তরকে জানান, সামসুলের মৃত্যুর খবর জানাজানি হলে বেলা ১১টার দিকে কয়েকশ’ গ্রামবাসী ভে-াবাড়ি পুলিশ তদন্ত কেন্দ্র ঘেরাও করে বিক্ষোভ শুরু করে। এসময় বিক্ষুব্ধ গ্রামবাসী ভেণ্ডাবাড়ি-বড়দরগা সড়ক অবরোধ করলে ওই সড়ক দিয়ে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। বিক্ষোভের মুখে পুলিশ জনতাকে লক্ষ্য করে ফাঁকা গুলি ও রাবার বুলেট নিক্ষেপ এবং লাঠিপেটা করলে অন্তত ২৫ জন আহত হৎন। এরমধ্যে দুজনের অবস্থা গুরুতর। পরে রংপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মারুফ আহাম্মেদের নেতৃত্বে বিপুল সংখ্যক পুলিশ সদস্য ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন।
সামসুলের মৃত্যুর বিষয়ে জানতে চাইলে পীরগঞ্জ থানার ওসি সরেশ চন্দ্র বলেন, ‘সামসুল ইসলাম একজন মাদক ব্যবসায়ী। ভেণ্ডাবাড়ি পুলিশ তাকে ১৫ লিটার চোলাই মদসহ আটক করে। তিনি সকালে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেন।’
অন্যদিকে রংপুরের পুলিশ সুপার বিপ্লব চন্দ্র রায় বলেন, ‘৩০ লিটার চোলাই মদসহ সামসুল ইসলাম নামে এক ব্যক্তিকে আটক করে পুলিশ। সকালেও তিনি সুস্থ ছিলেন। কিন্তু সকাল ৯টার পর পরনের জামা দিয়ে গলায় ফাঁস লাগিয়ে আত্মহত্যা করেন তিনি।’
তবে সামসুল গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছেন বলে পুলিশ কর্মকর্তারা দাবি করলেও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা আসার আগেই কেন মৃতদেহ নিচে নামানো হয় তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে গ্রামবাসী।
পাঁচ পুলিশ সদস্যকে প্রত্যাহার, তদন্ত কমিটি : বৃদ্ধ সামসুল ইসলামকে নির্যাতনে হত্যার অভিযোগ ওঠায় ভে-াবাড়ি তদন্ত কেন্দ্রের পাঁচ পুলিশ সদস্যকে প্রত্যাহার (ক্লোজড) করা হয়েছে। গতকাল দুপুরে ওই পাঁচ পুলিশ সদস্যকে প্রত্যাহার করা হয়। এছাড়া এ ঘটনা তদন্তে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন রংপুরের পুলিশ সুপার বিপ্লব কুমার।
বুধবার দুপুরে ভে-াবাড়ি পুলিশ তদন্ত কেন্দ্র পরিদর্শন শেষে তিনি বলেন, ‘বৃদ্ধকে নির্যাতন করে হত্যার অভিযোগ ওঠায় ভে-াবাড়ি পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই আমিনুল ইসলামসহ পাঁচ পুলিশ সদস্যকে ক্লোজড করে পুলিশ লাইনসে সংযুক্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি পুলিশ সোর্স জিয়াকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে গ্রেপ্তার করারও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া অভিযোগ তদন্তে কমিটি গঠন করা হয়েছে। সেই কমিটিকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে প্রতিবেদন দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’