বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ হত্যার প্রতিবাদে ২২ অক্টোবর রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে যেকোনো মূল্যে সমাবেশ করতে চায় সরকারবিরোধী রাজনৈতিক মোর্চা জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। সমাবেশের আগে পুলিশ প্রশাসনকে শুধু অবহিত করা হবে। অনুমতির অপেক্ষায় বসে থাকবে না ফ্রন্ট। গতকাল বৃহস্পতিবার দেশ রূপান্তরকে এ কথা জানিয়েছেন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের কয়েকজন।
তারা বলেন, ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকে সরকার কোথাও সফল হয়নি। তারা দেশের অর্থনীতি, প্রশাসন, বিচারবিভাগ নিজেদের করায়ত্ত করেছে। বিগত ১০ বছরের শাসনামলে ক‚টনীতিতে ব্যর্থ হয়েছে। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারত সফরে দেশের স্বার্থবিরোধী চুক্তি করেছেন। দেশে ভিন্নমত প্রকাশের কোনো সুযোগ নেই। শুধু ভিন্নমত প্রকাশের অপরাধে আবরারের মতো একজন সাধারণ শিক্ষার্থীকে হত্যা করা হয়েছে। তাই সরকারকে আর সময় দেওয়া যায় না। সরকারের পতনই এখন ফ্রন্টের একমাত্র লক্ষ্য।
ফ্রন্টের স্টিয়ারিং কমিটির সদস্য ও জেএসডি সভাপতি আ স ম আবদুর রব গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, একজন সাধারণ শিক্ষার্থীর নিরাপত্তা যে সরকার দিতে পারে না তার ক্ষমতায় থাকার কোনো অধিকার নেই। ছাত্রলীগ আবরারকে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করেছে। ছাত্রলীগের সাংগঠনিক নেত্রী হিসেবে আবরারকে হত্যায় দায় প্রধানমন্ত্রী এড়াতে পারেন না। তিনি বলেন, যে সরকার দেশ শাসন করতে পারে না, প্রতিবেশীর কাছ থেকে নিজের দেশের স্বার্থ রক্ষা করতে পারে না, সে সরকারের ক্ষমতায় থাকার অধিকার নেই। সরকারকে ক্ষমতা ছেড়ে নির্দলীয় সরকারের অধীনে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন দিতে হবে। যত তাড়াতাড়ি দেবে ততই দেশের জন্য মঙ্গল। সরকারের জন্য মঙ্গল।
এর আগে গত ১২ অক্টোবর আবরার হত্যার প্রতিবাদ, ভারতের সঙ্গে চুক্তির প্রতিবাদ ও দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে পুলিশের অনুমতি উপেক্ষা করে রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে সমাবেশ করে বিএনপি।
গত বুধবার জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের আহ্বায়ক ও গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেনের সভাপতিত্বে তার মতিঝিলের চেম্বারে ফ্রন্টের স্টিয়ারিং কমিটির এক বৈঠক হয়। বৈঠক শেষে সংবাদ সম্মেলনে ড. কামাল হোসেন বলেন, ‘দেশের সর্বশেষ অবস্থা নিয়ে সাধারণ জনগণের পাশাপাশি আমরা সবাই উদ্বিগ্ন। আবরার হত্যার বিষয়টি দেশের জনগণ দেখেছে কীভাবে তা ঘটানো হয়েছে। ইচ্ছাকৃতভাবে একজন মেধাবী নিরীহ ছেলেকে মেরে ফেলা হয়েছে এটা জঘন্য ব্যাপার।’
তিনি বলেন, ‘সরকার অনুমতি দিক কিংবা না দিক আমরা সমাবেশ করবই। জনসভার অনুমতি না দেওয়ার মানে সরকার সংবিধানকে লঙ্ঘন করছে। সংবিধানে লেখা আছে মৌলিক অধিকার আছে সভা-সমিতি করার, বক্তব্য রাখার। আর যদি এ ধরনের সংবিধান লঙ্ঘন করা শুরু করে আমি তো মনে করি দেশের মানুষের তাদেরকে (সরকার) ঘাড় ধরে বের করে দেওয়া উচিত।’
পরে গণফোরামের সাধারণ সম্পাদক ড. রেজা কিবরিয়া ফ্রন্টের দুদিনের কর্মসূচি ঘোষণা করে বলেন, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সমাবেশ ছাড়াও আবরার হত্যার প্রতিবাদে বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গণস্বাক্ষর অভিযান হবে। গণস্বাক্ষর অভিযান দেশ-বিদেশে করা হবে।
এর আগে গত ১৩ অক্টোবর আবরার হত্যার প্রতিবাদে ফ্রন্ট জাতীয় প্রেস ক্লাবে এক গণজমায়েত করে। গণজমায়েত শেষে শহীদ মিনার অভিমুখে শোক র্যালি করতে চাইলে তাতে বাধা দেয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এর প্রতিবাদে ২২ অক্টোবর রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সমাবেশের ঘোষণা দেয় ফ্রন্ট। অনুমতি না দিলেও ফ্রন্ট সমাবেশ করবে কি না জানতে চাইলে ফ্রন্টের স্টিয়ারিং কমিটির সদস্য ও নাগরিক ঐক্যের আহ্বাবায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না দেশ রূপান্তরকে বলেন, ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকে সরকার কখনো কোনো ক্ষেত্রে সফলতা দেখাতে পারেনি। তারা বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের খুন, গুম করেছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি হয়েছে। ব্যাংকের টাকা লোপাট করে, বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ লুট করে অর্থনীতির বারোটা বাজিয়েছে। ক্ষমতায় আসার পর থেকে বড় বড় প্রজেক্ট করেছে বড় বড় দুর্নীতি করার জন্য। এর মাধ্যমে সরকার-ঘনিষ্ঠরা টাকা কামিয়ে বিদেশে পাচার করেছে। তাই এই সরকারকে আর ছাড় নয়। অনুমতি না দিলেও সমাবেশ তারা করবেনই। পুলিশকে শুধু অবহিত করা হবে।
২২ অক্টোবরের সমাবেশের সফলতার বিষয়ে জানতে চাইলে গণফোরামের সাধারণ সম্পাদক ড. রেজা কিবরিয়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, সারা বিশ্ববেদেশে দেশে স্বৈরাচারী, অগণতান্ত্রিক সরকারের বিরুদ্ধে মাঠে নামা কঠিন। তারপরও ফ্রন্টের নেতারা যেকোনো ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত। কারণ দেশে এখন মানুষের কোনো নিরাপত্তা নেই। বুয়েট শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদকে ছাত্রলীগ যেভাবে হত্যা করেছে তাতে প্রমাণ হয়েছে সরকার ভিন্নমত পছন্দ করে না। সহনশীলতা নেই সরকারের। সাধারণ একজন শিক্ষার্থীর ভিন্নমত সরকার সহ্য করতে পারেনি। ইচ্ছে করে আবরারের হত্যার বিষয়টির প্রচার চালিয়ে জনগণকে ভয় দেখানোর চেষ্টা করেছে।