গ্রামীণ ও রবিতে প্রশাসক নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু

পাওনা আদায়ে গ্রামীণফোন ও রবি আজিয়াটাতে প্রশাসক নিয়োগের প্রস্তাব অনুমোদন করেছে ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়। তারপরই বিটিআরসি প্রশাসক নিয়োগ দেওয়ার কাজ শুরু করেছে। পাওনা নিয়ে বিরোধে গ্রামীণফোনের আপিল গ্রহণ করে বিটিআরসির নিরীক্ষা দাবির ১২ হাজার ৫৭৯ কোটি ৯৫ লাখ টাকা আদায়ে হাইকোর্টের দুই মাসের নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার দিনই প্রশাসক নিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।

এ প্রসঙ্গে ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার গতকাল বলেছেন, প্রশাসক নিয়োগ এখন সময়ের ব্যাপার। বিটিআরসি প্রশাসক নিয়োগে যে অনুমতি চেয়েছিল তাতে সম্মতি দিয়ে দেওয়া হয়েছে। টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক বিটিআরসি চেয়ারম্যান জহুরুল হক জানান, প্রশাসক নিয়োগের প্রক্রিয়া তারা শুরু করেছেন। প্রশাসক নিয়োগের সরকারি সিদ্ধান্তের বিষয়ে গ্রামীণফোনের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে গ্রামীণফোনের হেড অব রেগুলেটরি

 এবং অ্যাক্টিং হেড অব কমিউনিকেশন্স হোসেন সাদাত দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিটিআরসির বিরোধপূর্ণ নিরীক্ষা দাবির বিপরীতে গঠনমূলক আলোচনার মাধ্যমে একটি স্বচ্ছ সমাধানে পৌঁছাতে আমাদের প্রতিশ্রæতি আমরা পুনর্ব্যক্ত করতে চাই। গ্রামীণফোনের ওপর আরোপিত বিরোধপূর্ণ নিরীক্ষা দাবির পাওনা আদায়ে বিটিআরসির যেকোনো পদক্ষেপ গ্রহণের ওপর স্থিতাবস্থা দিয়েছে হাইকোর্ট বিভাগ। যেকোনো ধরনের সরঞ্জাম ও সফটওয়্যার আমদানিতে এবং নতুন সেবা ও প্যাকেজ ঘোষণার ক্ষেত্রে অনাপত্তিপত্র দেওয়া স্থগিতসহ অনুমোদন দেওয়ার নিষেধাজ্ঞার বিষয়ে বিটিআরসির দেওয়া চিঠিটির ওপরও স্থিতাবস্থা দিয়েছে আদালত।’

রবি আজিয়াটার চিফ করপোরেট অ্যান্ড রেগুলেটরি অফিসার সাহেদ আলম দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে এ সমস্যা সমাধানে বারবার প্রস্তাব দেওয়া হলেও দুর্ভাগ্যজনকভাবে তা আমলে নেওয়া হয়নি। বিচারাধীন একটি বিষয়ে আদালত সিদ্ধান্তে আসার আগেই প্রশাসক নিয়োগের মতো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা বিচারব্যবস্থার প্রতি অনাস্থার শামিল। প্রশাসক নিয়োগের সিদ্ধান্ত এ দেশের প্রত্যক্ষ বিদেশ বিনিয়োগ পরিস্থিতি এবং ডিজিটাল বাংলাদেশের লক্ষ্য অর্জনে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

গ্রামীণফোনের কাছে বিটিআরসির (বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন) পাওনা ১২ হাজার ৫৭৯ কোটি ৯৫ লাখ টাকা আদায়ের ওপর দুই মাসের নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে হাইকোর্ট। এই মোবাইল অপারেটরের এ-সংক্রান্ত আপিল গ্রহণ করে গতকাল বৃহস্পতিবার অন্তর্বর্তীকালীন এই আদেশ দেয় বিচারপতি এ কে এম আবদুল হাকিম ও বিচারপতি ফাতেমা নজীবের হাইকোর্ট বেঞ্চ। গ্রামীণফোনের আপিলের ওপর শুনানির জন্য আগামী ৫ নভেম্বর দিন ঠিক করেছে আদালত।

আদালতে গ্রামীণফোনের পক্ষে শুনানিতে ছিলেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এ এম আমিন উদ্দিন। তাকে সহযোগিতা করেন আইনজীবী শরীফ ভুঁইয়া ও তানিম হোসাইন শাওন। বিটিআরসির পক্ষে ছিলেন আইনজীবী খন্দকার রেজা-ই-রাকিব।

সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা বলছেন, হাইকোর্টের এ আদেশের ফলে এই সময়ের মধ্যে বিটিআরসি পাওনা দাবি করে তা আদায়ের জন্য গ্রামীণফোনের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিতে পারবে না।

বিটিআরসির আইনজীবী খন্দকার রেজা-ই-রাকিব দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আদেশের অনুলিপি এখনো আমরা হাতে পাইনি। অনুলিপি হাতে পেলে হাইকোর্টের এ আদেশের বিরুদ্ধে আপিলের বিষয়ে সিদ্ধান্ত হবে।’

বিটিআরসির দাবি, যন্ত্রপাতি আমদানিসহ বিভিন্ন বিষয়ে গ্রামীণফোনের কাছে নিরীক্ষা আপত্তি দাবির ১২ হাজার ৫৭৯ কোটি ৯৫ লাখ টাকা এবং রবির কাছে ৮৬৭ কোটি ২৩ লাখ টাকা পাওনা রয়েছে। ১৯৯৬ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত গ্রামীণফোনের কাছে পাওনা ও এর সুদ ওই টাকা দাবি করে গত ২ এপ্রিল চিঠি পাঠায় বিটিআরসি। বেশ কয়েক দফা চেষ্টায় সেই টাকা আদায়ে ব্যর্থ হয়ে প্রতিষ্ঠান দুটিকে লাইসেন্স বাতিলের হুমকি দিয়ে নোটিস পাঠানো হয়।

তবে টাকার অঙ্ক নিয়ে আপত্তি জানায় গ্রামীণফোন ও রবি। বিটিআরসি সালিসের মাধ্যমে বিষয়টি নিষ্পত্তিতে রাজি না হওয়ায় দেওয়ানি আদালতের দ্বারস্থ হয় দুই অপারেটর। এ ছাড়া অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালের উদ্যোগে এ বিষয়ে সমাধান খুঁজতে গত ১৮ সেপ্টেম্বর গ্রামীণফোন ও বিটিআরসির কর্মকর্তাদের মধ্যে বৈঠকও হয়।

বকেয়া অর্থ পরিশোধ না করায় গত ৪ জুলাই গ্রামীণফোনের ৩০ শতাংশ ও রবির ১৫ শতাংশ ব্যান্ডইউথ কমিয়ে দেয় বিটিআরসি। এই নির্দেশনা কার্যকরের পর থেকে মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহারকারীরা ভোগান্তির শিকার হন। পরে গত ১৭ জুলাই ইন্টারনেটের গতি কমিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করে অপারেটর দুটিকে অনাপত্তিপত্র (এনওসি) না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় বিটিআরসি। এতে করে অপারেটর দুটির নতুন প্যাকেজ অনুমোদন বন্ধ হয়ে যায়। পরবর্তী সময়ে গ্রামীণফোন ও রবির লাইসেন্স কেন বাতিল করা হবে নাÑ এ মর্মে নোটিস পাঠায় বিটিআরসি। এই নোটিসের জবাব পাওয়ার পর এই দুই অপারেটরে প্রশাসক নিয়োগের উদ্যোগ নেয় বিটিআরসি।

বিটিআরসির পাওনার বিষয়ে গত ২৫ আগস্ট রবি এবং ২৬ আগস্ট গ্রামীণফোন ঢাকার দেওয়ানি আদালতে মামলা করে। নিরীক্ষা আপত্তির ‘পাওনা’ টাকা আদায়ে বিটিআরসির দাবিকে ‘অযৌক্তিক ও ত্রæটিপূর্ণ’ হিসেবে বর্ণনা করে মীমাংসার দাবি জানায় দুই অপারেটর।

গ্রামীণফোনের আইনজীবীরা জানান, নিম্ন আদালতে গ্রামীণফোনের পক্ষে স্বত্বের মামলার (টাইটেল স্যুট) আবেদন করা হয়েছিল। সে আবেদনটি গৃহীত হয়ে আদালতে বিচারাধীন রয়েছে। ওই আবেদনের অধীনে বিটিআরসির পাওনা আদায়ের ওপর অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞার আবেদন জানানো হলে গত ২৮ আগস্ট নিম্ন আদালতে সেটি খারিজ হয়ে যায়। পরে ওই আদেশের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আপিল করা হয়। সেই আপিলের ওপর শুনানি শেষে গতকাল এ আদেশ হলো।