অনলাইন মার্কেটিংয়ের নামে প্রতারণা

আশ্বাস দিয়ে মামলা তোলার ফন্দি রেক্স আইটির পলাশের!

অনলাইন মার্কেটিংয়ের নামে প্রতারণার মামলা থেকে বাঁচতে রেক্স আইটি ইনস্টিটিউটের স্বত্বাধিকারী আবদুস সালাম পলাশ নতুন ফন্দি এঁটেছেন বলে জানা গেছে। প্রতিষ্ঠানটির একাধিক গ্রাহকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মামলা তুলে নিলে বা জামিনের ব্যবস্থা করলে টাকা ফেরত দেবেন বলে আশ্বস্ত করেছেন পলাশ। এর পর থেকে তার জামিনের আবেদন করছেন বাদীরা। দেড় হাজার গ্রাহকের ২০০ কোটিরও বেশি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগে করা ৪১টি মামলায় এরই মধ্যে ৩৮টিতে তিনি জামিন পেয়েছেন। এখন মামলার বিষয়ে কথাও বলতে চান না বেশিরভাগ বাদী।

গত ১০ মে রাজধানীর ধানমণ্ডি থানায় পলাশের বিরুদ্ধে প্রতারণা, ডিজিটাল প্রতারণা ও মানি লন্ডারিং আইনে একটি মামলা করেন প্রতিষ্ঠানটির গ্রাহক এ টি এম মুনিরুজ্জামান। একই দিন রাতে রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার একটি বাসা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। পলাশকে সহযোগিতার অভিযোগে স্ত্রী মনিরাতুল জান্নাত ও মামাশ্বশুর আহমেদুল রহমানকেও গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তারা জামিনে মুক্তি পেলেও পলাশ কারাগারে রয়েছেন।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, সম্প্রতি কেরানীগঞ্জে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে পলাশের সঙ্গে দেখা করেছেন বেশ কয়েকজন বাদী। মামলা তুলে নিলে বা জামিনের ব্যবস্থা করলে সব পাওনা মিটিয়ে দেবেন বলে তাদের আশ্বস্ত করেন তিনি। এর পর থেকে আদালতে তার জামিনের আবেদন করছেন মোহাম্মদপুর ও ধানমণ্ডি থানায় করা মামলার বাদীরা। তবে সিআইডিতে থাকা দুটি মামলায় এখনো জামিন পাননি পলাশ।

রেক্স আইটিতে ২২ লাখ টাকা বিনিয়োগ করে প্রতারণার অভিযোগে মামলা করেছেন পটুয়াখালীর ফিরোজ শিকদার। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা কয়েকজন মিলে মামলা করেছিলাম। মামলার বাদী ছিল শামীম আহম্মেদ নামে আরেক গ্রাহক। পলাশ আমাদের জানিয়েছেন জামিনে মুক্তি পেলে পাওনা টাকা দিয়ে দেবে। এজন্য আমরা আদালতে তার জামিন করিয়েছি।’ তিনি আরও বলেন, ‘পলাশ ৪১ মামলার ৩৮টিতেই জামিন পেয়েছেন বলে শুনেছি। শুধু সিআইডিতে তদন্তাধীন দুটি মামলায় এখনো জামিন পাননি।’

দুই লাখ টাকা বিনিয়োগকারী গ্রাহক ফাহাদ আহম্মেদ বলেন, ‘আমি একটি মামলার সাক্ষী। মামলাটি এখনো চলমান। আমাদের মামলাতে পলাশ এখনো জামিন পাননি।’ জামিন পেলে পলাশের অর্থ ফেরতের আশ্বাস প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘তিনি তো অনেক কথাই বলেন আমাদের।’

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক গ্রাহক বলেন, ‘শুরু থেকেই কিছু গ্রাহক পলাশের পক্ষে রয়েছে। তারাই মূলত তাকে জেল থেকে বের করতে নানা ধরনের প্রতিশ্রতি দিচ্ছে। কারাগারে পলাশের সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য মামলার বাদীদের নিয়ে যাচ্ছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘টাকা দেওয়ার যে প্রতিশ্রæতি তার সবই ফাঁকা বুলি। ছাড়া পেতে পলাশ নতুন ফন্দি এঁটেছে। ছাড়া পেলে তার আর কোনো খবরই থাকবে না। অতীতে গ্রাহকদের কাছ থেকে পালাতে তিনি বাসা পর্যন্ত বদলে ফেলেন।’

সিআইডির অনুসন্ধানে উঠে এসেছে পলাশের প্রতারণার নানা কৌশল। সিআইডির একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ২০১০ সালে আউটসোর্সিং শুরু করেন ল²ীপুরের কল্যাণপুরের চন্দ্রগঞ্জের ছেলে পলাশ। ২০১৬ সালে আইটি ভিশনে ট্রেনার হিসেবে ৯ মাস কাজ করেন তিনি। এরপর ২০১৭ সালে রাজধানীর ধানমণ্ডিতে রেক্স আইটি ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করেন পলাশ। শুরুতে তিনি আউটসোর্সিং, গ্রাফিক ডিজাইন, এসইও, ওয়েব ডিজাইন, ডিজিটাল মার্কেটিংসহ বিভিন্ন প্রশিক্ষণ দিতেন। পরবর্তী সময়ে ফেইসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের পেইড মার্কেটিংয়ের প্রচারণার আড়ালে প্রতারণার ফাঁদ পাতেন। প্রতিষ্ঠানটিতে পেইড মার্কেটিংয়ে বিনিয়োগ করলে ৫০ থেকে ১০০ ভাগ পর্যন্ত রিটার্নের অবিশ্বাস্য অফার দেওয়া হতো, যা বাস্তবে পুরোপুরি অসম্ভব। প্রশিক্ষণার্থীদের মাথায় ট্রেনিংয়ে এ ধারণা ঢুকিয়ে দেওয়া হতো আউটসোর্সিংয়ের চেয়ে এ কাজে ১৫-২০ গুণ বেশি লাভ। তাই পাঁচ হাজার প্রশিক্ষণার্থীর একটি বিশাল অংশ বিভিন্নভাবে টাকা সংগ্রহ করে এখানে বিনিয়োগ করে। এর বাইরেও বিভিন্ন ব্যক্তি ও ব্যবসায়ী বেশি লাভের আশায় প্রতিষ্ঠানটিতে বিনিয়োগ করে। এভাবে পলাশ আনুমানিক ২০০ কোটিরও বেশি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে।

তারা আরও জানিয়েছেন, পলাশের নামে রাজধানীর পূর্বাচলে ৪০ কাঠা ও ৬ কাঠার দুটি প্লট, সাভারে ১২ কাঠা জমি এবং রাজধানীর মোহাম্মদপুরের রোকেয়া গার্ডেনে একটি ফ্ল্যাট রয়েছে। কয়েকটি দামি ব্র্যান্ডের গাড়িও রয়েছে তার। এ ছাড়া পলাশ, তার স্ত্রী ও রেক্স আইটির নামে ১৬টি ব্যাংক হিসাবের সন্ধান পাওয়া গেছে। এসব হিসাব এরই মধ্যে ফ্রিজ করা হয়েছে।

পলাশের মামলা তদন্তের দায়িত্বে থাকা সিআইডির সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার জুয়েল চাকমা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পলাশের বিরুদ্ধে ৪১টি প্রতারণার মামলা হয়েছিল। এর মধ্যে সিআইডি দুটি মামলার তদন্ত করছে। ওই দুটি মামলায় সে এখনো জামিন পায়নি। মানি লন্ডারিংয়ের মামলা হওয়ায় তদন্ত শেষ করতে কিছুটা সময় লাগছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘সিআইডির হাতে গ্রেপ্তার পলাশের পরিবারের অন্য সদস্যরা জামিন পেয়েছে। তবে পলাশ এখনো কারাগারে রয়েছে।’

এদিকে রেক্স আইটির বেশিরভাগ গ্রাহক আত্মগোপনে চলে গেছে বলে জানা গেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রাতারাতি বড়লোক হওয়ার আশায় ধার-দেনা করে লাখ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেন তারা। পাওনাদারের টাকা দিতে না পেরে এখন আত্মগোপনে তারা। অনেকেই মোবাইল ফোন নম্বরও বদলে ফেলেছেন।