বাবুরাম মন্ত্রী

বাবুরাম সাপুড়ে ছিলেন, ভালোই ছিলেন। কেন যে মন্ত্রী হতে গেলেন! সুকুমার রায় যে বাবুরামকে নিয়ে ছড়া লিখেছেন তিনি একজন বিশিষ্ট সাপুড়ে। একই সঙ্গে সাপের সাপ্লাই কনট্রাক্টর-সরবরাহ ঠিকাদার। তার সঙ্গে বিশিষ্ট ঠিকাদার ও রাজনীতিবিদ জি কে শামীমের বিশেষ মিল রয়েছে। জি কে শামীম প্রকৌশলীদের দিয়ে কাজের এমন স্পেসিফিকেশন করাতেন, যা কেবল তার পক্ষেই পূরণ সম্ভব হতো। দর কমবেশি, কাঁচামাল কোরিয়ান না জাপানিÑ এসব বিবেচনার আগেই স্পেসিফিকেশনে মার খেয়ে অন্য ঠিকাদাররা নকআউট হয়ে যেতেন। বাবুরামও ঠিক এ কাজটিই করতেন। সুকুমার রায়কে দিয়ে সাপের এমন স্পেসিফিকেশন করাতেন যে, দরপত্রের শিডিউলে সাপের যে বৈশিষ্ট্যের উল্লেখ থাকত, তা শুধু তার পক্ষেই সরবরাহ করা সম্ভব ছিল। সুকুমারকে দিয়ে করানো বাবুরামের সাপের বৈশিষ্ট্য :

যে সাপের চোখ নেই

শিং নেই নোখ্ নেই

ছোটে না কি হাঁটে না

কাউকে যে কাটে না

করে নাকো ফোঁসফাঁস

মারে নাকো ঢুঁশঢাঁশ

নেই কোন উৎপাত

খায় শুধু দুধভাত

ঠিক এ রকম দুখানা জ্যান্ত সাপের দরপত্র আহ্বান করা হয়। পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস বা পিপিআর মান্য করে বাবুরাম ছাড়া এ সাপ সরবরাহ দেওয়ার মতো দ্বিতীয় কোনো সাপুড়ে কিংবা সাপের সাপ্লায়ার খুঁজে পাওয়া যাবে না। সাপুড়ে বাবুরাম কিংবা কোনো ঠিকাদার আমার আলোচ্য নয়, আমার চোখ এখন ভিন্ন এক বাবুরামের ওপর। তিনি আমাদের প্রতিবেশী বিশাল ভারতের একজন মন্ত্রী, তার নাম বাবুরাম নিশাদ। তিনি মোদিজির সাফসুতরো ভারত সৃষ্টির আন্দোলনে তার আর দুজন মন্ত্রী বন্ধুর মতো প্যান্টের চেইন খুলে রাস্তায় দাঁড়িয়ে কিংবা বসে পড়েননি (দুজনের একজনকে অবশ্য চেইন খুলতে হয়নি কারণ তিনি ধুতি পরিহিত অবস্থায় কাজটা করেছেন।)

বাবুরামের আগে সেই দুজনের কথা বলি! রাজস্থানের স্বাস্থ্যমন্ত্রী কালিচরণ শ্রফ জয়পুর পিংক সিটি দেয়ালঘেঁষে দাঁড়িয়ে হাওয়া খেতে খেতে মূত্রপাতের কাজটা সেরে নিচ্ছেন। শত্রুপক্ষ সব দেশেই আছে। মন্ত্রী মহোদয়ের এহেন অত্যাবশ্যকীয় কীর্তির ছবি তুলে শত্রুরা সামাজিক মাধ্যমে ছেড়ে দিয়েছে, অমনি ভাইরাল হয়ে গেলেন মূত্রপাতরত মন্ত্রী মহোদয়। তার কারণে সরকারের অনেকেই বিব্রত হয়েছেন বলে দাবি করা হয়েছে। (অবশ্য রমেশ প্যাটেল নামের একজন বলেছেন, মন্ত্রী আমার আত্মীয় নন, পরিচিত কেউ নন, আমি তাকে সমর্থনও করছি না। তবুও আমি আপনাদের জিজ্ঞেস করতে চাই আপনারা কি কখনো

রাস্তার ধারে মন্ত্রী মহোদয়ের মতোই দাঁড়িয়ে মূত্রপাত করেননি? যদি করে থাকেন, তাহলে তার পেছনে কেন লেগেছেন?)

ভারতের প্রধানমন্ত্রী যেখানে তার ‘ফ্ল্যাগশিপ প্রোগ্রাম’ ক্লিন ইন্ডিয়া বাস্তবায়ন করতে মাঝেমধ্যেই ঝাড়– হাতে রাস্তাঘাট পরিষ্কার করছেন, স্বাস্থ্যমন্ত্রী কালিচরণ শ্রফের এমন একটি অস্বাস্থ্যকর কর্ম তাকে এবং অনেককেই বিব্রত করার কথা। কিন্তু মন্ত্রী সব উড়িয়ে দিয়ে ভারতীয় সংবাদ সংস্থাগুলোকে বলেছেন, এটা কোনো ‘বিগ ইস্যু’ নয়। অর্থাৎ স্বীকার করেছেন ইস্যু, তবে ছোট। ধুতি পরিহিত আরেকজন মন্ত্রী সম্ভু সিং খাটেশ^র আজমির অঞ্চলের একটি দেয়ালের পাশে বসে যখন কাজটা সারছেন, রেহাই তিনিও পাননি, ঠিক পাশেই মাটিতে পড়েছিল রাজস্থানের মুখ্যমন্ত্রী বসুন্ধরা রাজের সচিত্র নির্বাচনী পোস্টার। কেউ একজন মোবাইলে ক্যামেরায় ছবিটা ধরে বাজারে ছেড়ে দিয়েছেন। এই মন্ত্রীর কণ্ঠশক্তি স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে ছাড়িয়ে। তিনি বললেন, মোদির ‘সাচ্ ভারত’ আন্দোলনে খোলা জায়গায় বড় ধরনের প্রাকৃতিককর্মের বিরোধিতা করা হয়েছে। মূত্রপাত এর অন্তর্ভুক্ত নয়। তা ছাড়া খোলা জায়গায় মূত্রপাতের হাজার বছরের ভারতীয় ঐতিহ্য রয়েছে, তিনি তো সেই ঐতিহ্যকে প্রত্যাখ্যান করতে পারেন না। তিনি সেই ঐতিহ্য অনুসরণ করে ভারতীয় কায়দায় ধুতি সামলে বসেই কাজটা করেছেন (ইউরোপীয়দের মতো কিংবা স্বাস্থ্যমন্ত্রীর মতো দাঁড়িয়ে করেননি।) তা ছাড়া তিনি যে জায়গাটি এ কাজের জন্য বেছে নিয়েছেন, তিনি তাকে যথেষ্ট নিরাপদ এবং রোগবিস্তারের অননুকূল নয় বলে মনে করেন। অধিকন্তু তার নিঃসৃত তরল মুখ্যমন্ত্রীর ছবিতে স্পর্শ করেনি। কাজেই এ নিয়ে হইচই করার কারণ নেই।

আত্মশুদ্ধিকরণে গোমূত্রের ভূমিকা মোরারজি দেশাই মহোদয় প্রতিষ্ঠা করে গেছেন। পুণ্যভূমি ভারত শুদ্ধিকরণে মন্ত্রী বর্জ্যরে ভূমিকা এখনো সুপ্রতিষ্ঠিত নয়, তবে তা প্রতিষ্ঠা করতে মন্ত্রীদের প্রচেষ্টা অব্যাহত না থাকার কারণ নেই। সরকারকে বিব্রত করা মন্ত্রীদের জরুরি কাজের একটি। এবার আবার বাবুরামে ফিরে আসি। উত্তর প্রদেশ সরকারের মন্ত্রী বাবুরাম নিশাদ জননী জন্মভূমিকে পাশ কাটিয়ে তার সন্তানের জননী নীতু নিশাদের গায়ে মূত্রপাত করেছেন। তিনি মোদিজির দল ভারতীয় জনতা পার্টির নেতা। নীতুর ভাষ্য ইউটিউবে ভাইরাল হয়ে গেছে। ২০০৫ সালে বাবুরাম ও নীতুর বিয়ে। সম্পর্ক ভালো যাচ্ছে না অনেক দিন। মন্ত্রী মহোদয় পিস্তল উঁচিয়ে তার সঙ্গে কথা বলেছেন এবং তার বাবা ও ভাইকে হত্যার হুমকি দিয়েছেন।

কেন মন্ত্রী মহোদয়ের এহেন কর্ম? কারণ নীতু অমিতব্যয়ী, কেবল টাকা চায়। উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রীর কাছে নীতু নালিশ জানিয়েছেন, মন্ত্রীর পিস্তলবাজির চেয়েও বেশি সমালোচিত হয়েছে মূত্রপাতের ঘটনাটি। নীতু স্বামীর বিরুদ্ধে থানায় ডায়েরি করতে গিয়েছেন। কিন্তু থানাদার তো মন্ত্রীর ক্ষমতা (গদিনশিন অবস্থায়) কী তা জানেন। সুতরাং মূত্রপাত টুত্রপাত কিছু নয়, ভালো করে একটা গোসল দিয়ে নিন, সব ঠিক হয়ে যাবে, ঠিক না হলে গঙ্গাস্নান তো রয়েছেই। এমন সমাধান দিয়ে তাকে থানায় আসার পথ বন্ধ করে দেন। তিনি বলেন, থানাদার ও মন্ত্রীর মধ্যে যোগসাজশ রয়েছে। তিনি বললেও সবাই জানে যে থানাদার ও মন্ত্রীর যোগসাজশ থাকতেই হবে। সুতরাং মামলা-মোকদ্দমায় বিশেষ সুবিধে করতে পারবেন না।

বাবুরাম এগোচ্ছেন তালাকের দিকে। মন্ত্রীর নতুন কেউ জুটেছে এমন ইঙ্গিত নীতু দেননি, পত্রিকাও লেখেনি। তবে এমন পরামর্শ আসছে, ভবিষ্যতে মন্ত্রী বাবুরাম নিশাদ যেন তার সংবেদনশীল অঙ্গটি যত্রতত্র মূত্রপাতের জন্য ব্যবহার না করে সৃষ্টিশীল কাজে লাগান। বাবুরাম কোনো হাসিঠাট্টার নাম নয়। বাবুরাম ভট্টরায় নেপালি গণযুদ্ধের মাওবাদী নেতা। ২০১১-১২ সালে তিনি নেপালের প্রধানমন্ত্রীও ছিলেন। ২০০৫ সালে প্রধানমন্ত্রী শের বাহাদুর দেওবার কাছে যেসব দাবি-দাওয়া জানিয়ে জনযুদ্ধের প্রেক্ষাপট তৈরি করেছিলেন, প্রধানমন্ত্রী হয়ে নিজে সে পথে তেমন হাঁটেননি। তিনি জনযুদ্ধের খুনিদের নেতা হিসেবে বরাবরই সমালোচিত। পিস্তলের ব্যবহার করেছেন। কিন্তু বিতর্কিত মূত্রপাতের কোনো অভিযোগ তার বিরুদ্ধে নেই।

আমার শৈশবে দেখা একজন অবাঙালি জাদুকরের নাম বাবুরামাইয়া, তার পদবি কি জানার দরকার তখন ছিল না; তিনি যে ভাষায় কথা বলতেন, তা উর্দু না হিন্দি, না অন্য কিছু মনে নেই, তবে বাংলা যে নয়, এটা নিশ্চিত। তিনি হাতে ডুগডুগি রাখতেন এবং বাজাতেন। তার সঙ্গে থাকতেন গলায় দড়িবাঁধা একজন। তিনি বলতেন এবং তাকে ডাকতেন মিনিস্টার সাহেব। এটি ছিল ছাল ওঠা একটি বানর। বাবুরামাইয়া দু-একটা ভেলকি দেখানোর পর কামরূপ-কামাখ্যা থেকে শিখে আসা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জাদুটি প্রয়োগ করলেন মিনিস্টার সাহেবের ওপর। তাতে বানরের অণ্ডকোষ থেকে দুটি বিচি (পরে বুঝেছি টেসটিস-শুক্রাশয়) গায়েব করে দিলেন এবং হুমকি দিলেন, জাদু দেখার পয়সা না দিয়ে যদি কেউ চলে যায়, বাসায় গিয়ে দেখবে তার দুটিও গায়েব। আমি তাকে এতটাই বিশ্বাস করেছিলাম যে, আমি চাইনি আমার অবস্থা মিনিস্টার সাহেবের মতো হোক। দু-চারজন পয়সা দিল, দু-চারজন জাদুর বাতাস লাগার আগেই ছুট দিল। আর আমার পকেট খালি থাকায় প্যান্টের ওপর দিয়ে দুহাতে চেপে ধরে কাঁদতে শুরু করলাম। বাবুরামাইয়ার মন্ত্রী ও আমি বিপন্ন দৃষ্টিতে পরস্পরের দিকে তাকিয়ে রইলাম।

আমি তওবা, আস্তাগফিরুল্লাহ পাঠ করে সিদ্ধান্ত নিলাম বেঁচে থাকতে আর বাবুরামের নাম মুখে নেব না। কিন্তু ভয় হচ্ছে, হালে ভারতীয় সংস্কৃতির কত কিছুই না আমাদের সংস্কৃতিতে আত্তীকৃত করে নিয়েছি, মন্ত্রীদের কেউ না আবার ওখানকার বাবুরামদের মতো ক্যামেরায় ধরা পড়ে যান!

লেখক : কথাসাহিত্যিক ও অনুবাদক