প্রাচ্যের অক্সফোর্ড নামে খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, পরবর্তীকালে প্রতিষ্ঠিত বিভাগীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও একসময় শিক্ষা ও শিক্ষকদের নিয়ে মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত ছিল। বিজ্ঞান প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকৌশল শিক্ষায়তনের সেরা মুকুটপরা বুয়েট বহু স্বনামখ্যাত কৃতী ছাত্র সৃষ্টির উৎস। তারা জীবনে-পেশায় সর্বোচ্চ পদে অধিষ্ঠিত। নাম উল্লেখ করতে গেলে অনেক খ্যাতিমানের নাম উঠে আসবে জীবিত বা প্রয়াত। কোথায় গেল সেই শিক্ষার পরিবেশ, শিক্ষায়তনে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ঢাকাসহ একাধিক বিভাগীয় শহরে প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর? অবশ্য জামায়াত-শিবির ও দূষিত জাতীয় রাজনীতির কল্যাণে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্র-শিক্ষকদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হতে শুরু করে বেশ কিছুকাল আগেই, বিশেষ করে রাজশাহী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় দুটিকে কেন্দ্র করে।
সেসব বিষাক্ত বীজ থেকে উদ্ভূত বিষাক্ত চারাগাছ শেষ পর্যন্ত বিষঝাড়ে পরিণত। এবং তা সব রাজনৈতিক দলের আশ্রয়ে, প্রশ্রয়ে, পৃষ্ঠপোষকতায়। হলগুলোর আধিপত্য নিয়ে মাস্তানি, মাস্তানি থেকে রক্তাক্ত, সন্ত্রাসীপনা, নির্যাতন বিশ^বিদ্যালয়গুলোর শিক্ষায়তনিক বৈশিষ্ট্য হয়ে দাঁড়ায়। এমনকি বাদ যায় না খুন। শিক্ষার্থীর হাতে বইয়ের বদলে ছুরি, হকিস্টিক, লাঠি, এমনকি সর্বাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র। কী চমৎকার! পরিস্থিতি পরিবেশের বিশদ বিবরণে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। কারণ এসব ঘটনাচিত্র সবারই জানা, লেখালেখিও কম হয়নি। তবে দুর্ভাগ্যজনক, এর মধ্যে কাঁটাগাছ হয়ে দাঁড়ায় শিক্ষকদের ব্যক্তিস্বার্থ, কখনো দল-মতভিত্তিক তথাকথিত শিক্ষক রাজনীতির দ্বন্দ্ব, যা শিক্ষার্থীদের দূষণ মানসিকতার সহায়ক হয়েছে। শিক্ষক তার শিক্ষাদর্শ ভুলে আত্মস্বার্থে মগ্ন।
আরও দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা যে, ছাত্ররাজনীতি এ দেশে একসময় গর্ব ও অহংকারের বিষয় ছিল, সেই ছাত্ররাজনীতিকে দূষণ ও অনাচারে কলঙ্কিত করা হয় এমনই মাত্রায় যে, একসময় শিক্ষার্থীদের অভিভাবকরা ছাত্ররাজনীতির প্রবল বিরোধী হয়ে ওঠেন কে চায় তার সন্তানের অনাচার বা অপমৃত্যু? সুধীসমাজে শুরু হয় সমালোচনা নানা ধারায়। তর্কবিতর্ক, ভিন্নমতে রাজনীতি, ছাত্ররাজনীতির পানি ঘোলা হয়ে ওঠে।
২. এতসব দূষণ-আলামতের পরিপ্রেক্ষিতে কী করছিলেন সংশ্লিষ্ট বিশ^বিদ্যালয় প্রশাসন উপাচার্য, প্রভোস্ট ইত্যাদি সম্মানজনক নামের কর্তাব্যক্তিরা। তারা কি জানতেন না, হলগুলোতে রাজনীতির নামে কীসব ন্যক্কারজনক ঘটনা ঘটছে। র্যাগিংয়ের নামে নতুন নিরীহ ছাত্রদের অমানবিক নির্যাতন? ছাত্রীদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা বিঘিœত? বড় ভাই-মেজো ভাই-ছোট ভাইয়ের দাপটে তারা শঙ্কিত, ভীত এমনকি কখনো লাঞ্ছিত (মূলত যৌন লাঞ্ছনা)।
সব জেনেশুনেও তারা মুখ বন্ধ করেছিলেন কেন? হাত গুটিয়ে বসেছিলেন কেন? মর্যাদাপূর্ণ পদ হারাবেন বলে? নাকি রাজনৈতিক শাসনের ভয়ে? তারা কি বিশ্ববিদ্যালয়ের পবিত্র শিক্ষকতার পেশায় যোগ দিয়েছিলেন ব্যক্তিস্বার্থে রাজনীতির লেজুড়বৃত্তি করবেন বলে? বিত্ত সম্পদের অবৈধ অর্জনের লোভে?
না, তারা তাদের শাসনক্ষমতার বৈধ ব্যবহার করতে এগিয়ে আসেননি। শিক্ষাঙ্গন থেকে আবর্জনা ও জঞ্জাল সাফ করার প্রথাসিদ্ধ দায় পালনে অগ্রসর হননি। ভিন্নমতের সমালোচনা তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়েছেন। প্রশাসনের সর্বোচ্চ পদাধিকারী উপাচার্য, যার পদটি সর্বাধিক সম্মানজনক ও মর্যাদাব্যঞ্জক, তিনি এ বিষয়ে তার দায়িত্ব পালনে চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছেন। কোনো ছাত্রের জীবনের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়া বা কখনো কারও প্রাণহানি তাকে বা তার অনুসারীদের বিচলিত করেনি অথবা সাহস হয়নি দুর্বৃত্ত রাজনীতিক ছাত্রদের দুষ্কৃতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে। তাদের নাকের ডগায় ছাত্র নামের কিছুসংখ্যক দুর্বৃত্তের রাতভর অনাচার চলেছে। তিনি এবং তারা শান্ততে বিশ্রামরত কিংবা নিদ্রামগ্ন। এমন পরিস্থিতিতেই ভিন্নমতের বা বিরোধী দলের ছাত্র হত্যার মতো ভয়াবহ ঘটনা বিশ^বিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ঘটতে পারে এবং ঘটেছেও। এক নয়, একাধিক। সর্বশেষ ঘটনাটি মর্মান্তিক। এই কদিন আগে। বীভৎস, পৈশাচিক নির্যাতনে বুয়েটের মেধাবী ছাত্র আবরার ফাহাদ হত্যা।
আবরার হত্যা নিয়েও বিশদ বিবরণে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। ইতিমধ্যে দৈনিক পত্রিকাগুলোতে, টিভিতে, ফেইসবুকে এত শিউরে ওঠা বিবরণ প্রকাশ পেয়েছে, যা নিয়ে পুনরুক্তি নি®প্রয়োজন। আমাদের এ আলোচনার লক্ষ্য আর কিছু নয়, সার্বিক বিষয়ে, দীর্ঘদিনের অনাচারের জবাবদিহি বিশ^বিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে। তারা আত্মপক্ষ সমর্থনে কী বলতে চান মৃত্যু, নির্যাতন, ছাত্রীদের যৌন লাঞ্ছনার মতো ঘটনায়? এক ঘটনা থেকে বহু ঘটনার জবাব। ভাবা যায়, প্রাচ্যের অক্সফোর্ডের ছাত্রাবাসে ছাত্র নামধারী সন্ত্রাসীদের স্থাপিত নির্যাতন কক্ষ? আবরার হত্যা যে কারণেই হোক, অনেকগুলো প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে, অনেক ভীতিপ্রদ সত্যের উন্মোচন ঘটিয়েছে, প্রশাসনের চরম ব্যর্থতার দায় তুলে ধরেছে। সাধারণ ছাত্রদের প্রতিবাদে ঐক্যবদ্ধ করেছে এবং আরও অনেক ইতিবাচক কিছু। যে সাংবাদিকদের অনুসন্ধানী প্রতিবেদন গুচ্ছ ছিল, সেখানে উঠে এসেছে ভয়াবহ শিরোনাম : ‘অর্ধশত টর্চার সেল ঢাবির ১৩ হলে’। বিশ্বাস করা কঠিন।
শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েই নয়, সর্বোচ্চ কারিগরি বিশ^বিদ্যালয় বুয়েটেও একই অবস্থা। খবরগুলো বেরিয়ে এসেছে আবরার হত্যার বিস্ফোরক পরিস্থিতি ও সংবাদপত্র ভুবনে আলোড়নের কারণে। কিন্তু হল তত্ত্বাবধায়ক পদত্যাগ করলেও উপাচার্য বহাল তবিয়তে তার স্বস্থানে আসীন। অথচ ছাত্রদের অন্যতম দাবি ছিল উপাচার্যের পদত্যাগ। ওখানকার শিক্ষক সমিতিও উপাচার্যের ব্যর্থতার কথা স্বীকার করে পদত্যাগ দাবি করেছে। এই অনাচার ছাত্ররাজনীতির নামে দুর্বৃত্তপনা সব বিশ্ববিদ্যালয়ে কমবেশি উপস্থিত বলে অভিযোগ রয়েছে। আবরার হত্যা উপলক্ষে একটি দৈনিকের সংবাদ শিরোনাম : ‘ছাত্রলীগের নৃশংসতার শেষ কোথায়’। আরও লেখা হয়েছে ‘প্রায় ১১ বছর ধরে ছাত্রলীগ মূলত আলোচনায় এসেছে হত্যা, চাঁদাবাজি, ছিনতাই কিংবা টেন্ডারবাজির কারণে’। এ বিষয়ে বিশদ বিবরণ রয়েছে প্রতিবেদনটিতে।
লক্ষ করার বিষয় যে, আবরার হত্যার পর থেকে প্রতিদিন অধিকাংশ দৈনিক পত্রিকায় এ বিষয়ে নানা ধরনের খবর প্রকাশিত হচ্ছে। তাতে বিরাজমান অবস্থার ভয়াবহতা নানা চরিত্রে বেরিয়ে আসছে। টর্চার রুমের বিবরণ থেকে নিয়মিত ছাত্র লাঞ্ছনা, ভিন্নমতাবলম্বীদের টর্চার সেলে নির্যাতন ইত্যাদি। এসব নিয়ে সাধারণ ছাত্ররা মুখ খুলতে শুরু করছে, প্রকাশ করছে তাদের লাঞ্ছনার কথা। বড় ভাইদের সালাম না দিলে পিটুনি, জুতাপেটা থেকে অনেক কিছু। দুর্বৃত্তদের দাপটে তারা তটস্থ। এটা কি বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠদান ও পাঠ গ্রহণের সুষ্ঠু পরিবেশ? যে পরিবেশ অর্থাৎ সুস্থ, নিরাপদ পরিবেশ রক্ষার প্রধান দায়িত্ব উপাচার্য ও তার সহকারী প্রশাসকদের। তারা এসব দেখেও দেখেননি। এখনো একটি সত্যিকার তথ্যভিত্তিক জবাবদিহিমূলক জবানবন্দি আসেনি উপাচার্যের তরফ থেকে। হয়তো তার খুঁটি শক্ত। তাই তিনি নির্বিকার। ছাত্রদের আন্দোলন তিনি বড় একটা আমলে আনছেন না। আমরা এর আগেও ভিন্ন প্রসঙ্গে লিখেছিলাম, আবরার হত্যা ঠেকানোর ব্যর্থতার দায় স্বীকার করে উপাচার্যের পদত্যাগ করা উচিত।
কিন্তু তিনি তা করছেন না। অন্যদিকে অপরাধী ছাত্রদের বুয়েট থেকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কারও করা হয়নি, সাময়িক বহিষ্কারে বিষয়টিকে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। বুয়েটে এখন ‘অনিশ্চয়তার অচলাবস্থা’। ছাত্ররা চাচ্ছে দ্রুত তদন্ত, চার্জশিট ও বিচার। কিন্তু পুলিশ তার নিয়মতান্ত্রিক পদ্ধতিতে চলতে অভ্যস্ত। প্রধানমন্ত্রী অবশ্য সবকিছুর দ্রুত ফয়সালার পক্ষে কথা বলেছেন। আশ্বস্ত করেছেন আবরারের মাকে কাছে টেনে। কিন্তু পুলিশ প্রশাসন কি সেসব আবেগের ধার ধারে? আমরা জানতে চাই, টর্চার সেলগুলোর কী হলো? ওগুলো যারা চালাত তাদের সবাইকে কি আটক করা হয়েছে? শুধু দুটি রুম সিলগালাতে সব সমস্যা মিটবে? আবরার হত্যার ভয়ংকর রাতের মর্মান্তিক ছয় ঘণ্টার সময় পর্বে কী করছিল সেখানকার প্রশাসন? তাদের কি কেউ ওই ভয়ংকর খবরটি দেয়নি? দিয়ে থাকলে তারা আসেননি কেন? সর্বোপরি বুয়েটসহ বিভিন্ন বিশ^বিদ্যালয়ের এ জাতীয় মিনি শাসনের অনাচার, দুর্বৃত্তপনা, সন্ত্রাসীপনার স্থায়ী অবসানের জন্য প্রশাসন, বিশেষ করে উপাচার্যরা কী ব্যবস্থা নিচ্ছেন বা নেওয়ার পরিকল্পনা করেছেন, তা জানার অধিকার শুধু ছাত্রদেরই নয়, তাদের অভিভাবকসহ সাধারণ নাগরিক সবারই আছে। বিশ^বিদ্যালয় জাতীয় প্রতিষ্ঠান। এর দূষণ-দুর্নীতি-অনাচার-নৈরাজ্যসহ প্রতিটি অব্যবস্থাপনার দায় তো প্রশাসনের। তাই ব্যবস্থাপনাসহ সবকিছু প্রশ্নের জবাব তারাই দেবেন।
লেখক
ভাষা সংগ্রামী ও রবীন্দ্র গবেষক