বাংলা ভাষায় ব্যক্তিকে সম্বোধনে তুই, তুমি ও আপনি তিন ধরনের শব্দ ব্যবহার হয়ে থাকে। হিন্দি ও উর্দু ভাষায়ও তিন ধরনের সম্বোধন রয়েছে। ইংরেজি ভাষায় কেবল ‘ইউ’ দিয়েই সব ব্যক্তিকে সম্বোধন করা হয়। বিশে^র বিভিন্ন ভাষায় ইংরেজির আদলে একটিই শব্দ প্রয়োগে ব্যক্তিকে সম্বোধন করার কথা জানা যায়। বাংলা, হিন্দি ও উর্দু ভাষা উপমহাদেশের তিনটি পৃথক রাষ্ট্রের রাষ্ট্রভাষা ও সরকারি ভাষা হিসেবে বহাল রয়েছে। উপমহাদেশে ওই তিন ভাষাই প্রধান ভাষারূপে প্রচলিত। আমাদের দেশে অঞ্চলভেদে অনেক আঞ্চলিক ভাষা রয়েছে। আঞ্চলিক ভাষাগুলোয় দেখা যায়, ব্যক্তি সম্বোধনে আপনির স্থলে তুমি ও তুই সর্বাধিক প্রচলিত। ‘আপনি’ প্রাতিষ্ঠানিক সম্বোধন হয়ে থাকে। পরিবারে, সামাজিক জীবনে আঞ্চলিক ভাষায় সম্বোধন ‘তুমি’ ও ‘তুই’ নির্ভর। মাতৃভাষা বাংলার ক্ষেত্রে অতীতে অমনটি ছিল না, কিন্তু কালক্রমে এখন ‘আপনি’ সম্বোধনের পরিধি প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষেত্রেই সর্বাধিক ব্যবহৃত হচ্ছে। পরিবারে, সামাজিক পরিসরে ‘তুমি’ জায়গা করে নিয়েছে। বয়োজ্যেষ্ঠ কাউকে অতীতে ‘তুমি’ সম্বোধন ভাবাই যেত না। এমন কি বাবা, মাকে পর্যন্ত আপনি সম্বোধনের রেওয়াজ ছিল সর্বাধিক। পাকিস্তানি আমলে উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তানরা বাবা-মাকে তুমি সম্বোধন করলেও মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্তদের ক্ষেত্রে ‘আপনি’ সম্বোধন ছিল অনিবার্য।
স্বাধীনতার পর আমাদের সংস্কৃতিগত পরিবর্তন ঘটে। মধ্যবিত্ত শ্রেণি ক্রমাগত স্ফীত যেমন হয়েছে, তেমনি অর্থনৈতিক ও জীবনযাপনে উন্নত হয়ে ওঠার ফলে সংস্কৃতির ব্যাপক পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে। নিম্নমধ্যবিত্তদের মধ্যেও সেটা সম্প্রসারিত হয়। ফলে পাকিস্তানি আমলে মধ্য ও নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণির সন্তানরা পিতা, মাতাকে ‘আপনি’ সম্বোধন করলেও, পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে তাদের সম্বোধন ‘তুমি’তে নেমে আসে এবং এর সম্প্রসারণ ঘটেই চলেছে। অখ- বাংলার অপরাংশ পশ্চিম বাংলায় মধ্যবিত্ত শ্রেণির বিকাশ ঘটে ব্রিটিশ শাসনামলে। সে কারণে পশ্চিম বাংলায় ‘আপনি’ প্রাতিষ্ঠানিক সম্বোধন বহুকাল থেকেই রয়েছে। পারিবারিক ও সামাজিক পরিসরে তুমি এবং আপনি পূর্বেই সম্বোধন হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছিল। পূর্ব বাংলার মধ্যবিত্তের যাত্রা শুরু ১৯৪৭ সালের পরে। পাকিস্তানের প্রাদেশিক রাজধানী হওয়ার ফলে মফস্বল সদৃশ্য পূর্ব বাংলার সর্বক্ষেত্রে পরিবর্তনের সূচনা ঘটে। নাগরিক জীবনে আধুনিকায়ন শুরু হয় ১৯৫০ সালের পর থেকেই। অবকাঠামো, যাতায়াত, আবাসন, পৌর সুবিধা ইত্যাদি। তবে পাকিস্তানি রাষ্ট্রাধীনে বাঙালিরা এক নতুন পাকিস্তানি উপনিবেশিক শাসনের অধীনে ছিল বিধায় বাঙালি মধ্যবিত্তদের বিকাশটা ধীরগতিতে এগোয়। ১৯৭১-এর স্বাধীনতার পর সেটা দ্রুত খোলনলচে পাল্টে প্রবলতর এগিয়ে যায়। নিম্নশ্রেণি থেকে হঠাৎ মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত শ্রেণিতে পরিণত হওয়ার অসংখ্য দৃষ্টান্ত পরিলক্ষিত হয়। শ্রেণিগত এই উত্তরণ কেবল স্বাধীনতার পরই সীমাবদ্ধ থাকেনি। দেশের প্রতিটি রাজনৈতিক বাঁকে এই পরিবর্তনে শ্রেণি উত্তরণের ধারাবাহিকতা অবিরাম চলে এসেছে।
আমাদের ওই তিন পৃথক সম্বোধনের ক্ষেত্রে সর্বাধিক ক্রিয়াশীল কোনটি এবং কেন? কেন আমরা ভিন্ন ভিন্ন ব্যক্তিকে ভিন্ন ভিন্ন বাক্য ব্যবহারে সম্বোধন করে থাকি। প্রশ্নের গভীরে যদি আমরা তাকাই তবে দেখব এর পেছনে সর্বাধিক ক্রিয়াশীল হচ্ছে শ্রেণি বা শ্রেণিগত অবস্থান। স্বীকার করতে হবে আমাদের শ্রেণি-বিভক্ত সমাজে ব্যক্তি সম্বোধন অনিবার্যরূপে শ্রেণিভিত্তিক। সাধারণভাবে বয়োজ্যেষ্ঠদের আপনি বলা হলেও শ্রেণি প্রশ্নে কিন্তু সেটা মান্যতা পায় না। অধীনস্থদের বেলায় যেমন, তেমনি বাড়ির কাজের লোক, মজুর, শ্রমিক, রিকশাচালক, পথের হকার হতে নিম্নপেশায় নিয়োজিতদের আমরা অনায়াসে তুই, তুমি সম্বোধন করে থাকি। বয়োজ্যেষ্ঠের কোনোরূপ বিবেচনা করি না। তাই আমাদের ভাষার ওই তিনটি সম্বোধন অনিবার্যই শ্রেণির মাপকাঠিতে নির্ধারিত হয়ে আছে। শ্রেণি যে কতটা শক্তিধর এক্ষেত্রে তার প্রমাণ পাওয়া যায়। কেবল আমাদের দেশেই নয়, উপমহাদেশের অপর দুই রাষ্ট্রের হিন্দি ও উর্দু ভাষায়ও তুই, তুমি ও আপনি’র প্রয়োগ শ্রেণিভিত্তিক হয়ে থাকে। সমশ্রেণির কিংবা অপেক্ষাকৃত উচ্চশ্রেণির বয়োজ্যেষ্ঠদের বেলায় ‘আপনি’ সম্বোধন করা হলেও, নিজের থেকে অপেক্ষাকৃত নিম্নবর্তী শ্রেণির বয়োজ্যেষ্ঠদের অনায়াসে তুই, তুমি সম্বোধন করা হয়ে থাকে, আপনি নয়।
কোনো মানুষই সংস্কৃতিবিহীন নয়। জাতীয়তা এবং শ্রেণির ভিন্নতায় সংস্কৃতির রকমফের নিশ্চয় রয়েছে। তারপরও স্ব স্ব অবস্থানের ভিত্তিতে সংস্কৃতির বলয়ের মধ্যেই প্রতিটি মানুষের অবস্থান বিরাজ করে।
সংস্কৃতি স্থির অনড় নয়। সংস্কৃতির যুগ, কাল এবং অর্থনৈতিক কারণে বিবর্তিত হয়। তাই মানুষের আদিম সংস্কৃতি সভ্যতার রূপান্তরের মধ্য দিয়ে পরিবর্তিত হয়ে এসেছে, ভৌগোলিকভাবে সব দেশে ও সমাজে। প্রত্যেকটি জাতি নিজ নিজ ভূখ-ের
সংস্কৃতির ওপর ভিত্তি করেই গঠিত হয়েছে। ভাষাও যেমন বিবর্তনের মধ্য দিয়ে বিকশিত হয়, তেমনি সংস্কৃতিও নির্দিষ্ট গ-িতে কখনো সীমাবদ্ধ নয়।
সংস্কৃতি বিকাশমান। প্রতিনিয়তই সংস্কৃতির রূপ-পরিবর্তন হয়ে থাকে। তাই সংস্কৃতির আদি বা অন্ত বলে বাস্তবে কিছু নেই। এমন কি সংস্কৃতি শ্রেণি-নিরপেক্ষও নয়। সমাজের অগ্র-পশ্চাৎ যে দুটি ধারা বিদ্যমান সেটা শ্রেণিগত কারণেই। একই দেশ ও সমাজে সংস্কৃতির ভিন্নতার পেছনে শ্রেণির ভূমিকা অনিবার্য। শ্রেণিগত কারণে এখনো প্রান্তিকে সকালে পান্তা ভাত খাবার রেওয়াজ রয়েছে। সেটা আদি
সংস্কৃতিকে ভালোবেসে নয়, অর্থনৈতিক কারণে। আমাদের দেশে শহর এবং গ্রামের সুযোগ-সুবিধা হতে চরম বৈষম্যপূর্ণ অসংগতি রয়েছে।
আমাদের সমাজে শাসনের যে প্রক্রিয়াটি চলমান সেটা শ্রেণি-শাসন, শোষণই বটে। শ্রেণি শোষণ ততদিন সক্রিয় থাকবে, যতদিন সমাজ ও রাষ্ট্রে শ্রেণি-বৈষম্য, বিভক্তি অক্ষুণœ থাকবে। তাহলে সমাধানটা কোথায়? সমাধান হচ্ছে ব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটিয়ে শ্রেণিহীন সমাজ প্রতিষ্ঠা করা। অর্থাৎ সব মানুষের অধিকার ও শ্রেণি বিভক্তির বিপরীতে সাম্যের প্রতিষ্ঠা।
লেখক : নির্বাহী সম্পাদক, নতুন দিগন্ত
