দিনাজপুরের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া পুনর্ভবা নদী দখল করে গড়ে উঠেছে অবৈধ বসতবাড়ি। নদীর বিশাল একটি অংশে এখন বাস করছে কয়েক হাজার পরিবার। দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা ওইসব বসতিতে কেউ কেউ করেছেন পাকা ভবনসহ স্থাপনা।
এক সময়ের খরস্রোতা পুনর্ভবা দখলবাজদের কারণে এখন অনেক আঁটসাঁট, হারাচ্ছে স্বকীয়তা। নদীর জমি বিক্রি না হলেও নদীর ওপর ঘরের ‘পজেশন’ বিক্রি করে কেউ কেউ হাতিয়ে নিয়েছে বিপুল টাকা।
দিনাজপুর জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, সদর উপজেলায় পুনর্ভবা দখল করে পাকা, আধাপাকা ও কাঁচা বাড়ির সংখ্যা ৮৩৮টি। দীর্ঘদিন ধরে নদী দখল করে বসতি স্থাপন করা অনেকেই জমির মালিকানা ছাড়াই কিনেছেন এসব ঘরের পজেশন।
অপরদিকে উপজেলা সদর ভূমি অফিসের তথ্যানুযায়ী, পুনর্ভবা নদীতে অবৈধভাবে স্থাপনা তৈরি হয়েছে ৮৩৯টি। এছাড়া সদর উপজেলায় আত্রাই নদীর কিছু অংশ দখল করে ২৫টি পাকা, আধাপাকা ও কাঁচা বাড়ি নির্মাণ করা হয়েছে বলে জানা যায়।
একাধিক হাত বদল করে বেচাবিক্রি হয় এসব পজেশন। সদরের পশ্চিম বালুয়াডাঙ্গা হঠাৎপাড়ার পুনর্ভবা নদী দখল করে ঘরের পজেশন কিনেছেন সুজন ইসলাম। তিনি বলেন, ‘এই ঘরের পজেশন পেয়েছি আমার বাবার কাছে। আমার বাবা কিনেছেন মো. সুলতানের কাছে। সুলতান কিনেছেন আবদুল হাইয়ের কাছে। আবার আবদুল হাই কিনেছেন মো. বারেক ইসলামের কাছে এবং সর্বপ্রথম মো. বারেক ইসলাম কয়েকটি ঘরের পজেশন কিনেছেন মো. সামাদের কাছ থেকে।’
দিনাজপুরের পুনর্ভবা নদীর ধারে বিরাট এলাকাজুড়ে এভাবেই নদীর জমির পজেশন বেচাবিক্রির মধ্য দিয়ে অনেকেই বিপুল টাকার মালিকও হয়েছেন বলে জানান সেখানকার স্থানীয়রা।
সদরের কাঞ্চন এলাকায় ৪ শতক জমির পজেশন কিনেছেন নুরুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘আমি পজেশন কিনেছি বাদল নামের একজনের কাছ থেকে। ৪ লাখ টাকা দিয়ে এই পজেশন কিনেছি। তিনি আরও বলেন, এই পজেশনের লিখিত দলিলও করেছি।’
চাইপাড়া এলাকার বিউটি বেগম বলেন, ‘২০ বছর আগে এখানে কয়েকটি ঘরের পজেশন কিনেছি। আমরা নিয়মিত পৌরসভাকে কর প্রদান করে থাকি।’ পুনর্ভবা নদীতে যারা অবৈধ দখলদারিত্ব নিয়ে আছেন তারা নিয়মিত পৌরসভাকে কর প্রদান করে আসেন বলে জানান তিনি। দেশ রূপান্তরের অনুসন্ধানে দেখা যায়, নদী দখল করে ‘প্রমোদতরী’ নামে বিনোদন কেন্দ্র গড়ে তুলেছেন জাহিদ কামাল সৌদ নামে এক ব্যক্তি। এছাড়া নদীর জায়গায় রয়েছে সুইমিং পুল ও ‘বাগান বিলাস’ নামে আরও দুটি বিনোদন কেন্দ্র।
প্রমোদতরীর স্বত্বাধিকারী জাহিদ কামাল সৌদ বলেন, ‘একটি স্থাপনার অল্প একটু জায়গা নদীর অংশে পড়েছে। আমরা জেলা প্রশাসক ও পানি উন্নয়ন বোর্ডে লিজ নেওয়ার জন্য আবেদন করেছি।’
সুইমিং পুলের স্বত্বাধিকারী আরিফুল ইসলাম ডলার বলেন, ‘এক সময় সুইমিং পুলের জায়গাটা আমাদের ছিল। সেটা নদীতে গিয়ে খাস জমি হয়ে যায়। সুইমিং পুলটি দিয়ে লোকসান গুনতেছি।’
দিনাজপুর পৌরসভার ১০ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর সিদ্রাতুল ইসলাম বাবুও এক সময় নদীর পজেশন বিক্রি করেছেন বলে অভিযোগ করেছেন অনেকেই। এ বিষয়ে সিদ্রাতুল বাবু বলেন, ‘২০-২৫ বছর আগে নদীর অল্প একটু জায়গা নিয়েছিলাম। তবে সেগুলোর বেশিরভাগই মসজিদে দান করেছি। মাত্র কয়েকটা ঘর ২ থেকে ৩ হাজার টাকায় বিক্রি করেছিলাম।’
নদীর অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ অভিযানের বিষয়ে দিনাজপুরের জেলা প্রশাসক মাহমুদুল আলম বলেন, ‘আমাদের কাছে নদী দখলের একটা তালিকা এসেছে। উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনার জন্য বিভিন্ন যন্ত্রপাতি ব্যবহার করার বরাদ্দ চেয়েছি। বরাদ্দ পেলেই উচ্ছেদ অভিযান শুরু করব।’