ভোলার বোরহানউদ্দিনে এক তরুণের ‘হ্যাকড হওয়া’ ফেইসবুক আইডি থেকে মহানবীকে (সা.) নিয়ে অবমাননাকর বক্তব্যের জেরে পুলিশের সঙ্গে ‘তৌহিদী জনতা’র ব্যানারে একদল লোকের সংঘর্ষের ঘটনার সূত্রপাত হয়েছিল তৃতীয় পক্ষের অংশগ্রহণে। কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শীর দেওয়া তথ্যমতে, অনেকটা শান্তিপূর্ণ পরিবেশেই শেষ হচ্ছিল স্থানীয় আলেম-ওলামাদের ডাকা বিক্ষোভ সমাবেশ। তবে ওই কর্মসূচি শেষ হতে না হতেই তৃতীয় পক্ষের অংশগ্রহণে শুরু হয় পুলিশের ওপর হামলা ও ইটপাটকেল নিক্ষেপ। প্রথমদিকে ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটলেও পরবর্তীকালে পাশের দুটি ইউনিয়ন থেকে আসা বিএনপি কর্মীরা লাঠিসোঁটা নিয়ে মাদ্রাসার কক্ষে আশ্রয় নেওয়া পুলিশ কর্মকর্তাদের মারতে দরজা ভাঙার চেষ্টা করে। এ সময় ওই মাদ্রাসার ছাত্র ও শিক্ষকরা প্রথমে হামলাকারীদের বাধা দিলেও পরে তাদের আর নিয়ন্ত্রণ করতে পারেননি। আর এ হামলার নেতৃত্বে বোরহানউদ্দিন উপজেলা ছাত্রদল সভাপতি আশরাফুল ইসলাম সবুজসহ বিএনপি কর্মীদের একটি দল ছিল বলে দেশ রূপান্তরের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। ফেইসবুকে ভাইরাল হওয়া কয়েকটি ভিডিওতেও তার প্রমাণ মিলেছে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও প্রত্যক্ষদর্শীরা দেশ রূপান্তরকে জানান, প্রতিবাদ সমাবেশটি প্রথমে স্থানীয় ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের অংশগ্রহণে শুরু হলেও তা একসময় আয়োজকদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। উপজেলার দুটি ইউনিয়ন কাচিয়া ও পক্ষীয়া থেকে আসা বিএনপি ও ছাত্রদলের শত শত নেতাকর্মী সেখানে উপস্থিত হয়ে পুলিশের অনুরোধে সমাবেশ সমাপ্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় আয়োজকদের ওপর চড়াও হয়। এখান থেকেই ছড়াতে শুরু করে উত্তেজনা। পুলিশ কর্মকর্তারা বিক্ষোভকারীদের শান্ত থাকার উদ্দেশ্যে বক্তব্য দিয়ে মঞ্চ ত্যাগ করার পরপরই শুরু হয় পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ।
সংঘর্ষের ঘটনায় ফেইসবুকে ভাইরাল হওয়া ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, বোরহানউদ্দিন ঈদগাহ মাঠে প্রতিবাদ সমাবেশের একপর্যায়ে একদল মানুষ পুলিশের ওপর চড়াও হয়। ওই মাঠটির পাশেই মার্কাস মসজিদ। হামলাকারীরা যাতে সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠতে না পারে সেজন্য মুসল্লিরা আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছেন বাধা দিতে। কিন্তু এরপরও কিছু অল্প ও মধ্যবয়সী যুবক দোতলায় ঢুকে পড়ে। নিচে লাঠিসোঁটা নিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে আরেক দল লোক। তারা একপর্যায়ে লাঠিগুলো ওপরে ছুড়ে দেয় হামলাকারীদের কাছে। এ সময় কিছু যুবক ওই লাঠিগুলো নিয়ে সেখানে তাণ্ডবে মেতে উঠে। মসজিদের ভেতরের কক্ষে তখন আটকা ছিলেন পুলিশ সুপার সরকার মোহাম্মদ কায়সার ও বরিশাল রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি এ কে এম এহসানউল্লাহসহ বেশকিছু পুলিশ সদস্য। প্রাণ বাঁচাতে তারা মসজিদের ভেতরে আশ্রয় নেন। কিন্তু তাদের ওপর হামলা চালাতে কক্ষের দরজা লাঠি দিয়ে পিটিয়ে ভেঙে ফেলা হয়। তখন নিজেদের বাঁচাতে কক্ষ থেকে বের হয়ে গুলি চালায় পুলিশ। এ সময় এক পুলিশ সদস্য গুলিবিদ্ধ হন। ফেইসবুকে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ফুটেজে আরও দেখা যায়, বিক্ষোভ সমাবেশের শুরুতে মাঠের ভেতরে এক তরুণ বিপ্লব চন্দ্র শুভকে উদ্দেশ্যে করে বলতে থাকে ‘ওকে গুলি করে মারে না কা’। স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ওই তরুণ হলেন বোরহানউদ্দিন উপজেলা ছাত্রদলের সভাপতি আশরাফ আলী সবুজ।
বোরহানউদ্দিন পৌরসভার মেয়র রফিকুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সেদিনের পুরো ঘটনাটিই ছাত্রদল, যুবদল, ছাত্রশিবির এবং জামায়াতের কর্মীরা ঘটিয়েছে তা এখন প্রমাণিত। ভিডিও ফুটেজ দেখে এদের চিহ্নিত করে বিচারের আওতায় আনা এখন সময়ের দাবি। আপনারা ভিডিও ফুটেজ দেখলেই বুঝবেন যে এই আশরাফ আলী সবুজের নেতৃত্বেই ছাত্রদল কর্মীরা পুলিশের ওপর হামলা চালিয়েছিল।’
ঘটনার সময় পুলিশ যে মসজিদে আশ্রয় নিয়েছিল, ওই মসজিদের ইমাম এবং রবিবারের সমাবেশের অন্যতম আয়োজক জালালউদ্দিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বেলা ১১টায় সমাবেশ শুরু হওয়ার কথা থাকলেও নির্ধারিত সময়ের আগেই পুলিশ তা শেষ করতে বাধ্য করে। এ সময় পুলিশ কর্মকর্তারা বক্তব্য দেন। পুলিশের বক্তব্যে উপস্থিত জনতা আশ্বস্ত হলেও সমাবেশস্থলে পরে এসে যোগ দেওয়া জনতা উত্তেজিত হয়ে পড়ে।’
স্থানীয় বাসিন্দা ও পুলিশের ওপর হামলার প্রত্যক্ষদর্শী জোহেব হাসান বলেন, ‘সমাবেশের আয়োজক বাটামারার পীর সাহেব নামে পরিচিত মহিবুল্লাহ হুজুরকে আটকের গুজব এবং হেলমেট পরা অবস্থায় বিপ্লব চন্দ্র পুলিশের সঙ্গে অবস্থান করছে এমন গুজব ছড়িয়ে জনতাকে উত্তেজিত করা হয়। এ সময় বোরহানউদ্দিন উপজেলা ছাত্রদল সভাপতি আশরাফুল ইসলাম সবুজসহ বিএনপির একটা গ্রæপ হামলার নেতৃত্ব দিয়েছিল।’
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী বোরহানউদ্দিন বাজারের ব্যবসায়ী রঘুনাথ দাস দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ শুরু হওয়ার পর অপরিচিত একদল যুবক কয়েকটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা চালায়। তখন কয়েকজন যুবক আমার সঙ্গে থাকা ১ লাখ ১২ হাজার টাকা ছিনিয়ে নেয়। এসব যুবক কাচিয়া ইউনিয়ন বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মী।’
স্থানীয় ভাওয়াল বাড়ির বাসিন্দা সুজন দে বলেন, ‘হামলার পর আহতদের নিয়ে বোরহানউদ্দিন হাসপাতালের সামনে জড়ো হতে থাকে বিক্ষোভকারীরা। একপর্যায়ে শতাধিক যুবক হাসপাতালের সামনে অবস্থিত ভাওয়াল বাড়িতে প্রবেশ করে মন্দিরে ঢুকে প্রতিমা ভাঙচুর করে। বাধা দিলে ওই বাড়ির কয়েকটি ঘরের আসবাবপত্র ভাঙচুর করে তারা। এ সময় একটি মোটরসাইকেলেও আগুন দেয় ওই দুর্বৃত্তরা।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বোরহানউদ্দিন থানার ওসি এনামুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ঘটনার একপর্যায়ে হামলাকারীদের মধ্যে থেকে পুলিশকে লক্ষ্য করে কয়েক রাউন্ড গুলিও ছোড়া হয়। এতে এক পুলিশ সদস্য গুলিবিদ্ধ হন। এসব অপরাধীকে চিহ্নিত করতে পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কয়েকটি টিম কাজ করছে। শিগগিরই তাদের পরিচয় জানা যাবে।’
অন্যদিকে ভোলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সাফিন মাহমুদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা ভিডিওচিত্র দেখে এবং স্থানীয় সূত্র থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ইতিমধ্যে হামলায় জড়িত প্রায় সবাইকেই চিহ্নিত করেছি। কিন্তু তদন্তের স্বার্থে এখন নাম প্রকাশ করা যাচ্ছে না। তবে শিগগিরই তাদের আইনের আওতায় আনা হবে।’
বোরহানউদ্দিনে সংঘর্ষের ঘটনায় ভোলার স্থানীয় সরকার বিভাগের উপপরিচালক মামুদুর রহমানকে প্রধান করে গঠন করা হয়েছে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি। কমিটির প্রধান মামুদুর রহমান গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে। ভিডিওচিত্র এবং স্থানীয় বিভিন্ন সূত্র থেকে পাওয়া তথ্যগুলো যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। চ‚ড়ান্ত যাচাইয়ের পরই তার ভিত্তিতে জড়িতদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’