চাকরি নিয়ে বিদেশ যাওয়ার জন্য বাধ্যতামূলক বহির্গমন ছাড়পত্র ছাড়াই বিদেশ যাচ্ছে বাংলাদেশি শ্রমিকরা। ব্রনাই ২০ হাজার ভিসা ইস্যু করলেও তাদের মধ্যে তিন-চতুর্থাংশই বহির্গমন ছাড়পত্র নেয়নি। অথচ সব শ্রমিকই তেলসমৃদ্ধ এই দেশটিতে পৌঁছে গেছেন। বিমানবন্দরে ইমিগ্রেশন পুলিশ ও এক শ্রেণির দালালের যোগসাজশে এসব শ্রমিক অবৈধভাবে বিদেশ যাচ্ছে। অথচ জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো থেকে বহির্গমন ছাড়পত্র না নিয়ে ইমিগ্রেশন পার হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। এসব অসাধু তৎপরতার জন্য বাংলাদেশিদের জন্য বিদেশের শ্রমবাজার সংকুচিত হচ্ছে। গত ১২ সেপ্টেম্বর প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন সচিব রৌনক জাহান এক আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় বিষয়টি জানান। প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রী ইমরান আহমদের সভাপতিত্বে ওই বৈঠক হয়। বৈঠকে বিভিন্ন অনিয়ম তুলে ধরে তা প্রতিকারের জন্য সাত দফা সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় মালয়েশিয়ার শ্রমকল্যাণ উইংকে উদ্ধৃত করে জানানো হয়েছে, কর্মসংস্থানের আশায় প্রফেশনাল ভিসা, স্টুডেন্ট ভিসা ও টুরিস্ট ভিসা নিয়ে দেশটিতে গিয়ে বাংলাদেশি শ্রমিকরা কাগজপত্রবিহীন (আনডকুমেন্টড) হয়ে পড়ছে। একপর্যায়ে তারা দণ্ডভোগ করে দেশে ফিরছে। প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়কে লেবাননে বাংলাদেশ মিশন জানিয়েছে, বাংলাদেশের নারীরা টুরিস্ট ভিসায় ওখানে গিয়ে যৌনকাজে লিপ্ত হচ্ছে। বাহরাইনে শ্রম উইং জানিয়েছে, গত বছর একজন প্রবাসী আমের আচারের মধ্যে মাদক ভরে তা সেখানে নিয়ে যায়। তার এ অভিনব মাদক পাচারের সচিত্র সংবাদ স্থানীয় গণমাধ্যমে ফলাও করে প্রকাশ করা হয়।
দালাল চক্রের যোগসাজশে কিছু বাংলাদেশি নাগরিক ও কয়েকটি এজেন্সি উচ্চমূল্যে ভিসা কেনাবেচা করে, ভুয়া ভিসা তৈরি করে। অনেক সময় তথাকথিত ফ্রি ভিসায় কর্মী পাঠায়। ব্রæনাই, মালয়েশিয়া ও লিবিয়ায় মিশন বাংলাদেশ থেকে যারা এগুলো করছে তাদের নাম-ঠিকানা পাঠিয়েছে। সেসব ঠিকানা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে বলে বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। এছাড়াও এসব অনিয়ম প্রতিরোধের জন্য ছয় দফা সিদ্ধান্ত হয়। কর্মসংস্থানের জন্য কোনো ব্যক্তি যেন স্টুডেন্ট বা টুরিস্ট ভিসায় বিদেশ যেতে না পারে বিমানবন্দর ইমিগ্রেশন তা নিবিড়ভাবে তদারকি করবে। বিশেষ করে মালয়েশিয়া, ব্রæনাই, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও মালদ্বীপে কর্মসংস্থানের জন্য স্টুডেন্ট বা টুরিস্ট ভিসায় কেউ যাচ্ছে কি না তার জন্য নজরদারি বাড়ানোর নির্দেশনা দেওয়া হয় ইমিগ্রেশন পুলিশকে। বিমানবন্দরে বিদেশগামী যাত্রীরা মাদক বহন করছে কি না তা যাচাই করার জন্য তল্লাশি জোরদার করা হবে। এসব কাজে প্রয়োজনীয় জনবল, যন্ত্রপাতি ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করবে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর। বিদেশের বাংলাদেশি মিশন কর্মসংস্থানের জন্য চাহিদাপত্রসহ বিভিন্ন কাগজপত্র সত্যায়নের জন্য একটি নীতিমালা করবে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়। মানবপাচার বা অবৈধভাবে বিদেশ যাওয়াসহ অবৈধ অভিবাসন প্রতিরোধ করার জন্য ভিজিলেন্স টাস্কফোর্স পরিচালনা করবে প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়।
প্রবাসীরা দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রাখলেও দীর্ঘদিনেও এ সেক্টরে শৃঙ্খলা আসেনি। নিয়মনীতির আওতায় এলে এবং কর্মীদের প্রশিক্ষণ দিয়ে বিদেশ পাঠাতে পারলে দেশে রেমিট্যান্সের প্রবাহ আরও বাড়বে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা প্রকাশ করেন। শৃঙ্খলার মধ্যে না আনতে পারলে প্রতি বছর শ্রমিক পাঠানোর হার যেভাবে কমছে তা একসময় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়াবে বলে তারা মনে করেন।
গত সোমবার মন্ত্রিসভা বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কার্যবলি সংক্রান্ত বার্ষিক প্রতিবেদন অনুমোদন করেছে। অর্থবছরভিত্তিক ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগের বছরের তুলনায় গত বছর বিদেশে শ্রমিক পাঠানোর হার কমছে। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে বিদেশে শ্রমিক গিয়েছে ৬ লাখ ৫৯ হাজার ১২৯ জন। অথচ তার আগের বছর ২০১৭-১৮ অর্থবছরে শ্রমিক গিয়েছে ৮ লাখ ৭৮ হাজার ১৬১ জন। আগের বছরের তুলনায় গত বছর প্রায় ৩৩ শতাংশ শ্রমিক কম গেলেও রেমিট্যান্সের প্রবাহ কমেনি। বরং তা ৮ শতাংশ বেড়ে ১৬ দশমিক ৪২ বিলিয়ন হয়েছে।
প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান সচিব সেলিম রেজা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আগে অদক্ষ শ্রমিক বিদেশ পাঠানো হতো। এখন যতটা সম্ভব দক্ষ শ্রমিকদের বিদেশ পাঠানো হয়। এ কারণেই জনবল কম গেলেও রেমিট্যান্স বেড়েছে। এখনো অদক্ষ শ্রমিকরা বিদেশ যাচ্ছে। তাদের দ্রæত দক্ষ করতে পারলে রেমিট্যান্স আরও বাড়বে। বিদেশগামী শ্রমিকদের দক্ষ করার জন্য নানা ধরনের প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু করা হয়েছে। শিগগিরই এসব কর্মসূচির ফলাফল আমরা পাওয়া শুরু করব।’
গত অর্থবছরের পর আরও তিন মাস পার হয়েছে। এই তিন মাসেও শ্রমিক পাঠানোর হার নিম্নগামী। গত জুলাই মাসে শ্রমিক গিয়েছে ৫২ হাজার ৫৮ জন। অথচ ২০১৮ সালের জুলাই মাসে শ্রমিক গিয়েছিল ৫৮ হাজার ৬২৭ জন। গত আগস্ট মাসে শ্রমিক গিয়েছে ৩২ হাজার ২৭২ জন। ২০১৮ সালের আগস্টে শ্রমিক গিয়েছিল ৪৯ হাজার ৭২৭ জন। গত মাসে অর্থাৎ সেপ্টেম্বরে শ্রমিক গিয়েছে ৫৩ হাজার ১৮১ জন। গত বছর সেপ্টেম্বরে শ্রমিক গিয়েছিল ৫৫ হাজার ৩৭ জন।
নিজেদের বেকারত্ব কমাতে ১২ ধরনের কাজে বিদেশি শ্রমিক আর নেবে না সৌদি আরব। এসব কাজে নিয়োজিত পুরনোরা দেশে ফিরে আসছেন। ইয়েমেনের সঙ্গে যুদ্ধ ও অভ্যন্তরীণ নানা সংস্কারের কারণে সৌদি আরবের অর্থনীতি চাপের মধ্যে রয়েছে। এ কারণে বিদেশি শ্রমিক না নিয়ে স্থানীয়দের নিয়োগ দেওয়ার ওপর জোর দিচ্ছে মধ্যপ্রচ্যের এ দেশটি। বিদেশিদের সেবা নেওয়া ও জনশক্তি ব্যবসায়ের ওপর দেশটি উচ্চহারে শুল্ক আরোপ করেছে। সৌদি কর্তৃপক্ষ বিদেশিদের মোবাইল ফোন ও ইলেকট্রনিকসসহ কয়েকটি ব্যবসা পরিচালনার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। গত ৯ মাসে দেশটিতে ২ লাখ ৬৮ হাজার ১১২ জন শ্রমিক গিয়েছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাত বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম শ্রমবাজার। ২০১২ সালে বিধিনিষেধ আরোপ করে ওই দেশের সরকার। এরপর গত বছর আমিরাতের শ্রমবাজার খুলে দেওয়ার কথা বলা হলেও কার্যত সেখানে বাংলাদেশি শ্রমিক যেতে পারছে না। গত তিন মাসে দেশটিতে গিয়েছে মাত্র ২ হাজার ৪০৩ জন। ২০০৭ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত ব্যাপক হারে বাংলাদেশি শ্রমিকরা আমিরাতে যায়। কিন্তু ওই সময় শ্রমিক নিয়োগে অসততার আশ্রয় নেওয়া হয়। বাংলাদেশিরা ওই সময় নানা অনিয়মে জড়িয়ে পড়ে। আমিরাতের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে গত বছর একটি সমঝোতা হয়। কিন্তু তারপরও কেন জনবল পাঠানো যাচ্ছে না তা বলতে পারছেন না প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা।
মালয়েশিয়া : প্রায় বন্ধ হয়ে আছে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার। গত ৯ মাসে দেশটিতে গেছে মাত্র ৩৬০ জন। অথচ গত বছর সেখানে গিয়েছিল ১ লাখ ৭৫ হাজার ৯২৭ জন। ১০টি শ্রমিক নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের সিন্ডিকেট এবং শ্রমিকদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগে বাংলাদেশ থেকে শ্রমিক নেওয়া বন্ধ করেছে মালয়েশিয়া। মাহাথির মোহাম্মদের নেতৃত্বাধীন সরকার এ খাতে সংস্কার করছে। সংস্কার পর্ব পার হয়ে নেপাল নতুন করে চুক্তি করলেও বাংলাদেশ এখনো সেই চুক্তিতে পৌঁছতে পারেনি।
প্রবাসীকল্যাণ সচিব সেলিম রেজা বলেন, ‘আমরা নতুন বাজারের খোঁজ করছি। জাপানে শ্রমিক যাওয়া শুরু হয়েছে। অনেক শ্রমিক জাপানে যাওয়ার জন্য প্রশিক্ষণ নিচ্ছে। আশা করি জাপান ভালো একটা বাজার দাঁড়াবে। কম্বোডিয়া ও চীনে শ্রমিক পাঠানো শুরু হয়েছে। বিশেষ করে কম্বোডিয়ায় নির্মাণশ্রমিকের অনেক চাহিদা। আর আশার কথা হচ্ছে, পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোতেও নির্মাণশ্রমিক পাঠানোর সুযোগ রয়েছে। আমরা চেষ্টা করছি সেসব দেশে শ্রমবাজার সৃষ্টি করতে।’