রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন গ্যাস কোম্পানি তিতাসের সাবেক এমডি প্রকৌশলী মীর মসিউর রহমানসহ ৯ কর্মকর্তা ও তাদের পরিবারের সদস্যদের ব্যাংক হিসাবসহ স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের খোঁজে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। দুদকে আসা অভিযোগ অনুযায়ী, তারা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ও বাসাবাড়িতে অবৈধভাবে গ্যাস সংযোগ দেওয়াসহ বিভিন্ন অনিয়মের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার মালিক হয়েছেন। গত ২১ অক্টোবর কমিশন থেকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, বাংলাদেশ ব্যাংক, রাজধানী উন্নয়ন কর্র্তৃপক্ষের পাশাপাশি বিভিন্ন দপ্তরে চিঠি দিয়ে তাদের স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ, ব্যাংক হিসাব, ব্যাংকে থাকা এফডিআর, সঞ্চয়পত্রসহ যাবতীয় তথ্য চাওয়া হয়েছে। দুদকের উপপরিচালক মো. মোনায়েম হোসেন চিঠির বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
বিভিন্ন দপ্তরে দুদকের দেওয়া চিঠিতে তিতাসের সাবেক এমডি প্রকৌশলী মীর মসিউর রহমানের পাশাপাশি ১০ নম্বর জোনের (ধানমণ্ডি) যে আট কর্মকর্তা ও তাদের পরিবারের তথ্য চাওয়া হয়েছে তারা হলেন জোনের ব্যবস্থাপক আতর আলী, তার স্ত্রী হামিদা আলী, মেয়ে মিথিলা জাহান অনন্যা ও অর্থি এবং ছেলে আবিব মাহমুদ রিফাত; উপব্যবস্থাপক ফয়জুল ইসলাম, তার স্ত্রী শারমিন আক্তার, মেয়ে ফারিশতা নূর ও ছেলে উজাইর আবদুল্লাহ; উপব্যবস্থাপক আবু কাউছার, তার স্ত্রী নাসিমা বেগম, ছেলে জুবায়ের হাসান ও ওযায়ের হাসান এবং মেয়ে মোসাম্মৎ সাঈদা খাতুন; সহকারী ব্যবস্থাপক ইদ্রিস আলী, তার স্ত্রী ফাহমিদা আক্তার, ছেলে সাদ্দাম হোসেন, সাকিব হোসেন ও সাজিদুল হক; সুপারভাইজার কাজী সাজ্জাদ হোসেন মিন্টু, তার স্ত্রী ফারজানা ইয়াসমিন জেবা, মেয়ে কানিজ ফাতেমা ও তাহমিনা আক্তার জেরি, কারিগরি কর্মকর্তা তাপস কুমার দে, তার স্ত্রী রূপা দে, ছেলে প্রতীক দে ও প্রত্যয় দে; সহকারী কারিগরি কর্মকর্তা রবিউল ইসলাম ফরাজী, তার স্ত্রী শেফালী খাতুন ও ছেলে শাফায়াতুল ইসলাম, সহকারী হিসাব কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর হোসেন, তার স্ত্রী মমতাজ শিরিন, ছেলে জামিল হোসেন শুভ ও তানজিল হোসেন সুপ্ত এবং মেয়ে অপরাজিতা হোসেন পুষ্পিতা।
দুদক কর্মকর্তারা জানান, সম্প্রতি তিতাস গ্যাসের নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অনুসন্ধান করে কমিশন। এতে তিতাস গ্যাসের ২২টি খাতে দুর্নীতি শনাক্ত করা হয়। খাতগুলো হচ্ছেÑ অবৈধ সংযোগ দেওয়া, নতুন সংযোগে অনীহা ও অবৈধ সংযোগ বৈধ না করা, অবৈধ লাইন পুনঃসংযোগ, অবৈধ সংযোগ বন্ধে আইনগত পদক্ষেপ না নেওয়া, অদৃশ্য হস্তক্ষেপে অবৈধ সংযোগ, গ্যাস সংযোগে নির্দিষ্ট নীতিমালা অনুসরণ না করা, বাণিজ্যিক শ্রেণির গ্রাহককে শিল্প শ্রেণির গ্রাহক
হিসেবে সংযোগ দেওয়া, অনুমোদনের অতিরিক্ত বয়লার ও জেনারেটরে গ্যাস সংযোগ, একই কর্মকর্তার একাধিক দায়িত্ব পালন, মিটার ট্যাম্পারিং করে প্রকৃত বিল গোপন, যেসব শিল্প প্রতিষ্ঠান বা আবাসিক গ্রাহক বৈধভাবে সংযোগ নিতে চায় বা মিটারের নাম পরিবর্তন করতে চায় তাদের কাছ থেকে অতিরিক্ত টাকা আদায়, ইচ্ছাকৃতভাবে গৃহস্থালিতে গ্যাসের চাপ কমিয়ে দেওয়া ও বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠানে গ্যাস বাইপাস করা, গ্রাহক পর্যায়ে অনুমোদনের কমবেশি গ্যাস সাপ্লাই দেওয়া, সাপ্লাই ভেরিয়েশন পরিমাপ করার জন্য ইভিসি (ইলেকট্রনিক ভলিউম কারেকটর) মিটার ব্যবহার না করা, অর্থের বিনিময়ে শিল্প এলাকায় পোস্টিং নিয়ে সিন্ডিকেট করে দুর্নীতি করা, এস্টিমেশন থেকে গ্যাস কম ব্যবহার হওয়া সত্তে¡ও সিস্টেম লস দেখানো, অবৈধ চুলাপ্রতি বৈধ চুলার সমান টাকা আদায় করে আত্মসাৎ করা, গ্যাস বিক্রি বেশি দেখিয়ে অর্থ আত্মসাৎ করা, ভুয়া সংকেত দিয়ে অবৈধ গ্রাহকের কাছে বিল আদায় করা, আঞ্চলিক ব্যাংক হিসাব থেকে তিতাসের মাদার অ্যাকাউন্টে যথাসময়ে টাকা স্থানান্তর না করা, দীর্ঘদিন ধরে বকেয়া বিল আদায় না করা ও দরপত্রে অনিয়ম করে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করা। এর অংশ হিসেবে তিতাসের বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তার দুর্নীতি অনুসন্ধান করা হচ্ছে।
দুদক কর্মকর্তারা জানান, কিছুদিন আগে তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির সাবেক এমডি মীর মসিউর রহমান, প্রতিষ্ঠানটির গাজীপুর আঞ্চলিক বিপণন কার্যালয়ের সাবেক ব্যবস্থাপক ছাব্বের আহমেদ চৌধুরী, তার স্ত্রী ওয়াস্ট কেম ইন্টারন্যাশনালের পরিচালক রুমানা রিসাত জামান এবং তিতাসের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এসবি কনস্ট্রাকশন লিমিটেডের স্বত্বাধিকারী সাইফুল ইসলামের বিরুদ্ধে মামলা করেছে দুদক। দুদকের তদন্ত অনুযায়ী, মূলত ছাব্বের আহমেদ চৌধুরীর বিরুদ্ধে ‘কেজি দরে ঘুষ’ নেওয়ার অভিযোগে অনুসন্ধান করে দুদক। পরে ওই অবৈধ লেনদেনে আরও তিনজনের সম্পৃক্ততা মেলে।
অনুসন্ধানে ২০১৫ থেকে ২০১৯ সালের এপ্রিল পর্যন্ত তিতাসের কর্মকর্তা ছাব্বের আহমেদের স্ত্রী রুমানা রিসাতের প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব এবং ঠিকাদার সাইফুলের প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাবে ৪০ কোটি ৩৬ হাজার ৫৮৪ টাকার ‘সন্দেহজনক’ লেনদেন হওয়ার প্রমাণ পায় দুদক। এ বিষয়ে দুদকের তদন্ত অব্যাহত আছে। যার অংশ হিসেবে সাবেক এমডি মসিউর রহমানের ব্যাংক হিসাবসহ স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের খোঁজ-খবর নেওয়া হচ্ছে।