পরিকল্পনা প্রণয়নে নির্ভরযোগ্য তথ্যের গুরুত্ব

কয়েক দিন আগে একটি ইংরেজি দৈনিকে জনৈক ওয়াসি আহমেদ আবাদি জমির প্রকৃত উপাত্তের গুরুত্বের ওপর একটি নিবন্ধ লেখেন। তিনি দেখিয়েছেন ১৯৮৩-৮৪ সালের কৃষি শুমারিতে চাষযোগ্য জমির পরিমাণ পাওয়া যায় ৯ দশমিক ২ মিলিয়ন হেক্টর; আবার ১৯৯৬ সালে সেটা নেমে যায় ৮ দশমিক ২ মিলিয়ন হেক্টরে। অর্থাৎ ওই সময় বছরে গড়পড়তা ১ শতাংশ হারে আবাদি জমি কমে যায়। ভূমি-ভুখ এই দেশে এত উচ্চহারে জমি-হ্রাস গভীর উৎকণ্ঠার কারণ। কিন্তু পরে পরিচালিত অন্য একটি গবেষণায় দেখা যায়, ১৯৮৩ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত এ জমি কমতির হার ছিল শূন্য দশমিক ৩ শতাংশ। একটি ওয়েবসাইটের (‘index mundi’’) তথ্য থেকে দেখা যায়, দেশে ১৯৬১ সালে আবাদি জমির পরিমাণ ছিল ৮ দশমিক ৬০ মিলিয়ন হেক্টর, এটা বাড়তে বাড়তে ১৯৮৯ সালে সর্বোচ্চ ৯ দশমিক ৫৫ মিলিয়ন হেক্টরে উন্নীত হয়। এরপর পরিমাণ আবার কমতে থাকে; ২০১৫ সালে পরিমাণ দাঁড়ায় ৭ দশমিক ৭৬ মিলিয়ন হেক্টর। এই হিসাবটি বিবেচনায় নিয়ে দেখা যায়, দেশে আবাদি জমি হ্রাসের হার এখন শূন্য দশমিক ৭২ শতাংশ। আসলে এর মধ্যে কোনটি ঠিক, সেটি বুকে হাত দিয়ে বলা কঠিন।

বাংলাদেশ বর্তমানে পৃথিবীর ১০টি দ্রুততম উন্নয়নশীল দেশের মধ্যে একটি। উন্নয়ন ত্বরান্বিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দেশে অদূর ভবিষ্যতে আবাস, অবকাঠামো ও কলকারখানা নির্মাণে আবাদি জমি যে ক্রমবর্ধমান হারে বেদখল হবে, তা বলাই বাহুল্য। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ভূমি-হ্রাস, বর্ধিত লবণাক্ততা ও অন্যান্য সমস্যা তো আছেই। এসব বিবেচনায় তখন খাদ্য নিরাপত্তার জন্য আবাদি জমি ও পানি অপর্যাপ্ত প্রতীয়মান হতে পারে। আবার মানুষের আয় ও জীবন মানের উন্নয়নের সঙ্গে দানাদার খাদ্যশস্যের চাহিদা কমে যেতে পারে এবং পানির চাহিদা বেড়ে যেতে পারে। সমাজ ও অর্থনীতির এই রূপান্তরের পথে মানুষের অভিযোজনের প্রক্রিয়া মসৃণ করতে দরকার সঠিক প্রাক্কলন ও পরিকল্পনা প্রণয়ন। কিন্তু আমাদের এসব বিষয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্য কোথায়? বর্তমানে পানি চুক্তি নিয়ে যে এত কথা হলো, এর মধ্যে ছয়টি নদীর পানি-সংক্রান্ত তথ্যই সংগ্রহ করা হয়নি; আলোচনা হবে কীভাবে?

২০১০ সালের HIES (Household Income & Expenditure Survey) অনুযায়ী দৈনিক জনপ্রতি খাদ্যশস্য ভোগের পরিমাণ ৪৪২ গ্রাম প্রাক্কলন করা হলেও ২০১২ সালে বিআইডিএস পরিচালিত এক জরিপে এর পরিমাণ ৫১০ দশমিক ৫ গ্রাম (৪৬৮ দশমিক ৯ গ্রাম চাল ও ৪১ দশমিক ৬ গ্রাম গম) পাওয়া যায়। Helgilibrary বিশ্বে চালের মাথাপিছু যে ভোগের পরিমাণ প্রদর্শন করছে, তাতে দেখা যায় ২০১১ সালে বাংলাদেশের মানুষ বছরে ১৭৩ কেজি চাল ভক্ষণ করে তালিকার শীর্ষে অবস্থান করছে। এরপর রয়েছে লাওস, কম্বোডিয়া ও ভিয়েতনাম যাদের চাল ভোগের পরিমাণ যথাক্রমে ১৬২, ১৫৯ ও ১৪৫ কেজি। আমাদের প্রতিবেশী নেপালে এর পরিমাণ মাত্র ৮৭ কেজি। আমরা জানি, দারিদ্র্যসীমা থেকে উত্তরণ ঘটলে মানুষের দানাদার খাদ্যশস্যের চাহিদা কমতে থাকে। ইতিমধ্যে আমরা যথেষ্ট উন্নতি করলেও দারিদ্র্যের হার বিশ/একুশ শতাংশে এসে প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে; আগের মতো দ্রুতগতিতে নামছে না। এ অবস্থার কারণ কী এবং কী কী কার্যক্রম গ্রহণ করলে এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ ঘটবে, তার কোনো বস্তুনিষ্ঠ তথ্য-উপাত্ত আমাদের গবেষকদের কাছে আছে বলে জানা নেই। তাহলে কীভাবে আমরা দ্রুতগতিতে উন্নতি করব আর বৈষম্য কমাব?

দেশে তথ্যের গোলকধাঁধা নিয়ে একটি উদাহরণ দিলে বিষয়টি পরিষ্কার হবে। প্রাক্কলন অনুযায়ী এ মুহূর্তে দেশের জনসংখ্যা ১৬ কোটি ৪০ লাখের কিছু বেশি। আমরা হিসাবের সুবিধার জন্য সেটাকে সহজেই ১৬ দশমিক ৫০ কোটি ধরতে পারি। বিআইডিএসের (Bangladesh Institute of Development Studies) প্রাক্কলন অনুযায়ী মাথাপিছু খাদ্যশস্য ভোগের পরিমাণ ৫১০ গ্রাম ধরলেও বছরে আমাদের চাহিদা দাঁড়ায় তিন কোটি সাত লাখ টন। আউশ, আমন ও বোরো চাল এবং গম মিলে মোট উৎপাদন ৩ দশমিক ৫০ কোটি টনের কিছু বেশি। এই উৎপাদন থেকে অপচয়, বীজ ও পশুখাদ্য এবং অন্যান্য ব্যবহার বাবদ ১২ শতাংশ হারে ৪২ লাখ টন বাদ দিলে দেশে নিট খাদ্যশস্যের লভ্যতা থাকে তিন কোটি আট লাখ টন। অর্থাৎ আমাদের আমদানির কোনো প্রয়োজনীয়তা নেই। অথচ এখন প্রতি বছর ৫০ থেকে ৫৫ লাখ টন গম দেশে আমদানি হচ্ছে। তাহলে এই গম যাচ্ছে কোথায়? এই পরিস্থিতি নাসির উদ্দিন হোজ্জার ‘বিড়াল এক কেজি হলে মাংস কই, আর মাংস এক কেজি হলে বিড়াল কই’ ধাঁধার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।

তথ্যের এই ধাঁধার চক্করে পড়লে কী অবস্থার তৈরি হয়, তার বড় উদাহরণ ২০১৭ সালের খাদ্যঘাটতি মোকাবিলায় সবার কসরত। ওই বছর মার্চ মাসে শ্রীলঙ্কার একটি প্রতিনিধিদল ৫০ হাজার টন চাল কিনতে ঢাকায় এলে তাদের জানানো হয়, জুন মাসের আগে (অর্থাৎ নতুন ফসল কাটার আগে ঝড়, বন্যা, সাইক্লোন, শিলাবৃষ্টি প্রভৃতি প্রাকৃতিক দুর্যোগে ফসলের ক্ষয়ক্ষতি সম্পর্কে নিশ্চিত না হয়ে) রপ্তানির প্রতিশ্রুতি দেওয়া সম্ভব নয়। তখন রপ্তানি এড়ানো যায় বটে, কিন্তু আমাদের শেষ রক্ষা হয় না। ওই সময় থেকে সিলেটে শুরু হয় প্রচণ্ড বৃষ্টিপাত। সেই সঙ্গে ধেয়ে আসে পাহাড়ি ঢল; পরিণতি সিলেটের হাওরে অকালবন্যা। ক্ষেতের বোরো ধান সব হয়ে যায় নষ্ট। কৃষি বিভাগ থেকে বলা হয় খাদ্যশস্যের ক্ষয়ক্ষতি ১০ লাখ টনের বেশি হবে না। কাজেই ভয়ের কিছু নেই। ওই বছর দেশের অন্যান্য স্থানেও বোরো ফসলের কিছু ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল; পোকার আক্রমণ ও শিলাবৃষ্টি ছিল এর কারণ।

আমরা সংগ্রহ অভিযান পরিচালনার আগে হোমওয়ার্ক শুরু করি। এই অনুশীলনে চালের দামের ওঠানামার প্রকৃতি বেশ বেখাপ্পা লাগে; অন্যান্য বছর যেখানে মার্চ মাসের শেষের দিক থেকে দাম ক্রমশ কমতে থাকে, ওই বছর তা উল্টো রথের যাত্রা শুরু করে; ধীরগতিতে হলেও বাড়তে থাকে। খাদ্য অধিদপ্তর আশঙ্কা করল বোরো ফসলের উৎপাদন ঘাটতি ১০ লাখ টন প্রাক্কলন করা হলেও এর প্রভাব পড়বে কমপক্ষে পঁচিশ/তিরিশ লাখ টনের; আতঙ্কজনিত অতিরিক্ত ক্রয় ও মজুদকরণ প্রবণতা এর প্রধান কারণ। এতে অভ্যন্তরীণ চাল সংগ্রহ অভিযানের সফলতা ও মূল্যের সম্ভাব্য ঊর্ধ্বগতি নিয়ে উৎকণ্ঠা বেড়ে যায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে খাদ্য অধিদপ্তর প্রথমত মৌখিকভাবে এবং পরবর্তী সময়ে এপ্রিল মাসের ৯ তারিখে লিখিতভাবে দেশের অভ্যন্তরে ঘাটতি মেটানোর লক্ষ্যে চাল আমদানির ওপর আরোপিত ২৮ শতাংশ শুল্ক নামিয়ে ১০ শতাংশে আনতে প্রস্তাব করে। সেই সঙ্গে সরকারি পর্যায়ে ১২ লাখ টন চাল আমদানিরও প্রস্তাব করা হয়। এর পরদিন একটি প্রথম শ্রেণির দৈনিকে বিআইডিএসের এক বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ সাক্ষাৎকার দিয়ে দেশবাসীকে অবহিত করেন, খাদ্য অধিদপ্তর এক আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রস্তাব করেছে; এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে ভারতের চালে দেশ সয়লাব হয়ে যাবে, দেশের কৃষক ধানের ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হবেন। তিনি যতসব তথ্য-উপাত্ত তার অভিমতের পক্ষে দাঁড় করান।

এত বড় পণ্ডিত ব্যক্তির উপদেশ তো আর হেলাফেলার বস্তু নয়; সরকার তার অভিমতকে সম্মান দেখিয়ে চালের ওপর আরোপিত শুল্ক-হ্রাস স্থগিত রাখল। এদিকে চালের দাম বাড়তে লাগল। এভাবে জুন মাসে ঈদুল ফিতরের আগে চালের দাম যখন সরকারি সংগ্রহ মূল্যের ওপরে উঠে গেল, তখন শুল্ক-হ্রাসের আদেশ জারি হলো। তত দিনে অনেক দেরি হয়ে গেছে; ঈদের আগে রাস্তা বাসের দখলে চলে গেছে, রাস্তায় ট্রাক চলাচল হয়ে গেছে নিষিদ্ধ, সুযোগ বুঝে রপ্তানিকারকরা দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন, ঈদে শ্রমিকরা ছুটিতে যাওয়ায় স্থানীয় মিলাররা চাল উৎপাদন বন্ধ করে দিয়েছেন। ফলাফল ঈদের খুশির রেশ কাটতে না কাটতেই আমজনতার উৎকণ্ঠা শুরু হলো চালের দরবৃদ্ধিতে। এবার ওই বিজ্ঞ অর্থনীতিবিদ তথ্য-উপাত্তসহ চার্চিলীয়ও ভঙ্গিতে ওই একই দৈনিকে সাক্ষাৎকার দিয়ে জানান, খাদ্য বিভাগের সময়োচিত পদক্ষেপের অভাবে এরূপ লেজে-গোবরে অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।

উইনস্টন চার্চিলকে একজন জিজ্ঞাসা করেছিলেন, একজন রাজনীতিবিদের অপরিহার্য গুণ কী কী। চার্চিল ঝটপট উত্তর দেন ‘The quality to foretell what is going to happen tomorrow, next month and next year and also the quality to explain why it did not happen.’ দুজনের মধ্যে কি অদ্ভুত মিল। আসলে সব মহৎ ব্যক্তি একই রূপ চিন্তা করেন তো! এই চার্চিল ‘ভারতীয়রা খরগোশের মতো বংশ বৃদ্ধি ঘটায়, দুর্ভিক্ষের জন্য তারা নিজেরাই দায়ী’ এই অজুহাতে ১৯৪৩ সালে বাংলার মহাদুর্ভিক্ষের সময় অস্ট্রেলিয়া থেকে গমবোঝাই দুটি জাহাজের গন্তব্য পরিবর্তন করে ভারতের স্থলে ভূমধ্যসাগরে নিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেন। এটা না করা হলে বাংলার ভয়াবহতম ওই দুর্ভিক্ষে বহু অনাহারীর প্রাণ রক্ষা করা সম্ভব হতো।

আমি যখন মাঠপর্যায়ের একজন জুনিয়র কর্মী, তখন একবার ঢাকায় আসলাম একটি মামলায় সদর দপ্তরের বিজ্ঞ আইন কর্মকর্তার মতামত গ্রহণের জন্য। আইন কর্মকর্তা আমাকে জানালেন, তার কাছে ‘হাঁ’ আর ‘না’ দুটোই আছে। আমি কোনটা চাই? তথ্য, উপাত্ত ও তত্ত্বের এ জাতীয় ব্যক্তিনিষ্ঠ প্রয়োগ দীর্ঘ মেয়াদে দেশ ও জাতির কোনো কল্যাণ বয়ে আনে না। তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ ও তৈরি করা হয় গবেষণা আর জরিপের মাধ্যমে। সাধারণত গবেষকরা এ কাজ করে থাকেন। আবার মাঠপর্যায়ের অধস্তন কার্যালয় থেকে প্রাপ্ত উপাত্ত একত্রীকরণ করেও অনেক তথ্য-উপাত্ত পাওয়া যায়। সংশ্লিষ্ট কর্মচারীরা এ কাজ করে থাকেন। নিজেদের কাজকে মহীয়ান করে তোলার মানসে উভয় ক্ষেত্রেই আত্মবাদী মূল্যবোধের অনুপ্রবেশ ঘটায়, তথ্য-উপাত্ত অনেক সময়ই বস্তুনিষ্ঠতা হারায়। এ জাতীয় দুর্বল উপাত্তনির্ভর পরিকল্পনায় বাঞ্ছিত সুফল আসে না। এ জন্য পরিকল্পনায় বস্তুনিষ্ঠ ও নির্ভরযোগ্য তথ্য-উপাত্ত যেমন প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন গবেষক ও পরিকল্পনাপ্রণেতাদের দক্ষতা, অঙ্গীকার ও দেশপ্রেম। এগুলোর সমন্বয় ঘটলেই শুধু দ্রুত ও সুষম উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে।

লেখক

খাদ্য অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক

rulhanpasha@gmail.com