সিঙ্গাপুরে জুয়াড়িদের পেছনে গোয়েন্দারা

বাংলাদেশের ক্যাসিনো কারবারিদের সম্পদ খুঁজতে সিঙ্গাপুরে অবস্থান করছেন বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা। তাদের সম্পদের খোঁজে সিঙ্গাপুর চষে বেড়াচ্ছেন তারা। ঘোরাফেরা করছেন সিঙ্গাপুরের সবচেয়ে জনপ্রিয় জুয়ার আসর বেফ্রন্ট মেরিনা বে স্যান্ডেইজ ক্যাসিনো ও সেন্তুসা রেস্টওয়াল ক্যাসিনোতে। তাছাড়া বিভিন্ন শপিংমলেও বাংলাদেশি লোকজনের ওপর তীক্ষè দৃষ্টি রাখছেন তারা। বিশেষ করে বাংলাদেশের ক্যাসিনো সম্রাট হিসেবে পরিচিত ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের বহিষ্কৃত সভাপতি ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাট, তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী বহিষ্কৃত সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া, যুবলীগ নামধারী ঠিকাদার গোলাম কিবরিয়া ওরফে জি কে শামীমসহ শতাধিক ক্যাসিনো কারবারির কী পরিমাণ সম্পদ সে দেশে আছে তা চিহ্নিত করার চেষ্টা করছেন তারা।

সম্প্রতি সিঙ্গাপুর ঘুরে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। জানা গেছে, গত দুই সপ্তাহ ধরে গোয়েন্দারা সিঙ্গাপুরে অবস্থান করছেন। তাছাড়া গোয়েন্দাদের কয়েকটি টিম মালয়েশিয়া এবং

থাইল্যান্ডেও গেছে। সেখানেও বাংলাদেশি ক্যাসিনো কারবারিদের সহায়-সম্পদ উদঘাটনের চেষ্টা করছেন তারা।

সিঙ্গাপুরের বাঙালিপাড়া হিসেবে পরিচিত মোস্তফা সেন্টারের আশপাশের লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সম্রাটসহ শতাধিক ব্যক্তির বাড়ি-গাড়ি-ফ্ল্যাট আছে সিঙ্গাপুরে। এর মধ্যে সিঙ্গাপুরের তিন ব্যবসায়ীর সঙ্গে অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে সম্রাট একটি বাড়ি করছেন। মূলত ক্যাসিনোর টাকা দিয়েই তিনি ওই বাড়ির ‘পার্টনার’ হয়েছেন। তবে কাগজে-কলমে তার নাম নেই। বাড়িটি দেখাশোনা করছেন সম্রাটের চতুর্থ স্ত্রী সিঙ্গাপুরের নাগরিক চিনলি। তাছাড়া বেফ্রন্ট মেরিনা বে স্যান্ডেইজ ক্যাসিনোসংলগ্ন সিসিন বিল্ডিংয়ে (জাহাজ বিল্ডিং হিসেবে পরিচিত) সম্রাট, খালেদ ও শামীমের ভিআইপি স্যুট রয়েছে। স্যুটটি বিক্রির চেষ্টায় আছেন সম্রাটের স্ত্রী চিনলি। এজন্য অনলাইনে বিজ্ঞাপনও দেওয়া হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা জানায়, চলমান অভিযানে খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া, জি কে শামীম, কলাবাগান ক্লাবের সভাপতি ও কৃষক লীগের বহিষ্কৃত নেতা শফিকুল আলম ওরফে কালা ফিরোজ এবং মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক লোকমান হোসেন ভূঁইয়াকে কয়েক দফা রিমান্ডে নিয়ে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করেছে র‌্যাব ও পুলিশ। সম্রাট ও তার আরেক ঘনিষ্ঠ সহযোগী ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের বহিষ্কৃত সহসভাপতি এনামুল হক আরমানকেও গ্রেপ্তার করে রিমান্ডে নিয়েছে। তাদের মধ্যে আরমান ছাড়া সবাই কারাগারে অবস্থান করছেন। রিমান্ডে তারা ক্যাসিনো ও টেন্ডারবাণিজ্য নিয়ে বিশদ তথ্য দিয়েছেন। এসব অপকর্ম করে দেশের বাইরে কী পরিমাণ সম্পদ গড়েছেন তারও বিবরণ দিয়েছেন। সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া ও দুবাইতে তাদের প্রচুর সহায়-সম্পদ থাকার তথ্য মিলেছে। গ্রেপ্তারদের কাছ থেকে তথ্য পেয়ে নড়েচড়ে বসেছে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো। তাদের তথ্যে প্রশাসনের বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তা এবং রাজনৈতিক নেতাদের অনেকের নাম উঠে এসেছে। ক্ষমতাসীন দলের একাধিক শীর্ষ নেতার নাম আসায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও অনেকটা বিব্রত। ক্যাসিনোসহ দুর্নীতিবিরোধী অভিযান শুরুর পর ক্ষমতাসীন দলের অনেক নেতা গা-ঢাকা দিয়েছেন। কেউ কেউ বিদেশে পাড়ি দেওয়ার চেষ্টা করছেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পুলিশ সদর দপ্তরের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, গত ১৮ সেপ্টেম্বর ক্যাসিনোসহ দুর্নীতিবিরোধী অভিযানে গ্রেপ্তার হওয়াদের কাছ থেকে চাঞ্চল্যকর তথ্য উদঘাটিত হয়েছে। সরকারের হাইকমান্ডের নির্দেশে বিদেশে থাকা সম্পদ খোঁজা ও তথ্য যাচাই-বাছাই করতে বিভিন্ন সংস্থার সদস্যদের দেশের বাইরে পাঠানো হয়েছে। বিশেষ করে সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ায় একাধিক টিম পাঠানো হয়েছে। ইতিমধ্যে সিঙ্গাপুরে সম্রাটসহ বেশ কয়েকজনের ফ্ল্যাট-বাড়ি ও একাধিক গাড়ির সন্ধান পাওয়া গেছে। ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, সিঙ্গাপুর, সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই, থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ায় গিয়ে জুয়া খেলেন ঢাকার একাধিক নেতা ও ব্যবসায়ী। সম্রাটসহ যারা গ্রেপ্তার হয়েছেন, গ্রেপ্তার হওয়ার আগে প্রতি মাসে মাসে তাদের অন্তত একবার করে হলেও সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়া ভ্রমণের রেকর্ড রয়েছে। ওইসব নেতার পাসপোর্ট পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে এর সত্যতা পাওয়া গেছে।

গত ২০ ও ২১ অক্টোবর সিঙ্গাপুরের বুগিছ, ল্যাস্তা, উত্তমপার্ক, সিটিহল, রাফেল প্লেস, তোয়াজ লিং, চাঙ্গি ও মোস্তফা সেন্টারসহ আশপাশ এলাকা ঘুরে দেখা যায়, ওইসব এলাকায় বাংলাদেশিদের আনাগোনা বেশি। অনেক বাংলাদেশির ফ্ল্যাট-বাড়ি রয়েছে। আছে অত্যাধুনিক গাড়ি। কারও কারও আছে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানও।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, বাংলাদেশে ২০১৫ সালে আধুনিক জুয়ার আসর ক্যাসিনোর ‘বিপ্লব ঘটে’ সম্রাটের হাত ধরে। ওই সময় সম্রাট ও ঢাকা দক্ষিণ সিটির কাউন্সিলর মমিনুল হক সাঈদের পরিচয় হয় ক্যাসিনো পরিচালনায় অভিজ্ঞ কয়েকজন নেপালি নাগরিকের সঙ্গে। নেপালি নাগরিক রাজকুমার ও বিনোদ মানালিও তাদের সঙ্গে সিঙ্গাপুর গিয়ে ক্যাসিনো খেলতেন। এই দুই নেপালির সিঙ্গাপুরের উত্তমপার্ক এলাকায় দুটি ফ্ল্যাট রয়েছে। সম্প্রতি বরখাস্ত হওয়া কাউন্সিলর সাঈদের সিঙ্গাপুরে অঢেল সম্পদ আছে। বর্তমানে তিনি দুই সন্তান ও স্ত্রীকে নিয়ে সিঙ্গাপুরে নিজের ফ্ল্যাটে অবস্থান করছেন। বনানীর ক্যাসিনো কারবারি আবদুল আওয়াল ও আবুল কাশেমের সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ায় বেশ কয়েকটি বাড়ি রয়েছে।

মোস্তফা সেন্টার সংলগ্ন একটি হোটেলের মালিক (বাংলাদেশি) নাম প্রকাশ না করে দেশ রূপান্তরকে বলেন, গত দুই সপ্তাহ ধরে বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন সংস্থার লোকজন সিঙ্গাপুর অবস্থান করছেন। কয়েক দিন আগে দুই পুলিশ সদস্য হোটেলে আসেন খাবার খেতে। কথার ফাঁকে তারা নিজেদের পরিচয় দেন এবং জানতে চান সম্রাটসহ যারা গ্রেপ্তার হয়েছেন তাদের চিনি কি না? এবং কোথায় কোথায় তাদের ফ্ল্যাট-বাড়ি আছে। ওই পুলিশ কর্মকর্তাদের আমরা বলেছি, সম্রাটের কথা অনেক শুনেছি। সিঙ্গাপুুরে তার বেশ প্রভাব আছে। চাঙ্গি এয়ারপোর্টে নামার পর তাকে ‘এসকর্ট দিয়ে’ মেরিনা বেতে নিয়ে যাওয়া হয়। ওই ব্যবসায়ী আরও বলেন, মোস্তফা সেন্টারের পাশেই একটি নির্মাণাধীন ভবনের ‘পার্টনার’ সম্রাট। সিঙ্গাপুরে তিন ব্যক্তির সঙ্গে তার সুসম্পর্ক আছে। সম্রাট খুব চালাক। আর এ কারণে বাড়ি করতে গিয়ে কাগজে-কলমে তার নাম দেননি। যাদের সঙ্গে ‘পার্টনার’ তারাও ক্যাসিনো কারবারি। মাস তিনেক আগে সম্রাট এ এলাকায় আসেন। আমার জানামতে, সম্রাট, খালেদ ও জি কে শামীমের সিসিন বিল্ডিংয়ে ভিআইপি স্যুট রয়েছে। তার মধ্যে সম্রাটের স্যুটটি বিক্রি করে দেওয়ার জন্য অনলাইনে বিজ্ঞাপন দিয়েছেন তার চতুর্থ স্ত্রী চিনলি। বাংলাদেশের এক সিটি মেয়রের পাঁচতলা একটি বাড়িও রয়েছে মোস্তফা সেন্টারের আশপাশে। তাছাড়া তার আছে বেশ কয়েকটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান।

জানা যায়, সম্রাটসহ অন্য ক্যাসিনো কারবারিদের বাড়ি, গাড়িসহ বিপুল অর্থকড়ির বিস্তারিত তথ্য জানতে সরকারের একাধিক গোয়েন্দা ইউনিট সিঙ্গাপুরে অবস্থান করছে। রিমান্ডে থাকা ক্যাসিনো কারবারিরা সহযোগীদের ব্যাপারে যেসব তথ্য দিয়েছেন তার সত্যতা খুঁজছেন তারা। ‘মিলিয়ন ডলারে’ জুয়া খেলে সম্রাট সিঙ্গাপুরে ক্যাসিনোর ভিআইপি জুয়াড়ি কার্ড ‘পাইজা চেয়ারম্যানশিপ’ পেয়েছেন। তার চতুর্থ স্ত্রী চিনলির সিঙ্গাপুরের পিআর বা স্থায়ী নাগরিকত্ব আছে। মূলত তার মাধ্যমেই সম্রাট ফ্ল্যাট-বাড়ি কিনেছেন। তাছাড়া তার একটি অত্যাধুনিক গাড়ি আছে, যার মূল্য প্রায় ৩ কোটি টাকা। সিঙ্গাপুরের ক্যাসিনোতে মোটা অঙ্কের অর্থ উড়িয়ে ‘পাইজা কার্ড’ পেয়েছেন সম্রাট। একমাত্র বাংলাদেশি হিসেবে ‘পাইজা চেয়ারম্যানও’ তিনি।

সিঙ্গাপুরে অবস্থানরত একটি গোয়েন্দা সংস্থার এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, সম্রাটসহ গ্রেপ্তার হওয়াদের দেওয়া তথ্যগুলো যাচাই-বাছাই করতে একাধিক সংস্থার সদস্যরা কাজ করছেন। মালয়েশিয়া এবং থাইল্যান্ডেও আমাদের সদস্যরাও কাজ করছেন। আমরা তথ্য পেয়েছি, সম্রাট সিঙ্গাপুরে খুব জনপ্রিয়। নিজের স্বার্থ হাসিল ও ক্যাসিনোর টাকা ব্যবহার করতে তিনি সিঙ্গাপুরে একটি বিয়ে করেছেন। মালয়েশিয়ার পুত্রাজায়ার কুইকরোডে সম্রাটের একটি বাড়ি রয়েছে। জার্মানির একটি ব্যাংকে তার ৩৬ কোটি টাকা থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, সিঙ্গাপুরে কেউ জায়গা ক্রয় করতে পারেন না। সরকারের কাছ থেকে জমি ১০০ বছরের লিজ নিয়ে সিঙ্গাপুরের নিজস্ব নাগরিক বা কার্ডহোল্ডারধারী নাগরিকরা বাড়ি করতে পারেন। আবার সরকার ইচ্ছে করলে লিজ বাতিল করে দিতে পারে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, তদন্তের স্বার্থে অনেক কিছু বলা যায় না। তবে এতটুকু বলতে পারি, বাংলাদেশের ক্যাসিনো কারবারিদের অনেক সহায়-সম্পদ আছে সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ডে।