ধর্মীয় সম্প্রীতির সেই ঐতিহ্য এখন কোথায়

ভোলার বোরহানউদ্দিন উপজেলায় ফেইসবুকে ধর্মীয় উন্মাদনা ছড়িয়ে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের পর মিছিল করে একদল উন্মত্ত ব্যক্তি হিন্দু অধ্যুষিত এলাকায় প্রবেশ করে একটি মন্দিরসহ ১২টি বাড়িতে ভাঙচুর চালায় ও একটি দোকানে অগ্নিসংযোগ করে।

‘হিংসা ছাড়রে ভাই/মসজিদ-মন্দিরে প্রভেদ কিছু নাই/উভয়স্থলই ভক্তগণের/উপাসনার ঠাঁই। ’ যে মন্দিরের মেঝেতে (ভোলার বোরহান উদ্দিনের ‘অনিল বাবাজী’র মন্দির) কথাগুলো লেখা ছিল সেই মন্দিরেই প্রতিমাগুলোর মাথা ভেঙে দেওয়া হয়েছে। এই অহিংসার বাণী শুধু পাথরেই লেখা হয়েছিল, কিন্তু মানুষের মনে স্থান পায়নি। তাইতো উন্মত্ত গোষ্ঠীর রোষের শিকার ওই মন্দির-আশ্রমের সাইনবোর্ডটি ভাঙচুরের পর মন্দিরেরই পুকুরে ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছে। পার্শ্ববর্তী হিন্দুদের বাড়িঘরে করা হয়েছে ব্যাপক ভাঙচুর।

আমাদের দেশে নানা ধরনের বানোয়াট অভিযোগ তুলে হিন্দুদের নিশানায় পরিণত করাটা অনেকটাই নিয়মিত ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর জন্য তেমন কোনো কারণ লাগে না। তথ্যপ্রমাণ কিছুই লাগে না। শুধু প্রয়োজন হয়, একটা অভিযোগ উত্থাপন। অমনি সংশ্লিষ্ট হিন্দুর ‘ফাঁসি চাই’ বলে রণহুঙ্কার উচ্চারিত হয়। শুরু হয় হিন্দুবাড়িতে আগুন-ভাঙচুর! এসব দেখে সম্প্রতি ফেইসবুকে আমার এক বন্ধু গভীর হতাশা ব্যক্ত করে লিখেছেন, ‘জ্বর এসেছে? ধরছে মাথা? ভাঙতে কিছু ইচ্ছে করে?/গাল দিয়েছে? জমেছে রাগ? পেটের ভেতর কেমন করে?/আরে বোকা! বলবে কে কী? দাও না আগুন হিন্দুর ঘরে!’ অথচ এক সময় কবি নজরুল এদেশের হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতির জয়গান গেয়ে লিখেছিলেন, ‘মোরা একই বৃন্তের দুইটি কুসুম হিন্দু-মুসলমান।’

এদেশে হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতি এখন অনেকটাই যাঁড় কিংবা বলদের গুঁতোগুঁতিতে পর্যবসিত হয়েছে। রাষ্ট্রীয় জোয়াল যতক্ষণ ঘাড়ের ওপর শক্ত করে বাঁধা থাকে ততক্ষণ আমরা একসঙ্গে ‘হালচাষ’ করি, পাশাপাশি হাঁটি, কিন্তু যখনই রাষ্ট্রীয় ‘জোয়াল’টা একটু আলগা হয়ে যায়, তখনই শুরু হয় ‘গুঁতোগুঁতি’। গুঁতোগুঁতি না বলে ‘গুঁতানো’ বলাটাই সংগত। অবস্থা এতটাই বেগতিক যে, এর আগে ফুটবল খেলা দেখা নিয়ে সংঘাতের জের ধরে হিন্দুবাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে। এ কাজটি করেছে হাজার হাজার মানুষ সংগঠিত হয়ে। এর আগে পাবনার সাঁথিয়ায় একটি গুজব কেন্দ্র করে হিন্দুদের বাড়িঘরে হামলা চালানো হয়।  যখনই হিন্দুবাড়িতে হামলার দরকার হয়, তখনই একশ্রেণির মানুষ সংগঠিত ও সংঘবদ্ধ হয়ে যায়। থানা-পুলিশ-আইন কোনো কিছুই এই হামলা ঠেকাতে পারে না। এ ব্যাপারে সামাজিক প্রতিরোধও এখন একেবারেই আলগা। বর্তমানে পরিস্থিতি যেন এমনটাই দাঁড়িয়েছে। আমরা যখন বলি বাংলাদেশ ধর্মীয় সম্প্রীতির দেশÑ তখন কি এসব সাম্প্রদায়িক ঘটনার কথা বিস্মৃত হয়ে বলি? যারা বলি এসব বিচ্ছিন্ন ঘটনাÑ তারা কি নিজেদের প্রবোধ দিই মাত্র? এক ধর্মের মানুষ অন্য ধর্মের মানুষের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ছে, তাদের বাড়িঘরে আগুন দিচ্ছে, এই দৃশ্য দেখার পরও কীভাবে বলি যে বাংলাদেশের মানুষ সত্যিই অসাম্প্রদায়িক?

এদেশে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর দুঃখ-দুর্দশা নিয়ে আলোচনা করতে গেলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই একগাদা ‘অপযুক্তি’ শোনা যায়। এমনকি ‘শিক্ষিত-সচেতন’রা পর্যন্ত মনে করেন এ দেশে হিন্দুরা ‘খুব ভালো’ আছে, সংখ্যালঘু ইস্যুটা বিশেষ উদ্দেশে সামনে আনা হয়, এদেশের হিন্দুদের মধ্যে দেশপ্রেম নেই, এদের দেহ থাকে বাংলাদেশে, কিন্তু মন ভারতে, এরা বাংলাদেশের সম্পদ ভারতে পাচার করে! পাশাপাশি এটাও ভাবেন এবং বলেন যে ভারতে মুসলমানরা যতটা খারাপ অবস্থায় আছে, সে তুলনায় বাংলাদেশে হিন্দুরা ‘রাজার হালে’ আছে, এরা আওয়ামী লীগকে ভোট দেয়, বাড়াবাড়ি করে, এদের পিটিয়ে ভারতে পাঠিয়ে দেওয়া উচিত! বিস্ময়কর হলেও সত্যি যে, এই কথাগুলো যারা বলেন এবং বিশ্বাস করেন তারা অন্য কোনো যুক্তিপ্রমাণ-তথ্যের ধার ধারেন না। এমন একতরফা অভিযোগের পক্ষেই মানুষ সায় দেয় বেশি!

এই দেশে জাতিগত ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা আপাতত একটা বিরাট জাঁতাকলের মধ্যে আছে।  নিয়মিত পিষ্ট হলেও করার কিছু তো নেই-ই, বলারও কিছু নেই। কারণ বললে তা কেউ কানে তোলে না। উল্টো এমন সব কথা বলে যে, তাতে বোবা-কালা হয়ে বেঁচে থাকাটাই শ্রেয় মনে হয়। ১৯৭৫ সালের পর বাংলাদেশে অসাম্প্রদায়িকতা, হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতির পরিবর্তে এক ধরনের সাম্প্রদায়িক সংকীর্ণ রাজনীতিচর্চা প্রাধান্য পেয়েছে। ধর্ম মানুষের ব্যক্তিগত বিশ্বাস ও চর্চার জায়গা থেকে ক্রমশ রাষ্ট্রীয় পরিমণ্ডলে থাবা প্রসারিত করেছে। এখন ধর্মকে রাজনীতির বাহন বানিয়ে রাষ্ট্রীয় আচারে পরিণত করার দাবি পর্যন্ত উচ্চারিত হচ্ছে। আমরা এখন আর ‘মানুষ’ পরিচয় দিতে তেমন স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি না। কে ‘কতটা’ হিন্দু বা মুসলমানÑ সেটাই আমরা মুখ্য করে তুলছি।

এজন্যই নিজের ধর্ম আর ধর্মপরিচয়কে বড় করে দেখতে গিয়ে অন্যের ধর্ম ও ধর্মপরিচয়কে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করছি। ফলে পারস্পরিক ঘৃণা, অশ্রদ্ধা আর অসম্মান বাড়ছে। আমাদের মধ্যে এমন একটা সাম্প্রদায়িক সংকীর্ণতা ও দুষ্টবুদ্ধি সারাক্ষণ তাড়া করে ফিরছে যে, হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টানদের আমরা স্থায়ী প্রতিপক্ষ বানিয়ে ফেলছি। বিশেষত হিন্দুদের কোনো কিছুই মেনে নিতে পারছি না। এমনকি তাদের উপস্থিতিও আমাদের অনেকের মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তাই তো আমরা দেখছি প্রায়ই সংঘবদ্ধ মানুষের তীব্র ক্ষোভ হিন্দুদের বাড়িঘরে আগুন জ্বালিয়ে দিতে উৎসাহ জোগাচ্ছে। আমরা মুখে যতই প্রেম, মানবিকতা, ঔদার্য, মহত্ত¡, ধর্মনিরপেক্ষতার বুলি কপচাই না কেন, বাস্তবে কিন্তু ততটা মহৎ, উদার, মানবিক হতে পারছি না। সংকীর্ণতা, বিদ্বেষ, ঘৃণা আমাদের চেতনা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আচ্ছন্ন করে রাখে। আমাদের মধ্যে প্রেম-মানবিকতা অবশ্যই আছে; কিন্তু ঘৃণা-বিদ্বেষ-হিংস্রতাও একেবারে কম নেই। আমাদের মধ্যে জাতিগত, সম্প্রদায়গত সম্প্রীতি যেমন আছে পাশাপাশি ভিন্ন জাতি, অন্য ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষের প্রতি বিদ্বেষও আছে। আমরা মানুষ হওয়ার পরিবর্তে এক ধরনের সংকীর্ণ সাম্প্রদায়িক মানসিকতাসম্পন্ন নাগরিকে পরিণত হচ্ছি। আমরা শুধুই ‘ধার্মিক’ হিন্দু বা মুসলমান হতে পারছি না, শুধু হয়েছি হিংসুটে হিন্দু বা মুসলিম; যারা নিজেদের লাভের জন্য অপেক্ষাকৃত দুর্বলদের আঘাত করছি বা ফায়দা নিচ্ছি বা পুতুল খেলা খেলছি। এর থেকে উত্তরণের কোনো পথ আপাতত দেখা যাচ্ছে না!

দুই. বছর কয়েক আগে অধ্যাপক আনিসুজ্জামান ‘বাংলাদেশে ধর্মীয় সম্প্রীতি’ নিয়ে একটি নিবন্ধ লিখেছিলেন।  এই নিবন্ধে তিনি লিখেছিলেন

‘১৯৫০ সালের ফেব্রæয়ারি মাস। পশ্চিমবঙ্গ ও পূর্ববাংলায় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সূচনা হয়েছে। বরিশাল জেলার আগরপুর ইউনিয়নের ব্রাহ্মণদিয়া গ্রামে কয়েক হাজার হিন্দু আশ্রয় নেয়। তাদের রক্ষা করতে এগিয়ে আসেন বরিশাল সদর মহকুমা মুসলিম লীগের সভাপতি, বরিশাল জেলা মুসলিম লীগের সহ-সভাপতি এবং আগরপুর ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট আলতাফউদ্দীন। তিনি কিছুসংখ্যক গ্রামবাসী নিয়ে দাঙ্গা প্রতিরোধ করার সংকল্প করেন এবং নিজেই বন্দুক হাতে আশ্রয়প্রার্থীদের প্রহরায় নিযুক্ত হন। ১৮ ফেব্রæয়ারি তারিখে দাঙ্গাকারীরা দল বেঁধে আক্রমণ করতে আসে। আলতাফউদ্দীন তাদের নিরস্ত করতে ফাঁকা গুলি ছোড়েন। দুর্বৃত্তরা দূর থেকে তাকে লক্ষ্য করে বল্লম ছোড়ে। আলতাফউদ্দীন তাতে বিদ্ধ হয়ে মাটিতে পড়ে গেলে তারা তাকে হত্যা করে। তার আত্মাহুতিতে দাঙ্গা প্রতিরোধ করতে অনেকে এগিয়ে আসে এবং পরদিন বরিশালের অতিরিক্ত পুলিশ সুপারের নেতৃত্বে সশস্ত্র পুলিশ বাহিনী ওই গ্রামে এসে দাঙ্গা দমন করতে থেকে যায়। আলতাফউদ্দীনের আত্মত্যাগের ফলে সেদিন বহু প্রাণ রক্ষা পেয়েছিল। ১৯৬৪ সালের জানুয়ারিতে সীমান্তের দুপারে আবার সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা দেখা দেয়। ঢাকায় নবাবপুর রোডে ছিল আমীর হোসেন চৌধুরীর রিমা কেমিক্যালসের কারখানা এবং তার বাসভবন। আমীর হোসেন চৌধুরী ছিলেন রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের কনিষ্ঠ ভগ্নি হোমায়েরা খাতুনের একমাত্র পুত্র। দাঙ্গার সময়ে প্রতিবেশী হিন্দুর বাড়ি আক্রান্ত হলে আমীর হোসেন চৌধুরী তাদের রক্ষা করতে ছুটে যান এবং দুর্বৃত্তদের হাতে প্রাণ হারান। তখন তার বয়স ছিল ৫৩ বছর। সেবারই দাঙ্গা প্রতিরোধ করতে গিয়ে আরও একজন আত্মাহুতি দিয়েছিলেন। তিনি জিন্নাত আলী মাস্টার।  সে বছরের শেষে প্রকাশিত জীবনকথা বইটি জসীম উদ্দীন উৎসর্গ করেছিলেন আমীর হোসেন চৌধুরী, জিন্নাত আলী মাস্টার আর যারা নিজের জীবন বিপন্ন করে দেশ থেকে সাম্প্রদায়িক হাঙ্গামা দূর করতে চেয়েছিলেন, তাদের সকলকে।’

অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের বলা ধর্মীয় সম্প্রীতির এই চিত্র বাংলাদেশে এখন ইতিহাস। এখন হামলা হয়, পুড়িয়ে দেওয়া হয়, সংখ্যালঘুরা নীরবে মার খায়, কিন্তু প্রতিবাদ হয় না। যে যেখানে যতটুকু প্রতিবাদ করে, তাদের খবরও প্রকাশিত হয় না। ফলে আমাদের দেশে সাম্প্রদায়িকতা এখন সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের হাতে সংখ্যালঘু মানুষের একতরফা আক্রমণে পরিণত হয়েছে। সবচেয়ে হতাশার ব্যাপার হলো, এসব কথা বলার মতো লোকেরও দেশে অভাব দেখা দিয়েছে। এসব অভিজ্ঞতার কথা এখন কে বলবে, কে শুনবে? কে মানবিক সমাজ গড়ার ডাক দেবে? এখন যে অনেক ক্ষেত্রেই অসাম্প্রদায়িকতাকে ‘নাস্তিকতা’র মোড়কে ঢেকে দেওয়া হয়! তাহলে উদ্ধার কোথায়? কীভাবে?

লেখক

লেখক ও কলামনিস্ট