বেতন ছাড়াই গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করছিল শিশু জান্নাতি (১২)। পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সাঈদ আহম্মেদ (৪২) ও তার স্ত্রী রুকসানা পারভীন (৩৮) শিশুটির বেড়ে ওঠা থেকে শুরু করে তার বিয়ের যাবতীয় খরচ জোগানোর লোভ দেখিয়েছিলেন। গতকাল শনিবার জান্নাতির ঘনিষ্ঠ স্বজনরা দেশ রূপান্তরকে আরও জানিয়েছেন, শিশুটির দরিদ্র মা-বাবা তাদের এই প্রলোভনে পড়ে আট বছর বয়সেই জান্নাতিকে তাদের হাতে তুলে দিয়েছিলেন। এরপর চার বছর বিভিন্নভাবে নির্যাতনের ঘটনা ঘটলেও জান্নাতি কখনো সেই নির্যাতনের কথা তার মা-বাবার কাছে প্রকাশ করতে পারেনি। কারণ জান্নাতিকে কখনো তারা একা ছাড়েননি। মাঝেমধ্যে মোবাইল ফোনে মা-বাবার সঙ্গে কথা বলার সুযোগ দিলেও জান্নাতি কখনই মন খুলে কথা বলতে পারেনি। গৃহকর্ত্রী রুকসানা পারভীন তার নিজের মোবাইল ফোনের লাউড স্পিকারে তাদের কথোপকথন শুনতেন। তাই জান্নাতি তার নির্যাতনের কথা জানাতে পারেনি মা-বাবাকে।
ওই স্বজনরা আরও জানান, রুকসানা পারভীনের দাদা কাসেম চেয়ারম্যান ও জান্নাতিদের বাড়ি একই গ্রামে। এই এলাকা থেকে আরও একাধিক মেয়েকে তারা নিয়েছিলেন গৃহকর্মী হিসেবে। তাদের অনেকেই মারধরের
শিকার হয়ে বাড়ি ফিরে গেছে। তারা একজনের বিয়ের খরচ বহন করলেও তাকেও মারধর করা হতো।
জান্নাতির মামা আরিফুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে জানান, ওর ওপর দীর্ঘদিন ধরেই নির্যাতন করা হয়েছে। কিন্তু সেই কথা বলার সুযোগ পায়নি মেয়েটি। ঈদের সময় বাড়ি নিয়ে এলেও তাকে কখনো একা ছাড়েননি তারা। মাঝেমধ্যে মোবাইল ফোনে কথা বলার সুযোগ দিলেও রুকসানা সামনে বসে থাকতেন। এ কারণে শিশুটি মন খুলে কথা বলতে পারেনি। এদিকে জান্নাতিকে হারিয়ে তার মা অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। জ্ঞান ফিরলেই জান্নাতি জান্নাতি বলে বিলাপ করছেন। একপর্যায়ে আবার জ্ঞান হারিয়ে ফেলছেন। গত শুক্রবার বগুড়ার গাবতলী তেলিহাটি ফকিরপাড়া কবরস্থানে জান্নাতিকে কবর দেওয়া হয়েছে।
জান্নাতির বাবা জানু মোল্লা কান্নাজড়িত কণ্ঠে দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমার বড় মেয়ে ছিল ও। ওর সুখের কথা চিন্তা করে বড় ঘরে দিয়েছিলাম। কিন্তু দিনের পর দিন ওকে যে এভাবে মারধর করা হয়েছে তা বুঝতে পারিনি। মেয়েটি আমার না জানি কত কষ্ট পেয়ে মরে গেছে। এ সময় তিনি এই হত্যার দৃষ্টান্তমূলক বিচার চান।
গত ২৩ অক্টোবর দিবাগত রাতে রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল মর্গে জান্নাতির লাশ শনাক্ত করেন তার বাবা জানু মোল্লা। তখন মেয়ের শরীরের বিভিন্ন জায়গায় আঘাতের চিহ্ন দেখতে পান তিনি। এরপর মোহাম্মদপুর থানায় গৃহকর্ত্রী রুকসানা পারভীন ও তার স্বামী সাঈদ আহম্মেদসহ একাধিক অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিকে আসামি করে হত্যা মামলা করেন তিনি। ওই রাতেই রুকসানা পারভীনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে হত্যার কথা স্বীকার করেন রুকসানা। পরে গত শুক্রবার আদালতে ১৬৪ ধারায় দেওয়া জবানবন্দিতে রুকসানা জানান, ঠিকমতো কথা না শোনায় শিশুটির চুলের মুঠি ধরে মেঝেতে একাধিকবার আঘাত করে প্রথমে রান্নাঘর, তারপর বাথরুমে ফেলে রাখেন তিনি। একপর্যায়ে সপরিবারে বাসার বাইরে গিয়ে রাতে ফিরে এসে দেখেন জান্নাতির মুখ ও নাক দিয়ে রক্ত ঝরছে। সেই রাতে শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে নেওয়ার পর কতর্ব্যরত চিকিৎসক জানান আগেই মারা গেছে।
গৃহকর্ত্রী কারাগারে, গৃহকর্তা পলাতক : জান্নাতিকে পিটিয়ে মারার সময় রুকসানার স্বামী পিরোজপুরের পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সাঈদ আহম্মেদ বাসায়ই ছিলেন। এ কারণে তাকেও আসামি করা হয়েছে। তবে জান্নাতি হত্যাকাণ্ডের চার দিন পেরিয়ে গেলেও তার অবস্থান শনাক্ত করতে পারেনি তদন্তকারী মোহাম্মদপুর থানা পুলিশ। গত শুক্রবার জবানবন্দির পর রুকসানাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেয় আদালত।
তদন্তকারী কর্মকর্তা পরিদর্শক আবদুল আলীম দেশ রূপান্তরকে বলেন, রুকসানার স্বামী সাঈদকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। শিশুটি হত্যাকাণ্ডের আগে ধর্ষণের শিকার হয়েছিল কি না, তাও পরীক্ষা করা হচ্ছে।